এই সময়: সুপার এল নিনিও'র সামনে ভারত। চলতি জুলাই থেকে আগামী ১২ মাসে দেশে শক্তি উৎপাদন এবং বিদ্যুৎ চাহিদার মধ্যে ব্যবধান পৌঁছে যেতে চলেছে কমপক্ষে ১৮ টেরাওয়াট-আওয়ার্সে। তাঁদের সম্প্রতি প্রকাশিত রিপোর্টে এমনটাই দাবি করেছেন সেন্টার ফর রিসার্চ অন এনার্জি অ্যান্ড ক্লিন এয়ার (সিআরইসিএ) কর্তৃপক্ষ। একই সঙ্গে তাঁরা আরও জানিয়েছেন, এই এল নিনিও'র প্রভাবে লক্ষ্যণীয় ভাবে দেশে কমতে চলেছে বায়ু এবং জলবিদ্যুৎ উৎপাদন।
কী ভাবে এই ব্যবধান ঘোচানো যাবে, সেটা এক দিকের চিন্তা। তেমনই কয়েনের উল্টো পিঠটা হচ্ছে, এর জন্য জীবাশ্ম জ্বালানি (কয়লা) পুড়িয়ে যে পরিমাণ শক্তি উৎপাদন না বাড়ালেই নয়, তাতে অন্তত ১.৭ কোটি টন (১,৭০০ কিলোগ্রাম) অতিরিক্ত কার্বন-ডাই-অক্সাইড পরিবেশে মিশতে চলেছে, যা বায়ু দূষণের মাত্রাকে বাড়িয়ে দেবে অনেকটাই।
এখন সিআরইসিএ বিশেষজ্ঞদের দাবি, যত গরম বাড়বে, তত ঘরে ঘরে বাড়তে থাকবে এসি-কুলার এর মতো 'কুলিং সলিউশনের' ব্যবহার। শুধুমাত্র যার জেরে আগামী ১ বছরে দেশে শক্তির চাহিদা বাড়বে কমবেশি ১০ টেরাওয়াট-আওয়ার্স। বোঝার সুবিধার জন্য ধরে নিন, যা গোটা নয়াদিল্লির বার্ষিক জ্বালানি খরচের প্রায় ২৫%। আর যাঁরা এই কুলিং সলিউশনের বাহুল্য দেখানোর মতো আর্থ-সামাজিক পরিস্থিতিতে নেই, আগের প্রত্যেক বছরের তুলনায় আগামী এক বছরে তাঁদের মধ্যে ২,৭০০ জন বেশি দেশবাসী গরম-জনিত কারণে প্রাণ হারাবেন।
বিপদ সেখানেই শেষ নয়। রিপোর্টে আরও দাবি করা হয়েছে, সাম্প্রতিক অতীতে দেশের ইতিহাসে অন্যতম 'হটেস্ট সামার' কাটাতে হয়েছে। যেখানে বিদ্যুৎশক্তি চাহিদা পৌঁছে গিয়েছিল সর্বকালীন রেকর্ড ২৭০ গিগাওয়াট-আওয়ার্সে। এ বার সুপার এল নিনিও'র সম্মুখীন হয়ে চ্যালেঞ্জটা আরও বড় হতে চলেছে। আবহবিদদের আশঙ্কা সত্যি হলে, বাড়তি চাহিদা মেটাতে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ শক্তি উৎপাদন আরও বাড়িয়ে নিয়ে যেতে হতে পারে ২৪ টেরাওয়াট-আওয়ার্সে। ফলে আরও চাপ বাড়তে চলেছে বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী গ্রিডগুলির উপর। উল্টো দিকে বৃষ্টির ঘাটতিতে চাষবাসের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হতে বাধ্য। যার জেরে সার্বিক ভাবে প্রকৃতির এমন সাঁড়াশি আক্রমণের সামনে পড়তে চলেছে ভারত, যে পরিমাণ প্রাকৃতিক 'ধাক্কা' বিশ্বের দ্বিতীয় কোনও দেশকে ভুগতে হবে না।
প্রশ্ন তোলা যেতেই পারে, ২০২৫-২৬ সালে যে দেশ ১,৮৪৬ বিলিয়ন (১,৮৪,৬০০ কোটি) ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে, সেখানে সিআরইসিএ কর্তৃপক্ষের বলা ঘাটতি একদমই নগণ্য, ১ শতাংশেরও কম। এটা উৎপাদন করে ফেলা কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কোনও চ্যালেঞ্জই নয়। কিন্তু সিআরইসিএ বলছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন-জোগানের মধ্যে ঘাটতির পরিমাণটা তাঁদের চিন্তার মূল কারণ নয়। তাঁরা উদ্বিগ্ন এর ফলে কয়লা থেকে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়তে হতে পারে কেন্দ্রকে, তা বায়ুদূষণের মাত্রা, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন যে হারে বাড়িয়ে দেবে, তা অপূরণীয় ক্ষতি করে দিতে পারে পরিবেশের। সেই দিকটাকে প্রাধান্য দিয়ে বিকল্প অচিরাচরিত উৎস, সোলার এনার্জির আরও ব্যাপক ব্যবহারের ব্লুপ্রিন্ট কষতে হবে কেন্দ্রকে।
সিআরইসিএ ডিরেক্টর নন্দীকেশ শিবলিঙ্গম-এর কথায়, 'গত অর্থ বছরে দেশে কয়লা থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদন ৩.৬৯% কমানো হয়েছিল আগের বছরের তুলনায়। পাশাপাশি সৌরালোক এবং বায়ু থেকে শক্তি উৎপাদনের পরিমাণ ২.১ টেরাওয়াট-আওয়ার্স কমানো হয়েছিল তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলির স্বাভাবিক কাজকর্ম চালু রাখতে। যা আগামী দিনে বড় সমস্যার কারণ হতে পারে। ব্যাটারি এবং গ্রিডগুলির সংস্কার ও পরিমার্জন আরও দ্রুততার সঙ্গে না করলে চাহিদা এবং জোগান ক্ষমতার মধ্যে এমন তফাৎ হতে পারে, যা কঠিন সমস্যার কারণ হতে পারে।' এখন প্রশ্ন হচ্ছে, কোন পথে এগোবে কেন্দরীয় সরকার।