• সপ্তগ্রামের বন্দর থেকে জিআই স্বীকৃতি, ঘুরে দাঁড়াতে পারবে বলাগড়ের শতাব্দী প্রাচীন ‘আদরের নৌকা’রা?
    এই সময় | ০৮ জুলাই ২০২৬
  • ‘ভেসে যায় আদরের নৌকা/ তোমাদের ঘুম ভাঙে কলকাতায়...।’ চন্দ্রবিন্দুর এই গান শুনলে মনে হয়, সবার বুকের গভীরেই বোধহয় একটা শান্ত নদী বয়ে চলেছে। সেখানে কোথাও যাওয়ার তাড়া নেই। ফেলে আসা শৈশব চুপটি করে নোঙর ফেলে জলফড়িং দেখে। কাঠ জুড়ে জুড়ে তৈরি হয় নৌকা। আর ঘাস চিবোতে চিবোতে সেই দিকে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে থাকে এক কিশোর।

    নৌকার সঙ্গে তো নাগরিক জীবনের তেমন কোনও সম্পর্ক নেই। এককালে অবশ্য ছিল। তখন জল আর মানুষের মধ্যে প্রথম সুসম্পর্ক গড়ে তুলেছিল এই নৌকাই। একে আদি সভ্যতার বাহন বললেও অত্যুক্তি হবে না। ডিঙ্গি, পানসি, সওদাগরী, ময়ূরপঙ্খী, বজরা — কত নাম। আজ সবই ইতিহাস। শুধু সেই সময়কে বাস্তবের মাটিতে ধরে রেখেছে হুগলির বলাগড়।

    কয়েক’শো বছর আগেও নদীমাতৃক বাংলার প্রাণ ছিল নৌকা। বলাগড় তার আঁতুড়ঘর। আজও এখানে কাঠ আর বাটালির ঠুকঠাক শব্দ শোনা যায়। শিল্পীর হাতের ছোঁয়ায় রূপ পায় ডিঙ্গি, পানসি। সেই ঐতিহ্যকে স্বীকৃতি দিতেই বলাগড়ের নৌশিল্পকে জিআই তকমা দিয়েছে কেন্দ্রীয় সরকার। এখন তার পালে হাওয়া দিয়েই ঘুরে দাঁড়াতে চাইছেন নৌকা শিল্পী, কারিগররা। চাইছেন, তাঁদের জীবনও জোয়ারের নৌকার মতো তরতরিয়ে ছুটুক।

    জোয়ারের টানেই এক সময়ে সপ্তগ্রাম থেকে ত্রিবেণী হয়ে সাগরে বাণিজ্যে যেতেন চাঁদ সদাগর, শ্রীমন্তরা। তাঁদের সপ্তডিঙা মধুকর যেন আকাশ ছুঁতে চাইত। সারি গান গাইতে গাইতে হাল চালাতেন মাঝিরা। ছপ ছপ আওয়াজ উঠত সরস্বতী নদীতে। সেই সব নৌকা বলাগড়ে তৈরি হতো কি না, ঠিক জানা যায় না। তবে সপ্তগ্রাম বন্দরের সঙ্গে একটা যোগসূত্র ছিল।

    নদী, বন্দর আর ডিঙির জন্মকথা

    সেই সময়ের সপ্তগ্রাম বন্দরের খুব কাছেই এখনকার বলাগড়। স্থানীয় গবেষক তথা বিজয়কৃষ্ণ মহাবিদ্যালয়ের অধ্যক্ষ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ের কথায়, ‘মালবাহী জাহাজ সরাসরি বন্দরে ভিড়তে পারত না। মাল তোলা-খালাস করার জন্য নৌকার প্রয়োজন ছিল। মনে করা হয়, সেই কারণেই বলাগড়ে নৌকার কারখানা গড়ে ওঠে।’ ১৫২৩-১৫২৪-এ ব্যান্ডেলে ঘাঁটি গাড়ে পর্তুগিজরা। তাদের মূলত ব্যবসা-বাণিজ্যই ছিল। এবং সবটাই জলপথে। তাঁরাও বলাগড়ের নৌকা ব্যবহার করতেন বলেই অনুমান পার্থর।

    তা ছাড়া হুগলি বরাবরই ডাকাতদের গড়। বিশ্বেশ্বর রায়, রাঘবেন্দ্র রায়রা গোটা এলাকা দাপিয়ে বেড়াতেন। ডাঙায় রণপা আর জলে ডিঙি নৌকাই ছিল তাঁদের বাহন। কিন্তু নিজেরা বানাতেন না। বলাগড় থেকেই কিনে নিয়ে যেতেন। এখানকার ভৌগোলিক অবস্থানও নৌশিল্পের জন্য আদর্শ। চারপাশে ভাগীরথী, সরস্বতী, বেহুলা, কানা নদী—যেন মাকড়সার মতো জলপথে জাল ছড়িয়ে রেখেছে। নদী যেখানে জীবন, সেখানে নৌকা শুধু যান নয়, জীবিকার অবলম্বন।

