• নৃশংস অত্যাচারের পরে মাথায় আঘাত, পুকুরে ছুড়ে ফেলার সময়েও বেঁচেছিল বারুইপুরের ছাত্রী
    এই সময় | ০৭ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়, বারুইপুর ও কলকাতা: বাড়ির লোকজন যে অভিযোগ ও সন্দেহ করেছিলেন, ময়না–তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে সেটাই সত্যি বলে জানা গেল। স্বাস্থ্য দপ্তর ও পুলিশ সূত্রের খবর, ওই রিপোর্ট অনুযায়ী, বারুইপুরের ক্লাস সিক্সের ছাত্রীকে ধর্ষণই করা হয়েছে। তবে ধর্ষণ, মাথায় ভারী কিছু দিয়ে আঘাত করা অথবা কোনও জায়গায় মাথা জোরে ঠুকে দেওয়ার পরে নিস্তেজ হয়ে পড়া ১১ বছরের বালিকাকে মৃত বলে ভেবে দুষ্কৃতীরা তাকে শনিবার রাতে বস্তায় ভরে পুকুরে ফেলে দিলেও তার দেহে তখনও প্রাণ ছিল বলে কাঁটাপুকুর মর্গে হওয়া ময়না–তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে উঠে এসেছে।

    সূত্রের খবর, ওই রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে অ্যান্টিমর্টেম ড্রাউনিংয়ের কথা, অর্থাৎ পুকুরে ফেলার সময়েও বালিকাটি বেঁচে ছিল। সে ক্ষেত্রে শনিবার রাতে যখন বালিকাটির খোঁজ চলছে, তখনও সে জীবিত। বালিকার নিখোঁজ হওয়ার কথা জানার পরেই পুলিশ সেই রাতে তৎপর হলে তাকে হয়তো জীবিত উদ্ধার করা যেত বলে স্থানীয়দের ও নিহতের পরিবারের লোকজনের একাংশের বক্তব্য।

    স্বাস্থ্য দপ্তর ও পুলিশ সূত্রের খবর, ময়না–তদন্তে ওই বালিকার পাকস্থলীতে ও ফুসফুসে জল মিলেছে। জলে ডুবে এবং মাথার ক্ষত থেকে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণেই বালিকার মৃত্যু হয় বলে উল্লেখ করা হয়েছে ময়না–তদন্তের প্রাথমিক রিপোর্টে। ময়না–তদন্তে ওই বালিকার যৌনাঙ্গে আঘাতের চিহ্ন মিলেছে, শরীরের বিভিন্ন অংশে পাওয়া গিয়েছে আঁচড়–কামড়ের দাগ।

    বারুইপুরের ওই বালিকাকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের অভিযোগে আরও দুই অভিযুক্ত, আনন্দ সর্দার ও দিবাকর সর্দারকে পুলিশ গ্রেপ্তার করেছে। তদন্তকারীরা জানান, আনন্দই প্রধান অভিযুক্ত। রবিবার গ্রেপ্তার করা হয়েছিল অভিযুক্ত প্রভাস মণ্ডলকে। রবিবার সকালে বারুইপুরের ওই তল্লাটে অভিযুক্ত সন্দেহে যে যুবককে প্রকাশ্য রাস্তায় গণপিটুনি দিয়ে মেরে ফেলা হয়, সেই ইন্দ্রজিৎ তাঁতি অভিযুক্ত কি না, তা নিয়ে ধোঁয়াশা এখনও কাটেনি।

