• উত্তরকন্যায় এবার নিয়মিত বসবেন 7 মন্ত্রী ! ঘুচবে অবহেলার 'অপবাদ'
    eTV Bharat | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • শিলিগুড়ি, 7 জুলাই: উত্তরবঙ্গের প্রশাসনিক সদর দফতর 'উত্তরকন্যা'কে কার্যত পূর্ণাঙ্গ শাখা সচিবালয়ে পরিণত করার পথে হাঁটছে রাজ্য সরকার৷ দীর্ঘদিনের অভিযোগ ছিল, উত্তরকন্যায় অধিকাংশ মন্ত্রীর দফতর থাকলেও সেগুলি প্রায় সারাবছরই বন্ধ থাকত৷ ফলে সাধারণ মানুষের বহু প্রশাসনিক কাজের জন্য শেষ পর্যন্ত কলকাতারই দ্বারস্থ হতে হত৷ সেই ছবিই বদলাতে উদ্যোগী হয়েছে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সরকার৷ প্রশাসন সূত্রের খবর, উত্তরকন্যায় নিয়মিত বসবেন উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী-সহ মোট সাত জন মন্ত্রী৷ একই সঙ্গে জোরকদমে তৈরি হচ্ছে তাঁদের দফতর ও পরিকাঠামো৷

    ঐতিহ্যের বঞ্চনা ও উত্তরকন্যার ইতিহাস

    উত্তরবঙ্গবাসীর মনে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ ছিল যে, বামফ্রন্ট আমল থেকেই এই অঞ্চল চরম অবহেলিত ও বঞ্চিত৷ তৎকালীন ফরওয়ার্ড ব্লক নেতা তথা প্রাক্তন প্রয়াত মন্ত্রী কমল গুহ উত্তরবঙ্গের বঞ্চনার বিরুদ্ধে সরব হয়ে এখান থেকে উপমুখ্যমন্ত্রী করার দাবি পর্যন্ত তুলেছিলেন৷ পরবর্তীতে তাঁর দাবির ভিত্তিতেই উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন পর্ষদ গঠন করা হয়েছিল৷ বাম জমানার অবসানের পর তৃণমূল সরকারের আমলে তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় উত্তরবঙ্গবাসীর সুবিধার্থে শিলিগুড়ির উপকণ্ঠে ফুলবাড়ির কাছে এই মিনি সচিবালয় 'উত্তরকন্যা' নির্মাণ করেন৷

    2012 সালের নভেম্বর মাসে এর শিলান্যাস হওয়ার পর 2014 সালের 20 জানুয়ারি অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে ভবনটির দ্বারোদ্ঘাটন করা হয়েছিল৷ তবে বাস্তব চিত্র ছিল ভিন্ন৷ অভিযোগ রয়েছে, পূর্বতন জমানায় এই সচিবালয়ে শুধুমাত্র উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট দফতরের প্রতিমন্ত্রীর চেম্বারই সচল থাকত৷ এর বাইরে মুখ্যমন্ত্রীর একটি ক্যাম্প অফিস ও বেশ কিছু দফতর থাকলেও, বাকি মন্ত্রীদের অনুপস্থিতির কারণে অধিকাংশ সময় অফিসের দরজা বন্ধই থাকত৷ ফলে উত্তরকন্যার প্রকৃত উদ্দেশ্য পুরোপুরি বাস্তবায়িত হতে পারে নি৷

    যুদ্ধকালীন তৎপরতায় তৈরি হচ্ছে নতুন চেম্বার

    এবার সেই অপবাদ ঘুচিয়ে উত্তরবঙ্গের মানুষের দুয়ারে প্রকৃত প্রশাসন পৌঁছে দিতে ঝাঁপিয়েছে বর্তমান রাজ্য সরকার৷ সচিবালয় সূত্রে জানা গিয়েছে, মন্ত্রীদের নিয়মিত বসার জন্য উত্তরকন্যার অন্দরমহল সম্পূর্ণ নতুন রূপে সাজিয়ে তোলা হচ্ছে৷ একাধিক উচ্চপদস্থ আধিকারিক ও মন্ত্রীদের বসার উপযোগী পরিকাঠামো গড়ে তোলার কাজ চলছে যুদ্ধকালীন তৎপরতায়৷ ইতিমধ্যেই সেখানে মন্ত্রীদের জন্য অত্যাধুনিক চেম্বার বানানোর কাজ শুরু হয়েছে৷

