• অফিসারদের সঙ্গে ‘নেক্সাস’ কালীর, সোনার খনি বিল্ডিং রেগুলারাইজেশনের ফাইল! তদন্তের আওতায় আনার দাবি পুরসভার অন্দরেই
    বর্তমান | ০৭ জুলাই ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: কোনো নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত বিল্ডিং প্ল্যানের বাইরে গিয়ে ‘ছোটোখাটো বিচ্যুতি’ (মাইনর ডেভিয়েশন) থাকলে জরিমানা দিয়ে তা ‘রেগুলারাইজ’ করা যায়। কলকাতা পুরসভার বিল্ডিং আইনেই রয়েছে এই সংস্থান। পুরসভা সূত্রে খবর, এই রেগুলারাইজেশন সংক্রান্ত (বিল্ডিং আইনের ৪০১ নং ধারা) ফাইলগুলিই ছিল টাকার খনি! অভিযোগ, রেগুলারাইজেশনের গোটা প্রক্রিয়াটাই চলত প্রাক্তন মেয়র ফিরহাদ হাকিমের ওএসডি কালীচরণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের অঙ্গুলিহেলনে। ধৃত কালীচরণের টাকার অন্যতম ‘উৎস’ ছিল সেখানেই। রেগুলারাইজেশনের ‘হিয়ারিং’ অফিসের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্তাদের সঙ্গেই চলত কালীচরণের ‘নেক্সাস’। এমনই অভিযোগ পুরকর্তা থেকে শুরু করে এলবিএস-আর্কিটেক্টদের। তাই রেগুলারাইজেশনের ফাইলগুলিও পুলিশের স্ক্যানারে আসা উচিত বলে মনে করছেন তাঁরা। 

    পুরসভার অন্দরে খবর, ৪০১-এর নোটিস দেওয়া ফাইল থেকেই উঠে আসত বিপুল টাকা। প্রথমে কোনো বেআইনি নির্মাণে ৪০১ ধারায় ‘স্টপ ওয়ার্ক’ নোটিস দেওয়া হত। তারপরই শুরু হত টাকার খেলা! ‘পছন্দমতো’ বেআইনি নির্মাণে যেত শুনানির নোটিস। অভিযোগ, কালীর হয়ে সেই সমস্ত ফাইল ‘হ্যান্ডেল’ করতেন হিয়ারিং বিভাগের দুই কর্তা। তাঁরা পুরসভার অন্দরে ‘বড়োবাবু’ ও ‘ছোটোবাবু’ নামে পরিচিত। মূলত ‘ছোটবাবু’ই সংশ্লিষ্ট বেআইনি নির্মাণের মালিকপক্ষের সঙ্গে সরাসরি টাকার দরাদরি চালাতেন। এহেন ‘ছোটোবাবু’র পরিবারের রাজনীতি-যোগও রয়েছে। তারাতলা গোডাউন বিপর্যয়ে দুর্নীতির অভিযোগে কালীচরণকে পুলিশ গ্রেপ্তার করার পর ওই দুই অফিসারও তাই তদন্তকারীদের নজরে। 

    পুর-আধিকারিকরা জানাচ্ছেন, কোন অবৈধ নির্মাণের রেগুলারাইজেশনের হিয়ারিং আগে হবে, কোনটা রেগুলারাইজড হবে, কোনটা হবে না, সবটাই ‘ঘুষ’-এর অঙ্কের ভিত্তিতে ঠিক করতেন কালীচরণ। টাকা না দিলে সেই অবৈধ নির্মাণ ভাঙার অর্ডার হত। কিন্তু স্পেশাল হিয়ারিং অফিসারের নির্দেশ ছাড়া কীভাবে রেগুলারাইজড হতো বেআইনি নির্মাণ? পুরকর্তাদের অভিযোগ, শুনানির আগেই মালিকপক্ষকে ডেকে টাকা চাওয়া হত। সবক্ষেত্রে কালীচরণ সরাসরি টাকা চাইতেন না। তাঁর হয়ে ‘ডিল’ করতেন ‘ছোটোবাবু’। টাকা পেয়ে গেলে সেই ফাইল এমনভাবে শুননিতে পেশ করা হত, যাতে স্পেশাল অফিসার রেগুলারাইজেশনের নির্দেশ দিতে বাধ্য হন। আর টাকা না দিলে নির্মাণ ভাঙার অর্ডার হত বা ফাইল ফেলে রাখা হত। এলবিএস তথা স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার অংশুমান সরকার বলেন, ‘হিয়ারিংয়ের স্পেশাল তিন অফিসার অবশ্য এসব লেনদেনের মধ্যে ছিলেন না। গোটাটাই কালীচরণের সঙ্গে যোগসাজশে সামলাতেন ছোটোবাবু। সেই অফিসারদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা উচিত। শুধু এমবিসি (মিউনিসিপাল বিল্ডিং কমিটি) ফাইল দেখলে হবে না। রেগুলারাইজেশন ফাইলও তদন্তের আওতায় আসা দরকার।’ 

    প্রসঙ্গত, রেগুলারাইজেশন থেকে পুরসভা কোটি কোটি টাকা আয় করে। কিন্তু অভিযোগ, এই আয় আরও বৃদ্ধি হতে পারত। কিন্তু কারসাজি করে রেগুলারাইজেশন ফি কম নিয়ে বাকি টাকা মালিকের থেকে আত্মসাৎ করত ‘কালী এন্ড কোং’। ফাইল পিছু কম করে দেড় থেকে দু’লক্ষ টাকা নেওয়া হত। ‘বড়ো কেস’ হলে ৪০-৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত ‘ঘুষ’ নেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ। যেমন, ভবানীপুরের একটি হেরিটেজ বিল্ডিং সংস্কারের ফাইল ছাড়তে ১০ লক্ষ টাকা, বেহালা অঞ্চলের একটি জমির চরিত্র বদলের জন্য ৫০ লক্ষ টাকা ‘দর’ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ।
  • Link to this news (বর্তমান)