    তবে পুলিশ সূত্রের খবর, নিহত ছাত্রীর এক আত্মীয় রবিবার রাতে ই–মেল করে বারুইপুর থানায় যে অভিযোগ জানিয়েছেন, তাতে অভিযুক্ত হিসেবে ওই যুবকের নাম রয়েছে। ধৃতদের অন্যতম প্রভাসও আহত হয় ক্ষিপ্ত জনতার প্রহারে। পুলিশের একটি সূত্রের খবর, ওই ঘটনায় প্রবীর মণ্ডল নামে এক অভিযুক্ত ফেরার। তার খোঁজ চলছে। তদন্তকারীরা জানিয়েছেন, প্রভাসের বক্তব্য অনুযায়ী, অভিযুক্ত তাকে নিয়ে মোট চার জন। প্রভাস চল্লিশোর্ধ্ব, বাকি তিন জনের বয়স ৩০–৩৫ বছরের মধ্যে।

    পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, আনন্দ পা দিয়ে স্কুলছাত্রীটির গলা চেপে ধরার পরেই সে নিস্তেজ হয়ে পড়ে বলে প্রভাস তার বয়ানে জানিয়েছে। রবিবার সকাল থেকেই আনন্দর খোঁজে চারদিকে তল্লাশি শুরু হয়। বারুইপুরের ওই জায়গা থেকে পালিয়ে আনন্দ তখন অন্যত্র আশ্রয় খুঁজছে। একবার সে জয়নগর এলাকার হাসিমপুরে এক জনের বাড়িতে যায়। কিন্তু সেখানে আশ্রয় না–পেয়ে সে যায় লাগোয়া বকুলতলা এলাকায় তার এক আত্মীয়ের বাড়িতে। ওই জায়গাতেও অবশ্য তার ঠাঁই মেলেনি। শেষমেশ বারুইপুরের কাছাকাছি আনন্দ ফিরে আসতে বাধ্য হয় এবং সোমবার সকালে তাকে সেখান থেকেই পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

    পুলিশের একাংশের বক্তব্য, আনন্দর কাছে বেশি টাকাপয়সা না–থাকায় সে দূরে কোথাও পালাতে পারেনি। তা ছাড়া, ঘটনাটি জানাজানি হওয়ায় তার পরিচিতরাও আনন্দকে আশ্রয় দিতে চায়নি। আজ, মঙ্গলবার আনন্দকে আদালতে হাজির করানোর কথা পুলিশের। আর এক অভিযুক্ত দিবাকর সর্দারকে নিহত ছাত্রীর বাড়ির কাছাকাছি এলাকা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় বলে পুলিশ জানিয়েছে। দিবাকর ও প্রভাসকে এ দিন হাজির করানো হয় বারুইপুর মহকুমা আদালতে। আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই বলেন, ‘অভিযুক্ত তিন জনকে আমরা গ্রেপ্তার করেছি। তাদের মধ্যে দু’জনকে সোমবার আদালতে হাজির করানো হয়েছিল। ওই দু’জনকে ১৪ দিনের জন্য পুলিশি হেফাজতে পাওয়া গিয়েছে।’

    বারুইপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় অতীতে পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ পদে কাজ করা কঙ্করপ্রসাদ বারুইয়ের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার করতে ও উত্তপ্ত পরিস্থিতি সামাল দিতে কার্যকর হয়েছে বলে পুলিশ সূত্রেরই খবর। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, রবিবার রাতভর থানার সামনে বসেছিলেন কঙ্কর, কখনও তাঁকে থানা চত্বরে টানা পায়চারি করতে, ফোনের পর ফোন করতে দেখা যায়। সম্প্রতি বারুইপুর পুলিশ জেলারও বহু অফিসারের পদে রদবদল হয়েছে। নতুন যাঁরা বারুইপুরে এসেছেন, তাঁদের অধিকাংশই এলাকা ঠিকঠাক চিনে উঠতে পারেননি। এই অবস্থায় বদলি হয়ে অন্যত্র চলে যাওয়া, বারুইপুরে দক্ষতা ও দাপটের সঙ্গে কাজ অফিসারদের একাংশের সঙ্গে আইজি যোগাযোগ করেন, তাঁদের সকলের যাবতীয় সোর্স–দের সক্রিয় করতে বলেন এবং কয়েক জনকে জরুরি ভিত্তিতে সোমবার বারুইপুর পুলিশ জেলায় নিয়ে আসেন।

