প্রদীপ চক্রবর্তী, চুঁচুড়া
নগরায়ণের থাবায় কাটা পড়ছে বহু পুরোনো গাছ। এক সময় এই সব পুরোনো গাছের কোটরই ছিল শিকারি নিশাচর পাখিদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল। কিন্তু নগর সভ্যতার সম্প্রসারণের ফলে গাছ কাটা পড়ায় শিকারি পাখিদের বাসস্থান ক্রমেই সঙ্কুচিত হচ্ছে। কিছু শিকারি পাখি আছে, যারা দিনের আলোয় সাপ, ইঁদুর ধরে খায়। এটা করে তারা পরিবেশের ভারসাম্য বজায় রাখে।
কিন্তু চাষের জমিতে এখন অধিক মাত্রায় রাসায়নিক ও কীটনাশক ব্যবহারের ফলে তার বলি হচ্ছে শিকারি পাখিরা। বাসস্থানের অভাব ও বিষের প্রভাবে অস্তিত্বের সঙ্কটে ভুগছে শিকারি পাখিরা। এর পরিণামে শহরের পাশাপাশি গ্রামাঞ্চলেও শিকারি পাখির সংখ্যা দ্রুত কমছে। ফলে যত দিন যাচ্ছে গ্রামের দিকেও সাপের উপদ্রব বাড়ছে। বন, জঙ্গল, জলাধারের পাশাপাশি সাধারণ লোকালয়েও সাপের দেখা মিলছে হামেশাই। তাতে সাপের সঙ্গে মানুষের সংঘাত বেড়েই চলেছে। বিষাক্ত সাপের ছোবল খেয়ে অনেকে হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। সময়ে চিকিৎসা না হলে সর্পদংশনে অনেকের মৃত্যু হচ্ছে। গ্রামের পাশাপাশি সর্পদষ্ট রোগীর সংখ্যা লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে।
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, শিকারি পাখি ছাড়াও গোসাপ, বেজি সাপের ডিম ও সাপের বাচ্চা খেয়ে ফেলে। কিন্তু কিছু মানুষ কুসংস্কারের বশবর্তী হয়ে গোসাপ দেখলেই তাদেরকে মেরে ফেলে। তার জন্যও সাপের সংখ্যা বাড়ছে। সব মিলিয়ে, সাপের বংশবৃদ্ধি বেড়েই চলেছে দ্রুত গতিতে। গ্রামে-শহরে সাপের এই বাড়বাড়ন্ত উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
গঙ্গার পশ্চিম তীরের শহর হুগলি জেলার গ্রাম ও শহরে মূলত কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়া, কালাচ-এই চার প্রজাতির বিষধর সাপের প্রবণতা বেশি। এদের 'বিগ ফোর' বলা হয়। তবে বিভিন্ন সময়ে বালি, পাথর, কাঠবোঝাই গাড়িতে ভিন রাজ্য থেকেও সাপ কিন্তু এসেছে। যে কারণে বিগ ফোর ছাড়াও শাখামুটি কিংবা পাইথন প্রজাতির সাপও দেখা গিয়েছে। তবে শিকারি পাখি ও গোসাপ কমতেই সাপের রমরমা। বিগ ফোর প্রজাতির যে কোনও একটি সাপের কামড়ে সঠিক চিকিৎসা না হলে, মৃত্যু অনিবার্য।
চিকিৎসকরা জানাচ্ছেন, সাপের কামড়ের ১০০ মিনিটের মধ্যে ১০টি অ্যান্টিভেনম (১০ এমএল) স্যালাইনের মাধ্যমে সাপে কাটা রোগীকে দিতে হবে। তা না হলেই বিপদ ঘটতে পারে। বর্ষার সময়ে আরামবাগ, পুরশুড়া, জিরাট, বলাগড় ও পাণ্ডুয়ার মতো গ্রামীণ এলাকাগুলিতে সর্পদংশনের শিকার হন অনেকে। কয়েক বছর আগে শ্রাবণী মেলায় জল ঢালতে এসে বৈদ্যবাটি শহরেও সাপের কামড় খেয়েছেন কেউ, এমন ঘটনাও ঘটেছে।
সর্প বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন, বিষধর সাপেরা মূলত রাতের বেলা বেরয়। সাপ মূলত ব্যাঙ, টিকটিকি ও পোকামাকড় খায়। দিনের বেলা সাপ খুব একটা না বেরলেও, শীতকালে দিনের বেলা সাপ রোদের আমেজ নিতে গর্ত থেকে বাইরে আসে। বর্ষার সময়ে সাপের বিচরণ বেশি থাকে। তাই, রাতে অবশ্যই আলো, মোবাইল ফ্ল্যাশ, টর্চ ব্যবহার করা জরুরি। রাতে মশারি টাঙিয়ে, ভালো ভাবে গুঁজে দিয়ে ঘুমনো এবং নীচে মেঝেয় না ঘুমনোর পরামর্শ দিয়েছেন সর্প বিশেষজ্ঞরা। এ বিষয়ে সর্প বিশারদ চন্দন ক্লেমেন্ট সিংহ বলেন, 'আমাদের জেলায় বিগ ফোর সাপের আদি বাসস্থান। চন্দ্রবোড়া দক্ষিণ ভারতে আবিষ্কার হলেও, আমাদের এখানে চন্দ্রবোড়া বরাবর রয়েছে। এ ছাড়া কেউটে, গোখরো, কালাচ তো রয়েইছে। ইদানিং শাখামুটি সাপের দেখাও মিলেছে। তবে বেশির ভাগ সাপ কিন্তু নির্বিষ। কেউটে, গোখরো, চন্দ্রবোড়ার তুলনায় কালাচ অনেক বেশি বিপজ্জনক। কারণ, কালাচের দংশন বোঝা যায় না।'
তাঁর ব্যাখ্যা, কালাচের কামড়ে কোনও চিহ্ন থাকে না। রক্ত জমাট বাঁধে না। কেবল ঝিমুনি আসে, চোখ বুজে আসে। তাঁর পরামর্শ, সাপের মোকাবিলায় বাড়ির চারপাশের ঝোপঝাড় পরিষ্কার রাখতে হবে, যাতে সাপ লুকিয়ে থাকতে না পারে। পোকামাকড়-সহ অন্যান্য প্রাণীর প্রবেশ আটকাতে হবে।
পরিবেশকর্মী বিশ্বজিৎ দাস বলেন, 'বনজঙ্গল নষ্ট করে বাড়িঘর তৈরি ও জলাশয় ভরাটের কারণে সাপ বাধ্য হয়েই লোকালয়ে ডিম দিচ্ছে। সাপের সংখ্যাও বাড়ছে।'