এই সময়, বারুইপুর ও কলকাতা: নিখোঁজ ডায়েরি যখন হলো বারুইপুর থানায়, ক্লাস সিক্সের সেই ছাত্রী তখনও বেঁচে। নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার দেড় ঘণ্টা পরে পুলিশ গেল বালিকাটির পাড়ায়। ধর্ষিত ওই বালিকাকে তার আধ ঘণ্টা আগে অজ্ঞান অবস্থায় পুকুরে ফেলে দেওয়া হয় বলে বিশেষ তদন্তকারী দলের (‘সিট’) প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে— এমনটাই পুলিশের একটি সূত্রের খবর।
ক্লাস সিক্সের ছাত্রীটিকে খুঁজে না–পেয়ে বাড়ির লোকজন বারুইপুর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন শনিবার রাত ৮টা নাগাদ। তার ঘণ্টা দেড়েক পরে, রাত ১০টা নাগাদ বারুইপুর থানার পুলিশ ওই তল্লাটে পৌঁছয়। বারুইপুর থানা থেকে ওই তল্লাট ৯ কিলোমিটার দূরে। গাড়িতে মিনিট কুড়ির পথ। পুলিশ সূত্রের খবর, প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, ১১ বছরের ওই বালিকাকে তার বাড়ি থেকে দেড় কিলোমিটার দূরে রেললাইনের ধারে একটি ঝোপে ধর্ষণ, শারীরিক অত্যাচার ও বেড়ধক মারধরের পরে সংজ্ঞাহীন অবস্থায় রেললাইনেরই লাগোয়া একটি পুকুরে যখন ফেলা হয়েছিল, শনিবার তখন রাত সাড়ে ৯টা বেজেছে। ওই তথ্য অনুযায়ী, বালিকাকে পুকুরে ফেলার সময়টা নিখোঁজ ডায়েরি হওয়ার ঘণ্টা খানেক পরে, সরেজমিনে পুলিশি অনুসন্ধান শুরু হওয়ার আধ ঘণ্টা আগে।
ময়না–তদন্ত রিপোর্ট বলছে, ওই ছাত্রীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ— জলে ডোবা। অর্থাৎ, পুকুরে অচৈতন্য অবস্থায় তাকে ফেলার পরেও ওই ছাত্রীর দেহে কিছুক্ষণ প্রাণ ছিল। তবে শনিবার রাত ১০টা নাগাদ বালিকাটির পাড়ায় বারুইপুর থানার পুলিশ পৌঁছে নিখোঁজ ছাত্রীর কয়েক জন বান্ধবী, বাড়ির লোকজন ও আরও কয়েক জনের সঙ্গে কথা বলে এবং ওই তল্লাটের কয়েকটি সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে কিছুক্ষণ পরে ফিরে যায়। কিন্তু পুলিশ চলে গেলেও হাল ছেড়ে না–দিয়ে স্থানীয়রা আরও কিছু সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ খতিয়ে দেখে শেষমেশ রাত ২টো নাগাদ একটি ফুটেজে প্রভাস মণ্ডলের (অন্যতম অভিযুক্ত) সঙ্গে বালিকাটিকে বিকেল পৌনে ৫টায় যেতে দেখা যায়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, প্রভাসকে স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে রাত ৩টে নাগাদ নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পাওয়া যায় আনন্দ সর্দারের (আর এক অভিযুক্ত) নাম। তাকেও স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া হয় রবিবার ভোরে। কিন্তু রবিবার সকাল ৬টা নাগাদ প্রভাসকে নিয়ে যখন সেই পুকুরের দিকে বালিকার দেহ উদ্ধার করার জন্য পুলিশ–সহ স্থানীয়রা যাচ্ছেন, তখন আনন্দ ছিল না। পুলিশ সূত্রের খবর, রবিবার ভোরে আনন্দ পালায় ওই পুলিশ ক্যাম্প থেকে (সোমবার দুপুরে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়)। রবিবার