• টানা টহল, ওরা কারা?
    বর্তমান | ০৭ জুলাই ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সূর্যপুরহাট! একটা সময় শিয়ালদহ দক্ষিণ শাখায় সূর্যপুরের ফটাস জল জনপ্রিয় ছিল। কিন্তু আজ, বারুইপুর থেকে সূর্যপুরের অটোতে উঠলে চালকরা জিজ্ঞেস করছেন, ‘ওই ঝামেলার জায়গায় যাবেন তো?’ এই একই কথা বলছিলেন সূর্যপুরের এক স্থানীয় লোক। অচেনা মুখ দেখে বললেন, ‘আমাদের এলাকার বদনাম হয়ে গেল।’ ওই ভিড়ের মধ্যে অটো থেকে কেউ নামলে অতর্কিতে এক ব্যক্তি এসে চালককে বলে গেলেন, ‘মিডিয়ার লোক উঠলে আগে জিজ্ঞেস করে নিবি, কোন কাগজ?’

    কারা ওরা? স্থানীয়? বহিরাগত? জানা নেই। কিন্তু একটা বিষয় স্পষ্ট—তারা এককাট্টা। সূর্যপুরহাটের ওই ছোট্ট মেয়েটির জন্য। ন্যায়বিচারের জন্য। কেন এই আক্রোশ? তার কিছুটা আঁচ পাওয়া যায় সূর্যপুরের ওই জমায়েতের জায়গায় গেলে। শ’দুয়েক মানুষ সেখানে সদা উপস্থিত। পুলিশও রয়েছে। লাগানো হয়েছে দু’টি চোঙা। টাঙানো হয়েছে জাস্টিস ফর বারুইপুর লেখা ফ্লেক্স। দোতলা বাড়ির উপরেও লোকজন উঠে বসে আছেন। সেই মাইক থেকে মাঝে মধ্যে ঘোষণা হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রতি। আবার কখনো অনুরোধ, বা সবিনয় নির্দেশ আসছে সংবাদমাধ্যমের প্রতি। স্থানীয়দের উদ্দেশে বলা হচ্ছে, ‘গুরুত্বপূর্ণ রাস্তা ছেড়ে দাঁড়ান। যাতায়াত করতে দিন। বিশৃঙ্খলা করবেন না। ছোট্ট মেয়েটির বিচার আমরা চাই।’ আবার মিডিয়ার প্রতি বার্তা আসছে, ‘আপনারা যাকে তাকে জিজ্ঞেস করে গুজব ছড়াবেন না। আপনাদের মাধ্যমে আমাদের আন্দোলনের কথা ছড়িয়ে পড়বে। তাই আপনারা সঠিকভাবে সংবাদ পরিবেশন করবেন।’ ভিন রাজ্যের সংবাদ মাধ্যমের জন্য হিন্দিতেও ঘোষণা হচ্ছে। আচমকা প্যান্ট-শার্ট পরা অচেনা মুখ এলেই স্থানীয়রা যেন বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করছেন, কোন মিডিয়া। এরকমই আপাতশান্ত কিন্তু থমথমে রাস্তা থেকে কাদা মাখা পথ পেরলে মৃত নাবালিকার বাড়ি। কার্যত ঘিরে রেখেছেন স্থানীয়রা।

    এখানে খবর আলোর ছেয়ে দ্রুত বেগে ছুটছে। রবিবার দুপুরে এক অভিযুক্ত গ্রেপ্তার হওয়ার খবর আসে। রাস্তায় কেউ এসে খবর দিয়ে যান, ‘আল্লা রে! আর একজনকে ধরেছে।’ বারুইপুর থেকে সূর্যপুরের খানাখন্দে ভরা রাস্তা পেরিয়ে এই এলাকা যেন আলাদা চেহারা নিয়েছে। আচমকা মানুষ উত্তেজিত হয়ে পড়ছেন। হঠাৎ কেউ বলে উঠছেন, ‘রাস্তা বন্ধ করে দাও।’ কেউ আবার পরক্ষণেই তাঁদের সামলাচ্ছেন। কেউ এখনও পাড়ার মেয়ের ক্ষতবিক্ষত চেহারার কথা ভুলতে পারেননি। অনেকে সে কথা বলতে গিয়ে আর জি করের প্রসঙ্গ তুলছেন। বলছেন, ‘সবাই বলত আর জি করের ঘটনা ভয়ানক ছিল। কিন্তু আমাদের এখানকার ঘটনা সাংঘাতিক। ওইটুকু বাচ্চাকে কীভাবে মারতে পারল?’ কারও চোখে যেন এখনও ভাসছে ওই নাবালিকার হেঁটে যাওয়াটা। রাস্তায় দাঁড়িয়েই এক স্থানীয় বাসিন্দা বলছিলেন, ‘এই রাস্তা দিয়ে সেদিন বিকেলে হেঁটে গিয়েছিল। তারপর আর ফিরল না।’ ভুলতে পারছেন না বাচ্চা মেয়েটির ক্ষতভরা মুখ।

    ইতিমধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা এসেছেন। তাঁদেরকে স্বাগতও জানিয়েছেন এলাকার মানুষজন। এসবের মাঝে আরও একটা বিষয় স্থানীয় মানুষদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে। তা হল, ‘শুধুই কি রাজনীতি হবে? নাকি মেয়েটি ও তার পরিবার বিচারও পাবে?’ সূর্যপুরের ওই এলাকায় প্রায় ৫০০ মিটার রাস্তা জুড়ে বিভিন্ন জায়গায় জটলা। নানাবিধ আলোচনা। অচেনা লোকজনকে দেখলে একবার মেপে নেওয়া। সেই মাপে কোনও অসুবিধা হলে প্রশ্ন, ‘এত মিডিয়া কে ঢুকতে দিল?’ থমথমে এলাকা। আতঙ্কে। ঘটনার ভয়াবহতায়। ক্ষোভে। এসবের মাঝেই চলছে জাস্টিসের জন্য লড়াই। জাস্টিস ফর বারুইপুর।
  • Link to this news (বর্তমান)