নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বারুইপুরের সূর্যপুরহাটে নাবালিকা গণধর্ষণ-খুনের ঘটনার পুলিশি তদন্তে একাধিক গাফিলতির অভিযোগ সামনে এসেছে। এই সংক্রান্ত একটি রিপোর্ট জমা পড়েছে নবান্নে। নিখোঁজ হওয়ার পর নাবালিকার পরিবারের তরফে মিসিং ডায়েরি করা হলেও, বারুইপুর থানার ওসি সহ কয়েকজন পুলিশ কর্মী সঠিক সময়ে ‘রিঅ্যাক্ট’ করেননি বলে ওই রিপোর্টে অভিযোগ আনা হয়েছে। তাঁদের কাজে যথেষ্ট গাফিলতি ছিল। এমনকি গোলমাল মোকাবিলার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট থানার কাজকর্মে ব্যাপক ত্রুটি ছিল বলে দাবি। রবিবার ওই নাবালিকার মৃতদেহ নিয়ে পথ অবরোধ ও গোলমালের খবর প্রথম এসে পৌঁছায় সূর্যপুরহাট পুলিশ ক্যাম্পে। তখনই থানায় খবর দিয়ে বাড়তি ফোর্স চাওয়া হয়। বারুইপুর থানা থেকে ঘটনাস্থল মাত্র ১২ কিমি দূরে। কে যাবে, গাড়ি নেই, ফোর্স নেই—এসব টালবাহানা শেষে তিন ঘণ্টা পরে ঘটনাস্থলে পৌঁছায় পুলিশ। ততক্ষণে পরিস্থিতি বিগড়ে গিয়েছে। তাণ্ডব শুরু হয়ে যায় এলাকায়। তদন্তপর্বে পুলিশের একাংশের গাফিলতি যে ছিল, তা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কথাতেও স্পষ্ট। সোমবার তিনি বলেন, ‘নিখোঁজের অভিযোগ দায়ের হওয়ার পর স্থানীয় পুলিশের যদি কোথাও গাফিলতি প্রমাণিত হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পুলিশ কর্মীর বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
সূত্রের খবর, একইসঙ্গে বারুইপুর পুলিশ জেলা সুপারের ভূমিকা নিয়েও অসন্তুষ্ট রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারা। তিনি কেন প্রথমে ঘটনাস্থলে যাননি, প্রশ্ন উঠেছে তা নিয়ে। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, এসপির আগে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গিয়েছিলেন আইজি (প্রেসিডেন্সি রেঞ্জ) কঙ্করপ্রসাদ বারুই। যে কাজ পুলিশ সুপারের করা কথা ছিল, তা আইজি করতে শুরু করেন। নাবালিকার পরিবারকে বুঝিয়ে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে মোবাইলে কথা বলান। এরপর উত্তেজিত মারমুখী জনতার সামনে মাইকে মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলার বিষয়টি ঘোষণা করেন। বিক্ষুব্ধ জনতাকে নিয়ন্ত্রণে আনতে বাড়তি ফোর্স আনেন। এসব কাজই করার কথা ছিল এসপির। এখানেই শেষ নয়, সিসি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে আইজি নিজেই খুঁজে বের করেন মূল অভিযুক্তকে। সেখানে যে ব্যক্তিকে নাবালিকার সঙ্গে দেখা গিয়েছিল, তাকে গ্রেপ্তার করান।
রাজ্য পুলিশের শীর্ষ কর্তারা জেনেছেন, পরিবারের তরফে মিসিং কমপ্লেন হওয়া থেকে ভুলের শুরু পুলিশের। অভিযোগকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে চুপ করে বসেছিল থানা। অভিযোগ, উলটে পরিবারকে বলা হয়, মেয়ে আশপাশেই আছে। খুঁজুন, পেয়ে যাবেন। অভিযোগ পেয়েও থানার কোনো অফিসার ঘটনাস্থলে যাননি। কোনো নাবালক বা নাবালিকার মিসিং কমপ্লেন এলে নিয়মমাফিক তার ছবি আশপাশের থানা সহ সব জায়গায় মেসেজ করা হয়। বারুইপুরের ক্ষেত্রে তা করা হয়নি। এমনকি বিষয়টি জানানো হয়নি জেলা পুলিশ কন্ট্রোল রুমেও। সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী, কোনো নাবালক বা নাবালিকা মিসিংয়ের অভিযোগ পেয়ে পুলিশ অপহরণের কেস রুজু করবে। এরপর তার বাড়ি এবং আত্মীয়স্বজনের বাড়ি সহ বিভিন্ন জায়গায় তল্লাশি চালাবে পুলিশ। খোঁজ না পেলেও, থানায় ফিরে জেনারেল ডায়েরি করে বলবে, সংশ্লিষ্টকে খুঁজে পাওয়া গেল না। তাই অপহরণের অভিযোগ দায়ের করা হল। এমনটা হয়নি বারুইপুরে। ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে জয়নগরে এক নাবালিকা মিসিং হওয়ার ঘটনাতেও গুরুত্ব দেয়নি পুলিশ। খুন হয় নাবালিকা। একইরকম ঘটনা ঘটেছিল ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে তারকেশ্বরে। চার বছরের শিশু মিসিং হওয়ার অভিযোগকেও গুরুত্ব দেয়নি পুলিশ। পরে বাচ্চাটির দেহ উদ্ধার হয় নর্দমায়।