    প্রশাসন সূত্রে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী, উত্তরকন্যায় নিয়মিত বসার জন্য যে মন্ত্রীদের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে, তাঁরা হলেন:

    নিশীথ প্রামাণিক (উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন মন্ত্রী)
    আনন্দময় বর্মন (অর্থ ও পরিবহণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী)
    বিশাল লামা (পার্বত্য বিষয়ক এবং সংখ্যালঘু উন্নয়ন মন্ত্রী)
    মনোজকুমার ওঁরাও (বনমন্ত্রী)
    দীপক বর্মন (স্কুলশিক্ষা তথা এমএসএমই মন্ত্রী)
    শংকর ঘোষ (পর্যটন মন্ত্রী)
    মালতি রাভা রায় (নারী, শিশু বিকাশ ও সমাজকল্যাণ এবং স্বনির্ভর গোষ্ঠী ও স্বনিযুক্তি দফতরের স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী)

    তৎপরতা ও রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া

    এই প্রশাসনিক পদক্ষেপের বিষয়ে অর্থ ও পরিবহণ দফতরের প্রতিমন্ত্রী আনন্দময় বর্মন জানান, উত্তরকন্যায় মন্ত্রীদের নিয়মিত বসার ব্যাপারে সরকারের উচ্চস্তরে পুঙ্খানুপুঙ্খ আলোচনা হয়েছে৷ শুধু তিনি একাই নন, আরও কয়েকজন মন্ত্রীর চেম্বার তৈরি করার কথা চূড়ান্ত হয়েছে৷ অন্যদিকে পার্বত্য বিষয়ক মন্ত্রী বিশাল লামা জানান, উত্তরকন্যায় তাঁদের জন্য নতুন চেম্বার তৈরির কাজ জোরকদমে চলছে এবং আশা করা হচ্ছে, আগামী সপ্তাহ থেকেই মন্ত্রীরা সেখানে নিয়মিত বসা শুরু করবেন৷

    বিজেপি নেতাদের একাংশের মতে, নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরেই উত্তরবঙ্গকে বিজেপির 'ভদ্রাসন' বলে ঘোষণা করেছিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী৷ তিনি স্পষ্ট জানিয়েছিলেন যে, সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হবে উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক উন্নয়ন। উত্তরকন্যায় মালতি রাভা রায়-সহ সাত জন মন্ত্রীকে নিয়মিত বসানোর এই সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত আসলে মুখ্যমন্ত্রীর সেই প্রতিশ্রুতিরই বাস্তব প্রতিফলন৷

    আমলাতান্ত্রিক স্তরে বড়সড় রদবদল

    উত্তরকন্যায় মন্ত্রীদের উপস্থিতির পাশাপাশি প্রশাসনিক কাজকর্মের গতি বাড়াতে আমলাতান্ত্রিক স্তরেও বড়সড় রদবদল করা হচ্ছে৷ প্রশাসনের একাংশ জানিয়েছেন, সাতজন মন্ত্রী নিয়মিত বসলে স্বভাবতই কাজের পরিধি ও ফাইলের চাপ অনেক বাড়বে৷ সেই কারণে উত্তরবঙ্গ উন্নয়ন দফতর-সহ উত্তরকন্যার বিভিন্ন বিভাগে কর্মরত সচিব পদমর্যাদার পদস্থ আধিকারিকদের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হচ্ছে৷ ইতিমধ্যেই এই রদবদলের প্রক্রিয়া শুরু হয়ে গেছে৷ সূত্রের খবর, পেনশন বিভাগের যুগ্ম অধিকর্তাকে জিটিএ (GTA)তে বদলি করা হয়েছে এবং তাঁর পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ পদে জিটিএ-র একজন দক্ষ অফিসারকে নিয়ে আসা হয়েছে৷

    ওয়াকিবহাল মহলের মতে, এই ধরনের পরিকাঠামোগত ও প্রশাসনিক রদবদল উত্তরকন্যার কাজকে আরও চটজলদি ও মজবুত করবে, যা শেষ পর্যন্ত উত্তরবঙ্গবাসীর দীর্ঘদিনের সমস্যা পূরণের আসল কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠতে পারে৷
  • Link to this news (eTV Bharat)