• ভেঙে দেওয়া হলো তারকেশ্বর পৌরসভা, এখন থেকে দায়িত্ব সামলাবেন সরকারি আমলা
    আজ তক | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই যে হাওয়া বইতে শুরু করেছিল, এবার তা আরও স্পষ্ট হলো। একের পর এক ধাক্কায় জেরবার শাসকদল তৃণমূলের হাত থেকে বেরিয়ে গেল হুগলির আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পুরসভা— তারকেশ্বর। ভেঙে দেওয়া হলো তারকেশ্বর পৌরসভার গোটা পুর বোর্ড। আর সেখানে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সরিয়ে চেয়ারে বসিয়ে দেওয়া হলো একজন সরকারি আমলাকে। প্রশাসন সূত্রের খবর, ডেপুটি কালেক্টর আশিস কুমার রায় এখন থেকে তারকেশ্বরের নতুন পুর প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব সামলাবেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, হুট করে কেন এমন সিদ্ধান্ত নিতে হলো নবান্নকে? কেন ভোটের ফল প্রকাশের পর থেকেই পুরপ্রধান আর কাউন্সিলাররা বেপাত্তা হয়ে গেলেন? আর কেনই বা হুগলি জেলায় একের পর এক পুরসভা শাসকদলের হাতছাড়া হচ্ছে? এই সমস্ত প্রশ্নের পেছনে লুকিয়ে আছে দুর্নীতি, অন্তর্দ্বন্দ্ব আর চরম প্রশাসনিক ব্যর্থতার এক নির্মম খতিয়ান।

    গোটা ঘটনার সূত্রপাত বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পর থেকেই। যে নেতারা ভোটের আগে সাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে গিয়ে বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিলেন, ফল বেরোতেই দেখা গেল পৌরসভায় তাঁদের আর খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পুরপ্রধান থেকে শুরু করে কাউন্সিলাররা— সবাই যেন রাতারাতি কর্পূরের মতো উবে গেলেন। ফলে যা হওয়ার তাই হলো, নিত্যদিন চরম সমস্যায় পড়তে হচ্ছিল সাধারণ বাসিন্দাদের। জন্ম বা মৃত্যুর শংসাপত্র, ট্রেড লাইসেন্স বা সামান্য একটা সই করানোর জন্য সাধারণ মানুষ দিনের পর দিন পুরসভায় এসে ঘুরে যাচ্ছিলেন। কিন্তু ফাঁকা চেয়ার আর বন্ধ ঘর ছাড়া তাঁরা কিছুই দেখতে পাননি। নাগরিক পরিষেবা বলতে যা বোঝায়, তা তারকেশ্বরে কার্যত স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল।

    হুগলি জেলায় এই ঘটনা কিন্তু প্রথম নয়। এর আগে জেলার একাধিক পুরসভার বোর্ড একে একে ভেঙে পড়েছে। ভদ্রেশ্বর, চন্দননগর, বাঁশবেড়িয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পুরসভাগুলোর পর এবার সেই তালিকায় নতুন সংযোজন হলো তারকেশ্বর। রাজনৈতিক মহলের মতে, এই একের পর এক পুরসভা হাতছাড়া হওয়া এবং প্রশাসক বসানো আসলে শাসকদলের ভেতরের তীব্র গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব এবং জনগণের অনাস্থারই বহিঃপ্রকাশ। তারকেশ্বর পৌরসভার মোট ১৫টি ওয়ার্ড। এই ছোট পুরসভার অন্দরে যে পরিমাণ ক্ষোভ আর কেলেঙ্কারি জমেছিল, তা এখন ধীরে ধীরে বাইরে আসছে। ইতিমধ্যে পুরপ্রধান উত্তম কুণ্ডু এবং আরও দুই কাউন্সিলরের বিরুদ্ধে থানায় একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ দায়ের হয়েছে। সরকারি টাকা নয়ছয় করা থেকে শুরু করে স্বজনপোষণ— বাদ যায়নি কিছুই। যখনই এই দুর্নীতির খাঁড়া ঘাড়ের ওপর এসে পড়েছে, তখনই গা-ঢাকা দিয়েছেন অভিযুক্ত জনপ্রতিনিধিরা। এতদিন যেমন-তেমন করে নির্বাহী আধিকারিক বা এক্সিকিউটিভ অফিসার পৌরসভার দৈনন্দিন রুটিন কাজগুলো চালাচ্ছিলেন ঠিকই, কিন্তু যে কোনও গুরুত্বপূর্ণ বা নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে একটা মস্ত বড় জটিলতা তৈরি হচ্ছিল। কারণ, আইন অনুযায়ী একজন সরকারি আধিকারিকের পক্ষে বোর্ডের সই ছাড়া সব ফাইলে সই করা সম্ভব নয়।

    এর ফলে সবচেয়ে বেশি বিপদে পড়েছিলেন শহরের সাধারণ মানুষ। বিভিন্ন ধরণের শংসাপত্র বা সার্টিফিকেট পেতে কালঘাম ছুটছিল বাসিন্দাদের। কিন্তু সবথেকে বড় সংকট দেখা দিল অন্য জায়গায়। সামনেই তারকেশ্বরের বিখ্যাত শ্রাবণী মেলা, যেখানে লক্ষ লক্ষ পুণ্যার্থীর ঢল নামে। এই মেলার আগে শহরের রাস্তাঘাট মেরামত, আলো এবং পানীয় জলের ব্যবস্থা করার জন্য পুরসভার সক্রিয় ভূমিকা দরকার ছিল। অথচ সেই সময়েই পুরসভা অভিভাবকহীন! এর ওপর যোগ হয়েছিল পুরসভার অস্থায়ী কর্মীদের বেতনের সমস্যা। মাসের পর মাস কাজ করেও অস্থায়ী কর্মীরা বেতন পাচ্ছিলেন না, কারণ চেকে সই করার মতো কেউ ছিল না। ফলে কর্মীদের মধ্যে তৈরি হচ্ছিল তীব্র অসন্তোষ, যা যে কোনও মুহূর্তে বড়সড় ধর্মঘট বা অচল অবস্থার রূপ নিতে পারত। ঠিক এই রকম একটা বিস্ফোরক পরিস্থিতিতে পুরসভার সম্পূর্ণ অচল অবস্থা কাটাতে বাধ্য হয়েই আজ থেকে সেখানে পুর প্রশাসক বসানোর সিদ্ধান্ত নেয় রাজ্য সরকার।

