• আষাঢ় মাসের তৃতীয় শনিবার এলেই বেলপাহাড়িতে ঢল নামে ৪ রাজ্যের ভক্তদের, কিন্তু কেন?
    News18 বাংলা | ০৬ জুলাই ২০২৬
  • : ঝাড়গ্রাম জেলার বেলপাহাড়ি এবং ঝাড়খণ্ড সীমান্তে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী কানাইসোর (কানাই-ঈশ্বর) পাহাড়ে শনিবার মহাসমারোহে অনুষ্ঠিত হল শতাব্দীপ্রাচীন পাহাড় পুজো। আষাঢ় মাসের তৃতীয় শনিবার, ৪ জুলাই পুজো উপলক্ষে ভোর থেকেই হাজার হাজার ভক্ত ও দর্শনার্থীর ঢল নামে পাহাড় চত্বরে। পশ্চিমবঙ্গ, ঝাড়খণ্ড, বিহার ও ওড়িশা থেকে আসা অগণিত মানুষের ভিড়ে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে গোটা জঙ্গলমহল।

    মূলত কৃষিকাজের আগে প্রকৃতিকে সন্তুষ্ট করতেই এখানকার আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষ এই পুজোর আয়োজন করে থাকেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, পাহাড় দেবতার আরাধনা করলে সময়মতো ভাল বৃষ্টিপাত হবে, ফলন ভাল হবে এবং অতিবৃষ্টি বা হড়পাবান থেকে রক্ষা পাবে গোটা এলাকা। তাই নতুন কৃষি মরশুম শুরু করার আগে কৃষিজীবী মানুষ এই পাহাড়ে পুজো দিয়ে দেবতার আশীর্বাদ প্রার্থনা করেন। এই পাহাড় পুজোর ইতিহাস বহু প্রাচীন। লোকশ্রুতি অনুযায়ী, বহু বছর আগে এক প্রবল বন্যায় এলাকার ঘরবাড়ি ও গ্রাম দেবতার থান ভেসে যায়। এরপর পার্শ্ববর্তী ঢেঙাম গ্রামের বাসিন্দারা অন্যান্যদের সঙ্গে আলোচনা করে এই পাহাড়ে গ্রাম দেবতার প্রতিষ্ঠা করেন। সেই সময় থেকেই ঢেঙাম গ্রামের মাহালি সম্প্রদায়ের মানুষরা এই পাহাড়ের পূজারির দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

    বেলপাহাড়ির সর্বোচ্চ পাহাড় কানাইসোরকে এলাকার মানুষ পাহাড় দেব বা রক্ষাকর্তা হিসেবেই মানেন। প্রথা ও পরম্পরা মেনে ভক্তরা পাহাড়ে উঠে পোড়ামাটির হাতি ও ঘোড়া উৎসর্গ করে পুজো দেন। এছাড়াও, পাহাড় থানে আম, জাম, কাঁঠাল নিবেদন করার পাশাপাশি হাঁস, মুরগি ও ছাগ বলির রীতিও আজও সমান নিষ্ঠার সঙ্গে পালন করা হয়।

    পাহাড় পুজোকে কেন্দ্র করে এলাকায় এক বিশাল মেলার আয়োজন করা হয়। এই মেলায় লোকজ বাদ্যযন্ত্র থেকে শুরু করে কৃষিকাজের নানা সামগ্রী পাওয়া যায়। অন্যদিকে, কানাইসোরের পুজোর ঠিক পরের দিন অর্থাৎ রবিবার পাহাড়ের কাছের গ্রাম বারাঘটাতে আদিবাসীদের সর্বোচ্চ দেবতা ‘মারাং বুরু’-র বিশেষ পুজো অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে মূলত আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষই অংশ নেন। কানাইসোর পাহাড়ের এই পুজো নিছক কোনও ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়, এটি জঙ্গলমহল ও সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মানুষের অটুট বিশ্বাস, কৃষি সংস্কৃতি এবং লোকঐতিহ্যের এক অনন্য মেলবন্ধন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে অনেক কিছুর পরিবর্তন হলেও, শতকের পর শতক ধরে চলে আসা এই প্রাচীন ঐতিহ্যের প্রতি মানুষের টান যে আজও অমলিন, তা এদিনের জনসমুদ্রই প্রমাণ করে।
  • Link to this news (News18 বাংলা)