ভোরে আনন্দ কী ভাবে পালাল, তাকে পালাতে কেউ সাহায্য করেছিল কি না, তদন্তে সেটা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, রবিবার বিকেল সাড়ে ৫টায় বালিকার দেহের ময়না–তদন্ত শুরু হয়, তার ১৭ ঘণ্টা থেকে ২৫ ঘণ্টা আগে বালিকাটির মৃত্যু হয়েছে বলে চিকিৎসকরা অনুমান করছেন। অর্থাৎ, বালিকাটির মৃত্যু হয়েছে শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টে থেকে রাত সাড়ে ১২টার মধ্যে কোনও এক সময়ে।
বারুইপুরের ঘটনায় পুলিশের এক শতাংশও শিথিলতা প্রমাণ হলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে বলে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী মঙ্গলবার জানিয়েছেন। এ দিন বিকেলে বারুইপুর পুলিশ সুপারের অফিসে গিয়ে পুলিশকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক ও নিহত ছাত্রীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পরে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রসঙ্গে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের লোকেদের যদি ওই সময়ের মধ্যে এক শতাংশও শিথিলতা থাকে, তা হলে কড়া পদক্ষেপ করা হবে।’ পুলিশের ভূমিকা নিয়ে রাজ্য পুলিশের ডিজি সিদ্ধনাথ গুপ্তাকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে রিপোর্ট দেওয়ারও নির্দেশ দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। বারুইপুরের যে পুকুর থেকে বালিকাটির দেহ উদ্ধার হয়, সেই জায়গা ও আশপাশের তল্লাট এ দিন ডিজি ঘুরে দেখেন। পুলিশের ভূমিকা নিয়ে নির্যাতিতার পরিবার ও স্থানীয়দের কিছু প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ, পুলিশ দেরিতে ‘রিঅ্যাক্ট’ করেছে। পুলিশ ঠিক সময়ে ঠিক ভাবে তৎপর হলে শনিবার রাতে বালিকাটিকে হয়তো জীবিত অবস্থায় উদ্ধার করা যেত বলে স্থানীয়রা তো বটেই, বিভিন্ন মহলেরও দাবি। এ ব্যাপারে প্রশ্ন করা হলে ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা বলেন, ‘আমরা সব বিষয় খতিয়ে দেখছি। পুলিশের ভূমিকায় প্রশ্ন আছে, দেরিতে রেসপন্স করেছে। গোটা বিষয়ের তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বারুইপুরের ধর্ষণ ও খুনের ঘটনায় পুলিশি তদন্ত নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে তৃণমূলের কালীঘাট শিবির। তাদের সোশ্যাল মিডিয়া পেজে একটি ভিডিয়ো পোস্ট করা হয়েছে ( ‘এই সময়’ ওই ভিডিয়োর সত্যতা যাচাই করেনি)। ওই ভিডিয়োয় দেখা যাচ্ছে, দু’জন পুলিশকর্মীর সামনে বাকবিতণ্ডা তলছে কয়েক জন ব্যক্তির। তৃণমূলের ফেসবুক পেজে লেখা হয়েছে, ‘রাজা নামে এক জন অভিযুক্তকে পুলিশ রক্ষা করার চেষ্টা করছে বলে মনে হচ্ছে। কেন? কারণ, সে নাকি বিজেপির কর্মী।’ যদিও বিজেপির যাদবপুর সাংগঠনিক জেলার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বজিৎ পালের বক্তব্য, ‘ওই এলাকায় রাজা নামে আমাদের দলে কেউ নেই।’ সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলছেন, ‘সাধারণ মানুষ বিজেপির এক স্থানীয় নেতার নামে অভিযোগ করেছেন। যিনি এক অভিযুক্তকে বার করে নিয়ে যান। কে সেই ব্যক্তি যিনি অভিযুক্তকে ছাড়িয়ে নিয়ে যান?’ গোটা ঘটনায় গোড়া থেকেই বিজেপির বারুইপুর–পশ্চিমের ৩ নম্বর মণ্ডলের সম্পাদক শান্তনু মণ্ডলের বিরুদ্ধে ভূমিকা নিয়ে বিরোধী অভিযোগ উঠেছে। রবিবার সকাল থেকেই শান্তনু বারুইপুর থানায় আটক বলে সূত্রের খবর। তবে বিজেপি নেতা বিশ্বজিৎ জানিয়েছিলেন, অভিযুক্তকে পুলিশের হাতে তুলে দিয়ে প্রশাসনকে শান্তনু সাহায্যই করেছেন।
তদন্তে এখনও পর্যন্ত চার জনের জড়িত থাকার কথা জানা গিয়েছে। তাদের মধ্যে তিন জনকে গ্রেপ্তার করা হলেও প্রবীর মণ্ডল এখনও পলাতক। পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, গণপিটুনিতে নিহত যে যুবকের নাম ইন্দ্রজিৎ তাঁতি বলে জানা গিয়েছিল, তার নাম আসলে ইন্দ্রজিৎ মণ্ডল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী এ দিন বলেন, ‘পুলিশের থেকে যা জেনেছি, অবিবাহিত ওই যুবক নির্দোষ ছিলেন। নির্দোষ ওই যুবককে যারা পিটিয়ে মেরেছে, তাদের কাউকে রেয়াত করা হবে না। ওই যুবকের পরিবারও বিচার পাবে।’ কিন্তু ইন্দ্রজিতের উপর সাধারণ মানুষের ক্ষোভ কেন তৈরি হলো?
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, শনিবার শেষ রাতে আনন্দ সর্দারকে স্থানীয় পুলিশ ক্যাম্পে নিয়ে আসার পরে সে কয়েক জনের নাম বলে, যাদের অন্যতম ওই ইন্দ্রজিৎ। স্থানীয় সূত্রের খবর, পেশায় অটোরিকশা চালক ইন্দ্রজিৎ নেশা করতেন, পেশায় গাড়ি আনন্দর সঙ্গে মাঝেমধ্যেই দেখা যেত তাঁকে। ইন্দ্রজিতের নাম আনন্দ বলেছে জেনে এবং রবিবার সকালে বালিকাটির দেহ উদ্ধার হওয়ার পরে ক্ষিপ্ত দেড়শো–দু’শো লোক চড়াও হয় ওই যুবকের বাড়িতে। ইন্দ্রজিৎকে তাঁর মা–বাবার হাত থেকে কার্যত ছিনিয়ে নিয়ে ক্ষিপ্ত জনতা তাঁকে প্রকাশ্য রাস্তার উপর পিটিয়ে মেরে ফেলে বলে পুলিশ জানিয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্রে জানা গিয়েছে, বারুইপুরের ওই তল্লাটে একটি কেজি স্কুলের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ ঘেঁটে স্থানীয়রা শনিবার রাত ২টো নাগাদ দেখেন, বালিকাটি বিকেল পৌনে ৫টা নাগাদ টুপি পরা একটি লোকের সঙ্গে যাচ্ছে। সেই ব্যক্তির পরিচয় কিন্তু স্থানীয়রা জানতে পারেননি। ওই ছবি পাঠানো হয় বিভিন্ন জনকে। শেষমেশ, বকখালিতে বেড়াতে যাওয়া বারুইপুরের এক সিভিক ভলান্টিয়ার ওই ছবি পেয়ে তিনিই টুপি পরা ব্যক্তিকে প্রভাস মণ্ডল বলে শনাক্ত করেন। পুলিশ সূত্রের দাবি, ধৃতদের মধ্যে আনন্দ সর্দার ও দিবাকর সর্দার ধর্ষণের কথা মঙ্গলবার রাত পর্যন্ত স্বীকার না–করলেও প্রভাস মণ্ডল বালিকাকে ধর্ষণের কথা স্বীকার করেছে।
বারুইপুরের মামলায় বিভাস চট্টোপাধ্যায়কে স্পেশাল পাবলিক প্রসিকিউটর (পিপি) হিসেবে মঙ্গলবার রাজ্য সরকার নিয়োগ করেছে।