• অবশেষে আশার আলো! সাফল্য HIV ভ্যাকসিন তৈরির পথে
    এই সময় | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • এই সময়: এইচআইভি টিকা তৈরির পথে বড় সাফল্য এলো। খুবই প্রাথমিক হলেও ভবিষ্যতে মানুষের জন্য কার্যকর এইচআইভি ভ্যাকসিন তৈরির ক্ষেত্রে এই সাফল্যকে বড় করেই দেখছেন বিশেষজ্ঞরা। ১৪ বছরের গবেষণার ফলে বানরের শরীরে মিলেছে নজিরবিহীন প্রতিরোধ ক্ষমতা। এই সংক্রান্ত গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বিজ্ঞানপত্রিকা ‘নেচার’-এ। বাঁদরের শরীরে ৪৪% ক্ষেত্রে এই সাফল্য মিলেছে। তবে এইচআইভি অত্যন্ত পরিবর্তনশীল ভাইরাস হওয়ায় এর বিরুদ্ধে নির্ভরযোগ্য অ্যান্টিবডি তৈরি করাই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

    ১৯৮০-র দশকে এইচআইভি সংক্রমণের জেরে জন্ম নেওয়া এইডস বিশ্বজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়েছিল। পরে অ্যান্টি-রেট্রোভাইরাল ওষুধে সংক্রমণ অনেকটা নিয়ন্ত্রণে এলেও কার্যকর প্রতিষেধক এখনও অধরা। সেই দীর্ঘ অপেক্ষার মাঝেই নতুন আশার খবর শুনিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। বাঁদরের শরীরে পরীক্ষামূলক একটি এইচআইভি টিকা এমন প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করতে পেরেছে, যা এই গবেষণাক্ষেত্রে এখনও পর্যন্ত অন্যতম বড় সাফল্য বলে দাবি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে মানব–শরীরেও টিকাটির প্রথম পর্যায়ের ক্লিনিক্যাল ট্রায়াল শুরু হয়েছে।

    আমেরিকার লা জোলা ইনস্টিটিউট ফর ইমিউনোলজি এবং আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা ইন্টারন্যাশনাল এইডস ভ্যাকসিন ইনিশিয়েটিভের ১৪ বছরের যৌথ গবেষণার ফল এই টিকা। বিজ্ঞানীদের দাবি, ৪৪% বাঁদরের শরীরে এটি প্রথম বার উচ্চমাত্রায় ‘ব্রডলি নিউট্রালাইজিং অ্যান্টিবডিজ়’ (bnAbs) তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। এই বিশেষ অ্যান্টিবডি দ্রুত মিউটেশনের ফলে তৈরি হওয়া এইচআইভি–র একাধিক ভ্যারিয়েন্টের বিরুদ্ধে একসঙ্গে লড়তে পারে। তাই ৪৪% সাফল্যকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

    এইচআইভি–র টিকা তৈরি কেন এত কঠিন? গবেষকদের ব্যাখ্যা, ভাইরাসটি অত্যন্ত দ্রুত জিনগত পরিবর্তন ঘটায় এবং নিজের বাইরের আবরণে শর্করার (গ্লাইক্যান) স্তর তৈরি করে প্রতিরোধ ব্যবস্থার চোখ এড়িয়ে যায়। ফলে সাধারণ টিকার মাধ্যমে তৈরি অ্যান্টিবডি দ্রুত অকার্যকর হয়ে পড়ে। নতুন গবেষণায় সেই বাধা কাটাতে প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ধাপে ধাপে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কৌশল নেওয়া হয়েছে, যাতে শেষ পর্যন্ত bnAbs তৈরি হয়।

    ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ সৌরীশ ঘোষ বলেন, ‘বহু বছরের চেষ্টার পর প্রথম বার অন্তত বাঁদরের শরীরে এত শক্তিশালী bnAbs প্রতিক্রিয়া দেখা গিয়েছে, যা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। তবে এটি এখনও প্রাক-ক্লিনিক্যাল স্তরের গবেষণা। মানুষের শরীরে নিরাপত্তা ও কার্যকারিতা প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত এটিকে ষোলো আনা সাফল্য বলা যাবে না।’ তাঁর মতে, এই গবেষণাটির বড় বিশেষত্ব হলো, এইচআইভি–র বারংবার পরিবর্তিত অংশ নয়, বরং তুলনামূলক ভাবে অপরিবর্তিত অংশকে লক্ষ্য করে প্রতিরোধ গড়ে তোলার চেষ্টা।

    আর এক ভাইরোলজি বিশেষজ্ঞ সিদ্ধার্থ জোয়ারদার বলেন, ‘ভ্যাকসিনটি তৈরি করতে সম্পূর্ণ নতুন কৌশল নেওয়া হয়েছে। ভাইরাসের এনভেলপের একটি নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনকে ব্যবহার করে এমন ভাবে প্রতিরোধ ব্যবস্থা তৈরি করার চেষ্টা হয়েছে, যাতে ভাইরাস মিউটেশন করেও সহজে ইমিউনিটিকে ফাঁকি দিতে না পারে।’ তিনি জানান, প্রথমে শক্তিশালী bnAbs-এর বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে উপযুক্ত অ্যান্টিজেন নির্বাচন করা হয়েছে, পরে ধাপে ধাপে বুস্টারের মাধ্যমে প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে। তবে তাঁর মতে, ‘শেষ কথা বলবে মানুষের উপর চলা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের ফল।’

    বিজ্ঞানীদেরও একই সতর্কবার্তা— এই সাফল্য এখনও পরীক্ষাগারের গণ্ডিতেই সীমাবদ্ধ। মানব–শরীরে চলা ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালে টিকাটি নিরাপদ ও কার্যকর প্রমাণিত হলে এইচআইভি প্রতিরোধে নতুন যুগের সূচনা হতে পারে। তবে চার দশকের ব্যর্থতার ইতিহাসের পরে এই গবেষণা যে এইচআইভি টিকার সন্ধানে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক, সে বিষয়ে নিঃসন্দেহ বিশেষজ্ঞরা।

  • Link to this news (এই সময়)