    যে ডিঙি থেকে জন্ম নিল অসংখ্য নৌকা

    ডিঙি হল নৌকার মা। তার আকার-আকৃতি বদলালেই নাম বদলে যায়। কিন্তু মূল কাঠামো একই থাকে। ডিঙির গায়ে দ্বিতল কাঠামো তৈরি করলে, সেটা হয়ে যায় বজরা। সামনে ময়ূরের মুখ বসালে ময়ূরপঙ্খী। সাপের মুখ থাকলে সর্প নৌকা। ড্রাগনের আদলে সাজালে ড্রাগন বোট। আবার সরু আর লম্বা করে বানালে সেটাই বাইচের নৌকা। পার্থর কথায়, ‘ভারতের বহু জায়গায় নৌকা তৈরি হয়। কিন্তু শুধু ডিঙির জন্যই শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্প আজও টিকে রয়েছে বলাগড়েই।’

    তবে জোয়ারের পথে ভাঁটার টানও কম নয়। এক সময়ে বলাগড়ের শ্রীপুর, রাজবংশীপাড়া বা তেঁতুলদিয়ায় প্রায় ৫০টি পরিবার কাঠ-বাটালির ছন্দে সংসার চালাত। এখন তা কমতে কমতে ঠেকেছে মাত্র ২০-২২ টিতে। কোথাও পাঁচজন, কোথাও সাতজন, কোথাও দশজন শ্রমিক। নতুন প্রজন্মের নৌকা তৈরিতে মন নেই। কেনই বা থাকবে? সারাদিন খেটেখুটে মাত্র আড়াইশো টাকা মজুরি। সংসার চালাতে নাভিশ্বাস। তাই অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন।

    কাঠের গন্ধে বেঁচে থাকা এক শিল্প

    ‘কাটিল খজুর শাল পিয়লি সিমলি/ চাঁপা নাগেশ্বর কাটে বকুল কাঁঠাল/ নিম নারিকেল কাটে জলপই তাল...।’ নৌকা তৈরির জন্য মনসামঙ্গল কাব্যে এমনই নানা ধরনের কাঠের উল্লেখ রয়েছে। তবে বলাগড়ে বেশি ব্যবহার হয় বাবলা। জলে সহজে নষ্ট হয় না। ওজনও কম। তবে অন্য কাঠ যে একেবারে ব্যবহার হয় না, এমনটা নয়।

    তবে নৌকা তৈরির পদ্ধতিটা একেবারে অন্য রকম। এখানে কাঠের সঙ্গে কাঠের জোড়া লাগানো হয়। নাম ‘জোড়াকাঠ’ পদ্ধতি। এ ভাবে একটা নৌকা তৈরি করতে দু’মাস লাগে। খরচও অনেক। তাই এখন ‘জুলুই’ পেরেক ব্যবহার হয়। দু’দিকেই ধার। আগুনে কাঠ গরম করে ধীরে ধীরে বাঁকানো হয়। তারপর একের পর এক কাঠ জুড়ে তৈরি হয় নৌকা। এক সময়ে শাল, সেগুনেরও নৌকা হতো। কিন্তু দাম অনেক। তাই চাহিদা প্রায় নেই বললেই চলে।

    জিআই স্বীকৃতি—শেষ নয়, নতুন শুরুর আশা

    ২০২২-এ গড়ে ওঠে বলাগড় নৌশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেড। তার পরের বছর জিআই-এর জন্য আবেদন করা হয়। দীর্ঘ শুনানি, নথি যাচাই এবং গবেষণার পর ২০২৫ সালের জুন মাসে আসে বহু প্রতীক্ষিত স্বীকৃতি। এখন প্রতিটি কারখানা নিজস্ব ট্রেডমার্ক লাইসেন্স পেয়েছে। রয়েছে লোগো।

    তবে এতে শিল্পীদের আর্থিক লাভ খুব একটা হবে না বলেই মনে করছেন অনেকে। কারিগরদের একাংশও ভাতার দাবি তুলেছেন। বলাগড় নৌশিল্প সমবায় সমিতি লিমিটেডের সম্পাদক উৎপল বারিকও বলছেন, ‘আর্থিক ভাবে কিছু সুবিধা পেলে ভালো হতো।’ বলাগড়ে একটি ‘মিনি বন্দর’ তৈরির স্বপ্ন বোনা হচ্ছে। যদি সেই বন্দর বাস্তবায়িত হয়, তবে জলপথে আবার নৌকার চাহিদা বাড়বে, হয়তো ফিরে আসবে সেই পুরোনো সুদিন। আধুনিক ফাইবার বোটের যুগে এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবুও এখান থেকে আজও নৌকা ভেসে যায় সুন্দরবনের কাকদ্বীপ কিংবা নামখানার দূর-দূরান্তে। মৎস্যজীবীদের রুটি-রুজি আর বেঁচে থাকার সংগ্রাম জড়িয়ে রয়েছে বলাগড়ের এই ডিঙির সঙ্গে।

    নাগরিক কোলাহলে যখন তিলোত্তমার ঘুম ভাঙবে, ঠিক তখনই হয়তো ভাগীরথীর কোনও এক চেনা ঘাটে হাতুড়ি-বাটালির ঠুকঠাক শব্দে জেগে উঠবে আরও একটা নতুন ডিঙি। যান্ত্রিক বুকের গভীরে শান্ত নদীর মায়া জাগিয়ে বলাগড়ের ‘আদরের নৌকা’রা সগৌরবে ভেসে থাকবে বাংলার জলপথে— অনন্তকাল।

    তথ্য সহায়তা: সুজয় মুখোপাধ্যায়

  • Link to this news (এই সময়)