• বারুইপুরে সীমাহীন বর্বরতা! পুকুরপাড়ের ঝোপই অকুস্থল জেরায় স্বীকার আনন্দের
    বর্তমান | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা ও সংবাদদাতা, বারুইপুর: বর্বরতারও যদি কোনো সীমা থাকে, বারুইপুরে আনন্দ অ্যান্ড কোম্পানি তার সবটাই ছাপিয়ে গিয়েছিল। নৃশংস অত্যাচারই শুধু নয়, অস্বাভাবিক ও বিকৃত যৌন লালসারও শিকার হয়েছে সূর্যপুরহাটের নাবালিকা। পুলিশ ও মর্গ সূত্রে জানা যাচ্ছে, গণধর্ষণের সময় তার ঠোঁট ও জিভ কামড়ে প্রায় ছিঁড়ে নিয়েছে দুষ্কৃতীরা। মৃতদেহের ‘প্রাইভেট পার্টে’র দু’দিকেই অসংখ্য গুরুতর আঘাতের চিহ্ন। এমনকি ‘পেরিঅ্যানাল’ অংশও ক্ষতবিক্ষত ছিল তার। মোটিভ? বিকৃত যৌনলিপ্সা পরিপূর্ণ করা। আর তা জেরায় স্বীকারও করেছে গণধর্ষণ-খুন কাণ্ডে মূল অভিযুক্ত আনন্দ সরদার। এই কারণেই অপহরণ, নির্যাতন এবং খুন। মুক্তিপণ আদায়ের কোনো ভাবনাই তাদের মাথায় ছিল না বলে দাবি পুলিশের। এখানেই শেষ নয়, অকুস্থলও চিহ্নিত করে ফেলেছেন তদন্তকারী অফিসাররা। সূর্যপুরের যে পুকুরে নাবালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছিল, তার পাশের ঘন জঙ্গলের মতো ঝোপ। সেটাই ছিল আনন্দ-দিবাকরদের মদ-গাঁজা খাওয়ার ঠেক। আড্ডাখানা। একদিকে পুকুর, অন্যদিকে রেললাইন। একেবারে নির্জন এলাকা। পুলিশ সূত্রে খবর, আনন্দ স্বীকার করেছে, এই ঝোপেই নাবালিকার উপর নির্যাতন চালানো হয়েছিল। প্রভাস নাবালিকাকে ঝোপের কাছে নিয়ে গিয়েছিল। সেখানে আগে থেকেই ছিল আনন্দ, দিবাকররা।

    তদন্তে জানা গিয়েছে, প্রভাস নাবালিকার মুখ চেপে ওই ঝোপের আড়ালে নিয়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে আনন্দ। যোগ দেয় দিবাকর, প্রভাসও। চিৎকার ও প্রবল প্রতিরোধ শুরু করে নাবালিকা। ততই বাড়তে থাকে নিগ্রহের মাত্রা। দিবাকর ও প্রভাস মিলে তার হাত-পা বেঁধে ফেলে। চেপে ধরে মুখ। তারপরও চিৎকারের চেষ্টা করায় মেয়েটির মাথায় সজোরে আঘাত করা হয়। বারবার। এই ইঙ্গিত রয়েছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও। মাথায় আঘাত বা ঠুকে দেওয়াটা মৃত্যুর প্রাথমিক কারণ বলে উল্লেখ করা হয়েছে তাতে। জেরায় আনন্দ আরও জানিয়েছে, তারা বুঝেছিল, এই অবস্থায় নাবালিকাকে ছেড়ে দিলে বিপদ। তাই খুন করতে হবে। লোপাট করতে হবে দেহ। চরম বর্বরতায় অসুস্থ হয়ে পড়েছিল সে। ওই অবস্থাতেই লাগাতার আঘাত করে পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় নাবালিকাকে। এর উল্লেখও আছে ময়নাতদন্তের রিপোর্টে—মৃত্যুর দ্বিতীয় কারণ, ‘অ্যান্টিমর্টেম (মৃত্যুর পূর্বে) ড্রাউনিং’। কিন্তু পুকুর কেন? অভিযুক্তরা পুলিশকে জানিয়েছে, জলে দেহ ভেসে উঠলে সবাই ভেবে নেবে, ডুবে মারা গিয়েছে। ধর্ষণ-খুন প্রমাণ হবে না। এমনকি তাদের প্ল্যান ছিল, দেহ উদ্ধার হলে তারা অকুস্থলে থাকবে। সবার সঙ্গে গলা মিলিয়ে দোষীদের চরম শাস্তি চাইবে। কিন্তু শেষমেশ প্ল্যান ভেস্তে যায়।

    মঙ্গলবার রেললাইনের ধারের ওই পুকুর ও ঝোপ-জঙ্গল, অর্থাৎ প্লেস অব অকারেন্সে যান রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা। যেখানে মেয়েটির দেহ পড়েছিল, সেই এলাকা খতিয়ে দেখেন। যেখান থেকে তাকে ‘অপহরণ’ করা হয়েছিল, পরিদর্শন করেন সেই জায়গাও। তদন্তের গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে বিস্তারিত খোঁজও নেন তিনি। জানা যাচ্ছে, পুকুরে ফেলার সময় নেশাগ্রস্ত আনন্দ-দিবাকররা ভেবেছিল, মেয়েটি মারা গিয়েছে। কিন্তু সে বেঁচেছিল তখনও। পাকস্থলী থেকে উদ্ধার হওয়া খাবারের অংশ থেকে মৃত্যুর সঠিক সময় বের করার চেষ্টা করছেন ময়নাতদন্তকারীরা। পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার পর রেললাইন ধরে হেঁটে আনন্দরা যে যার বাড়ি চলে যায়। সেখানে পোশাক বদল করে। এরপরও ধরা পড়ে যায় আনন্দ ও প্রভাস। যদিও ক্যাম্প থেকে কোনোক্রমে ‘উধাও’ হয়ে যায় সে। পালিয়ে গা ঢাকা দেয় গ্রামে। মঙ্গলবার তাকে বারুইপুর আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের পুলিশ হেপাজতের নির্দেশ দিয়েছেন বিচারক।
  • Link to this news (বর্তমান)