    এই গোটা ডামাডোল নিয়ে মুখ খুলেছেন খোদ তারকেশ্বরের বিধায়ক সন্তু পান। তিনি কার্যত বাধ্য হয়েই স্বীকার করে নিয়েছেন যে পরিস্থিতি তাঁদের হাতের বাইরে চলে গিয়েছিল। বিধায়ক জানিয়েছেন, এই কড়া সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে একটাই বড় কারণ ছিল। যিনি পুরসভার চেয়ারে বসেছিলেন, অর্থাৎ পুরপ্রধান, তাঁর সঙ্গে গত ১৫-২০ দিন ধরে কোনওভাবেই যোগাযোগ করা যাচ্ছিল না। তাঁর মোবাইল বন্ধ ছিল, বাড়িতেও খোঁজ মেলেনি। ফলে শহরের বিভিন্ন জরুরি কাজ আটকে যাচ্ছিল, বিশেষ করে পুরসভার কর্মীদের বেতন দেওয়া নিয়ে বড় সমস্যা তৈরি হয়েছিল। বিধায়ক বলেন যে তাঁরা একটা দ্রুত সমাধান চেয়েছিলেন, কারণ এভাবে একটা শহর চলতে পারে না। তাই তিনি নিজে নগরোন্নয়ন দপ্তর বা ইউডিএম (UDM) সেক্রেটারির কাছে লিখিতভাবে সমস্ত বিষয় জানান এবং চিঠি দেন। সেই চিঠির প্রাপ্তি স্বীকার করেই অবশেষে নবান্ন এই পুর বোর্ড ভেঙে প্রশাসক বসানোর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেয়।

    এখন বড় প্রশ্ন হলো, প্রশাসক বসিয়ে কি সত্যিই সমস্যার সমাধান হবে? বিধায়কের এই বক্তব্য থেকে একটা বিষয় পরিষ্কার— দলের ভেতরে সমন্বয়ের অভাব এবং নেতাদের উপর নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে গেছে। ১৫-২০ দিন ধরে একটা পুরসভার চেয়ারম্যান বেপাত্তা, আর দল তা চেয়ে চেয়ে দেখল? এটা কি স্রেফ প্রশাসনিক ব্যর্থতা নাকি এর পেছনে বড় কোনও রাজনৈতিক সমীকরণ বা ‘কাটমানি’র ভাগ বাঁটোয়ারা নিয়ে গোলমাল আছে, তা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে তারকেশ্বরের চায়ের দোকানে।

    তাছাড়া, আমলা দিয়ে পুরসভা চালানো সাময়িক স্বস্তি দিতে পারে, কিন্তু তা কখনোই স্থায়ী সমাধান নয়। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় মানুষ ভোট দিয়ে তাঁদের প্রতিনিধি নির্বাচন করেন এই আশায় যে বিপদে-আপদে তাঁদের পাশে পাওয়া যাবে। কিন্তু ভোটের পরেই যদি সেই প্রতিনিধিরা দুর্নীতির দায়ে পালিয়ে বেড়ান বা দলীয় কোন্দলের কারণে কাজ বন্ধ করে দেন, তবে সাধারণ মানুষের করের টাকায় চলা এই প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর থেকে মানুষের বিশ্বাসটাই উঠে যায়। তারকেশ্বরের মানুষ এখন বলছেন, নেতারা ভোট নিলেন, দুর্নীতি করলেন, আর এখন শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে সাধারণ জনগণকে।

    শ্রাবণী মেলার মতো একটা মেগা ইভেন্টকে একজন সরকারি আমলা কতখানি সুষ্ঠুভাবে সামলাতে পারবেন, তা নিয়ে অনেকেই সংশয়ে আছেন। কারণ মেলা সামলানোর জন্য যে রাজনৈতিক ও সামাজিক জনসংযোগের প্রয়োজন হয়, তা একজন আমলার পক্ষে করা কঠিন। তবে সাধারণ মানুষের একটাই স্বস্তি, অন্ততপক্ষে আটকে থাকা সার্টিফিকেটগুলো এবার মিলবে এবং অস্থায়ী কর্মীরা তাঁদের বকেয়া বেতন পাবেন।  বিধায়ক সন্তু পান চিঠি দিয়ে প্রশাসক বসিয়ে হয়তো সাময়িকভাবে ড্যামেজ কন্ট্রোল করলেন, কিন্তু মানুষের মনের ক্ষোভ কি তাতে মিটবে? আগামী দিনে যখন আবার পুরভোট হবে, তখন এই পলাতক নেতাদের মুখ দেখিয়ে তৃণমূল কীভাবে মানুষের কাছে ভোট চাইবে, সেটাই এখন লাখ টাকার প্রশ্ন। তারকেশ্বর পুরসভার এই অচল অবস্থা এবং প্রশাসক রাজের সূচনা আগামী দিনে হুগলি জেলার রাজনীতিতে কোন নতুন মোড় আনে, এখন সেটাই দেখার।

    রিপোর্টারঃ পার্থ রাহা
     
  • Link to this news (আজ তক)