    তবে ওই ঘটনায় বিজেপির বারুইপুর–পশ্চিম ৩ নম্বর মণ্ডলের সভাপতি শান্তনু মণ্ডলের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে যে, মূল অভিযুক্ত আনন্দ সর্দারকে স্থানীয়রা পুলিশের হাতে তুলে দিলেও স্থানীয় ওই বিজেপি নেতা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে তাকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান। রবিবার রাতে বারুইপুর থানায় ই–মেল করে জানানো অভিযোগে এই বিষয়টিও জানিয়ে শান্তনুর দিকে আঙুল তোলা হয়েছে। আবার, রবিবার সকালে ক্ষিপ্ত জনতার হাত থেকে প্রভাস মণ্ডলকে কোনও রকমে উদ্ধার করে শান্তনুই বারুইপুর থানার পুলিশের হাতে তুলে দেন। সেই ইস্তক বারুইপুর থানায় শান্তনু আটক রয়েছেন বলে পুলিশ জানিয়েছে।

    পুলিশের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, গ্রেপ্তার হওয়া অভিযুক্তদের সঙ্গে শান্তনুকে মুখোমুখি বসিয়ে সবটা জানার চেষ্টা করবেন তদন্তকারীরা। বারুইপুর–পশ্চিমের তৃণমূল বিধায়ক ও বিধানসভার প্রাক্তন অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় বলেন, ‘ওই বিজেপি নেতার বিরুদ্ধে অভিযুক্তদের ছাড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তিনি এখন বারুইপুর থানাতেই রয়েছেন। পুলিশের উচিত, তাঁর বিরুদ্ধে উপযুক্ত তদন্ত করে সত্য উদ্ঘাটন করা।’ বিজেপির যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পালের বক্তব্য, ‘গণপ্রহারের হাত থেকে অভিযুক্তদের সরিয়ে এনে পুলিশের কাছে তুলে দিয়ে প্রশাসনকেই সাহায্য করেছেন শান্তনু। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুলিশের উচিত, তদন্ত করে সত্যকে সামনে আনা।’

    ক্লাস সিক্সের ছাত্রীটিকে অপহরণ, ধর্ষণ ও খুনের মামলার পাশাপাশি পুলিশ আরও কয়েকটি বিষয়ে মামলা রুজু করেছে। যার মধ্যে রয়েছে গণপিটুনিতে ইন্দ্রজিৎ তাঁতিকে মেরে ফেলা, পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর উপর হামলা, পুলিশ ক্যাম্প ও পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর এবং রাজ্য সড়ক ও রেলপথ দীর্ঘক্ষণ অবরোধ করে রাখার ঘটনা। তবে ওই সব মামলায় এখনও পর্যন্ত পুলিশ কারও বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ করেনি।

    ‘ভয়েস অফ অভয়া, ভয়েস অফ উইমেন’–এর তরফে সোমবার বারুইপুর থানার আইসি–কে বারুইপুরে স্কুলছাত্রীকে ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ চেয়ে স্মারকলিপি দেওয়া হয়। তবে তাদের তরফে বিপ্লব চন্দ্র বলেন, ‘আমরা হতাশ। আইসি–র বক্তব্য, উনি নাকি বিষয়টা নিয়ে কিছুই জানেন না। আমরা যতটা জানি, উনিও ততটা জেনেছেন সংবাদমাধ্যমের খবর থেকে। এ কথা শোনার পরে আমাদের মনে হয়েছে, তদন্ত কি সঠিক পথে হবে? সঠিক বিচার কি হবে?’ তবে পুলিশ সূত্রের খবর, বারুইপুরের আইসি সদ্য অন্য জায়গা থেকে বদলি হয়ে এসেছেন।

  • Link to this news (এই সময়)