সৌরভ গোস্বামী: ভারতের বামপন্থী আন্দোলনের উজ্জ্বলতম নক্ষত্র এবং সংসদীয় রাজনীতির এক বিরল প্রতিষ্ঠান জ্যোতি বসুর জীবন ও মূল্যায়ন আজ, এই বদলে যাওয়া রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, নতুন করে আলোড়িত করে। প্রায় সিকি শতাব্দী ধরে একটি রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব সামলানো বা আধুনিক ভারতের জোট রাজনীতির অন্যতম কারিগর হওয়া— এই সংখ্যা বা মেয়াদের খতিয়ান দিয়ে জ্যোতি বসুকে পুরোপুরি মাপা অসম্ভব। তাঁর প্রকৃত গুরুত্ব লুকিয়ে রয়েছে তাঁর আপসহীন ধর্মনিরপেক্ষতা, প্রখর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী চেতনা এবং ক্ষমতার শীর্ষে থেকেও কমিউনিস্ট শৃঙ্খলার প্রতি অগাধ আনুগত্যের মধ্যে। আজ যখন দেশের রাজনীতিতে মেরুকরণের হাওয়া তীব্র, তখন জ্যোতি বসুর মতো একজন নেতার রাজনৈতিক দূরদর্শিতা ও প্রশাসনিক দৃঢ়তা স্বাভাবিকভাবেই প্রভূত প্রাসঙ্গিকতা ফিরে পায়।
জ্যোতি বসুর বৈপ্লবিক চেতনার ভিত তৈরি হয়েছিল এক উত্তাল আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে। ইংল্যান্ডে আইন পড়ার সময় ১৯৩০-এর দশকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান এবং হিটলার-মুসোলিনির নৃশংসতা তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছিলেন। এই অভিজ্ঞতাই তাঁকে মার্ক্সবাদের দিকে আকৃষ্ট করে এবং এক কট্টর সাম্রাজ্যবাদবিরোধী যোদ্ধায় পরিণত করে। ব্যরিস্টার হয়ে দেশে ফেরার পর বিলাসী জীবনের হাতছানি উপেক্ষা করে তিনি নিজেকে সঁপে দিয়েছিলেন দেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম ও মেহনতি মানুষের লড়াইয়ে। পরবর্তীকালে তাঁর নেতৃত্বেই পশ্চিমবঙ্গ আন্তর্জাতিক স্তরে কিউবা, ভিয়েতনাম বা প্যালেস্টাইনের মুক্তিকামী মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছিল। আন্তর্জাতিক চেতনার সঙ্গে এ দেশের মাটির লড়াইকে মিলিয়ে দেওয়ার এই ক্ষমতা জ্যোতি বসুর এক অনন্য বৈশিষ্ট্য ছিল।
তবে জ্যোতি বসুর সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব সম্ভবত এ দেশের বহুত্ববাদ এবং ধর্মনিরপেক্ষতাকে প্রশাসনিকভাবে রক্ষা করা। ১৯৪৬ সালের কলকাতার দাঙ্গা এবং দেশভাগের রক্তক্ষয়ী অধ্যায় তিনি নিজের চোখে দেখেছিলেন। এই ক্ষত তাঁর মনে সাম্প্রদায়িক শক্তির বিরুদ্ধে এক আজীবন ঘৃণার জন্ম দিয়েছিল। ১৯৭৭ সালে তিনি যখন পশ্চিমবঙ্গের ক্ষমতায় বসেন, তারপর থেকে টানা ৩৪ বছরের বামফ্রন্ট শাসনে রাজ্যটি কোনো বড় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা দেখেনি। ১৯৮৪ সালে ইন্দিরা গান্ধীর হত্যাকাণ্ড বা ১৯৯২ সালে বাবরি মসজিদ ধ্বংসের পর যখন সারা দেশ হিংসার আগুনে জ্বলছিল, তখন জ্যোতি বসুর কড়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত এবং পাড়ায় পাড়ায় সাধারণ কর্মীদের সদ্বিচ্ছা বজায় রাখার লড়াইয়ে বাংলা ছিল সম্পূর্ণ শান্ত। তাঁর এই দৃঢ়তার কারণেই দক্ষিণপন্থী বা ধর্মীয় মেরুকরণের রাজনীতি সে সময় বাংলায় মাথাচাড়া দিতে পারেনি।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে ব্যবহার করে কীভাবে আমূল ভূমি সংস্কার করা যায়, তার উজ্জ্বল উদাহরণ জ্যোতি বসুর আমলের ‘অপারেশন বর্গা’। গ্রামীণ বাংলার লক্ষ লক্ষ ভূমিহীন ও প্রান্তিক চাষি, বিশেষ করে দলিত, আদিবাসী ও সংখ্যালঘু পরিবারের হাতে জমির মালিকানা তুলে দেওয়া ছিল এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ। গোটা দেশের মাত্র সাড়ে তিন শতাংশ জমি থাকা সত্ত্বেও ভারতজুড়ে মোট উদ্বৃত্ত জমি বণ্টনের সিংহভাগ হয়েছিল এই বাংলাতেই। এর পাশাপাশি পঞ্চায়েতি রাজ ব্যবস্থার বিকেন্দ্রীকরণ সাধারণ মানুষের হাতে ক্ষমতার রাশ এনে দিয়েছিল। জ্যোতি বসুর একটি ঐতিহাসিক ঘোষণা ছিল, মেহনতি মানুষের গণতান্ত্রিক আন্দোলন দমাতে পুলিশ বাহিনীকে ব্যবহার করা হবে না— এবং তিনি তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিলেন।
১৯৯৬ সালে যখন ভারতের প্রধানমন্ত্রী পদের প্রস্তাব তাঁর কাছে আসে এবং দল সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, তখন তিনি সেই সিদ্ধান্তকে হাসিমুখে মেনে নিয়েছিলেন। নিজের ইচ্ছার চেয়ে দলের শৃঙ্খলা ও আদর্শকে ওপরে রাখার এই উদাহরণ সমকালীন ভারতীয় রাজনীতিতে সত্যিই বিরল। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কোনো ব্যক্তিপূজাকে প্রশ্রয় না দিয়ে তিনি নিজেকে একজন সাধারণ কমিউনিস্ট কর্মী হিসেবেই গণ্য করে গেছেন। এমনকি মৃত্যুর পরেও মানবসেবার অনন্য নজির রেখে নিজের নশ্বর দেহটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উদ্দেশ্যে দান করে গেছেন। আজ যখন রাজনৈতিক মূল্যবোধের অবক্ষয় চারদিকে দৃশ্যমান, তখন জ্যোতি বসুর আপসহীন লড়াই, সততা এবং মানুষের ওপর অটল বিশ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, মানুষের হাত ধরেই শেষ পর্যন্ত ইতিহাস তৈরি হয় এবং শোষণহীন এক সমাজের স্বপ্ন কখনো ফিকে হতে পারে না।