• রাজনীতি করতেই বারুইপুর যেতে চাইছেন মমতা, বিস্ফোরক অগ্নিমিত্রা
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৭ জুলাই ২০২৬
  • দক্ষিণ ২৪ পরগনার বারুইপুরে (Baruipur) এক নাবালিকার ধর্ষণ-খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তুমুল শোরগোল পড়ে গিয়েছে। রবিবার থেকে শুরু হওয়া এই উত্তেজনা সোমবার আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। একদিকে যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী (Former Chief Minister) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের (Kalighat) বাড়ির সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন এবং তাঁর ‘হাউস অ্যারেস্ট’ (House Arrest) বা গৃহবন্দি হওয়ার অভিযোগ ঘিরে আলোড়ন তৈরি হয়েছে, ঠিক তখনই প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে কড়া ভাষায় তোপ দেগেছেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল (Agnimitra Paul) এবং পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষ (Dilip Ghosh)। পরিস্থিতি সামাল দিতে বারুইপুর ও সংলগ্ন এলাকায় ইতিমধ্যেই কড়া প্রশাসনিক পদক্ষেপ করা হয়েছে।

    ঘটনার সূত্রপাত রবিবার। বারুইপুর থানা এলাকার একটি পুকুর থেকে এক নাবালিকার মৃতদেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের পক্ষ থেকে খুনের অভিযোগ (Allegation of Murder) তোলা হতেই স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে। প্রতিবাদের জেরে রণক্ষেত্রের রূপ নেয় কুলপি রোড (Kulpi Road)। বিক্ষোভ চলাকালীনই এক সন্দেহভাজন ব্যক্তিকে ধরে গণপিটুনি (Lynching) দেওয়া হয়, যার জেরে পরে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।

    পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ইতিমধ্যেই মূল অভিযুক্ত-সহ তিনজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ। পাশাপাশি, ঘটনার গুরুত্ব বিচার করে রাজ্য পুলিশের তরফ থেকে একটি ছয় সদস্যের বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ (Special Investigation Team – SIT) গঠন করা হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী (Chief Minister) শুভেন্দু অধিকারী নিহত নাবালিকার পরিবারের সঙ্গে ফোনে কথা বলে তাঁদের পাশে থাকার এবং দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শনের আশ্বাস দিয়েছেন।

    রবিবার গভীর রাতে এই ঘটনা এক অন্য মাত্রা পায়, যখন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির সামনে হঠাৎই বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়। এরপরই সমাজমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারে (Live Streaming) এসে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেন, তাঁকে বারুইপুরে যেতে বাধা দেওয়ার জন্য কার্যত গৃহবন্দি বা হাউস অ্যারেস্ট করে রাখা হয়েছে।

    তাঁর অভিযোগ ছিল, প্রায় হাজার খানেক পুলিশ, সিআরপিএফ (CRPF), আইবি (IB) এবং সিআইডি (CID) কর্মী তাঁর বাড়ি ঘিরে ফেলেছেন। যদিও প্রশাসনের তরফে এই অভিযোগ উড়িয়ে দেওয়া হয়। মধ্যরাতের পর থেকেই কালীঘাটের বাড়ি থেকে অতিরিক্ত পুলিশ প্রত্যাহার করে নেওয়া হয় এবং সোমবার সকালে সেখানে প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে তাঁর প্রাপ্য স্বাভাবিক নিরাপত্তাই (Normal Security) বজায় থাকতে দেখা গিয়েছে।

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের এই অভিযোগকে পুরোপুরি রাজনৈতিক নাটক বলে উড়িয়ে দিয়েছেন রাজ্যের পুরমন্ত্রী অগ্নিমিত্রা পাল। তিনি কড়া ভাষায় প্রশ্ন তোলেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে কেন হাউস অ্যারেস্ট করা হবে না?  অগ্নিমিত্রার অভিযোগ, প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ইচ্ছাকৃতভাবে একটি অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং স্পর্শকাতর ঘটনাকে রাজনৈতিক রং (Political Colour) দিয়ে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে চাইছেন।

    একই সুরে সুর মিলিয়েছেন রাজ্যের পঞ্চায়েতমন্ত্রী দিলীপ ঘোষও। তিনি কটাক্ষ করে বলেন, মমতার গণতান্ত্রিক অধিকারে (Democratic Rights) কোনও হস্তক্ষেপ করা হয়নি। তাঁর যুক্তি, বর্তমান পরিস্থিতিতে বিরোধী শিবিরের নেতারা যেখানেই যাচ্ছেন, সেখানেই মানুষের ক্ষোভের মুখে পড়ছেন। মূলত সেই নিরাপত্তার আশঙ্কার কথা মাথায় রেখেই প্রশাসন সেখানে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছিল।

    আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির (Law and Order Situation) যাতে আরও অবনতি না ঘটে, তার জন্য কড়া অবস্থান নিয়েছে প্রশাসন। বারুইপুর, নরেন্দ্রপুর এবং সোনারপুর, এই তিনটি থানা এলাকায় ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতার (Bharatiya Nagarik Suraksha Sanhita – BNSS) ১৬৩ ধারা জারি করা হয়েছে। এর ফলে পাঁচ বা তার বেশি মানুষের জমায়েত (Unlawful Assembly) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।

    প্রশাসনিক সূত্রে স্পষ্ট জানানো হয়েছে, উত্তেজনাপ্রবণ পরিস্থিতিতে যে কোনও রাজনৈতিক ভিআইপি-র (VIP) সফর নতুন করে অশান্তি ছড়াতে পারে। তাই সুরক্ষার খাতিরেই এই অস্থায়ী বিধিনিষেধ ও পুলিশি সতর্কতা, এর পিছনে কোনও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নেই।

    এই গোটা বিতর্কের গভীরে তাকালে স্পষ্ট হয়, রাজনৈতিক লড়াই। কালীঘাট তৃণমূল শিবিরের (TMC) স্পষ্ট দাবি, রাজ্যের বর্তমান শাসক দল প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীকে ঘটনাস্থলে যেতে বাধা দিয়ে আসলে ভুক্তভোগী পরিবারের সঙ্গে বিরোধীদের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে চাইছে। অন্যদিকে, শাসক শিবিরের (Ruling Party) পাল্টা দাবি, অতীতেও এই ধরনের স্পর্শকাতর ঘটনায় বিরোধী দল বিভাজনের রাজনীতি করেছে। বর্তমানে বারুইপুরের ঘটনায় পুলিশি তদন্ত চলছে এবং সিটের (SIT) চূড়ান্ত রিপোর্ট এখনও সামনে আসেনি। গণপিটুনিতে নিহত ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগও আদালতে প্রমাণিত নয়। সামগ্রিক পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে পরবর্তী পদক্ষেপের দিকেই নজর রাখছে ওয়াকিবহাল মহল।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)