Explainer: দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি মাত্র ৬ ঘণ্টায়: বুলেট ট্রেন প্রকল্প রূপায়ণের পথে, বাংলার বিরাট প্রাপ্তি
দৈনিক স্টেটসম্যান | ০৯ জুলাই ২০২৬
২০ ঘণ্টার রেলযাত্রা নেমে আসবে মাত্র ৬ ঘণ্টায়, শুনতে অবিশ্বাস্য লাগলেও এমনই এক পরিকল্পনার কথা শোনাচ্ছে ভারতীয় রেল। দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি (Siliguri) পর্যন্ত দেশের সবচেয়ে দীর্ঘ বুলেট ট্রেন করিডরের (Bullet Train Corridor) পরিকল্পনা এখন এগোচ্ছে বাস্তবের পথে। উত্তরবঙ্গের সঙ্গে রাজধানীর সরাসরি হাই-স্পিড রেল যোগাযোগের স্বপ্ন এই প্রথম এতটা কাছাকাছি পৌঁছল।
২০২৬-২৭ সালের কেন্দ্রীয় বাজেটে (Union Budget) ঘোষিত সাতটি নতুন হাই-স্পিড রেল করিডরের মধ্যে অন্যতম দিল্লি-বারাণসী-শিলিগুড়ি রুট। এর আগে জুন মাসে কলকাতার নবান্নে (Nabanna) দাঁড়িয়ে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব নিজেই জানিয়েছিলেন, লখনউ, বারাণসী ও পাটনা হয়ে দিল্লির সঙ্গে জুড়বে শিলিগুড়ি, আর সেই সফরে সময় লাগবে মাত্র ছয় ঘণ্টা।
প্রস্তাবিত রুট অনুযায়ী ট্রেনটি দিল্লি থেকে যাত্রা শুরু করে নয়ডা, জেওয়ার বিমানবন্দর, মথুরা, আগ্রা, ইটাওয়া, কনৌজ হয়ে পৌঁছবে লখনউ। সেখান থেকে রায়বরেলি, প্রয়াগরাজ, ভাদোহি ঘুরে বারাণসী। এরপর পাটনা হয় প্রবেশ করবে পশ্চিমবঙ্গে। শেষ গন্তব্য শিলিগুড়ি তথা নিউ জলপাইগুড়ি (New Jalpaiguri)। মোট ১৬টি স্টেশন থাকার কথা গোটা রুটে। ভবিষ্যতে এই লাইন গুয়াহাটি পর্যন্ত সম্প্রসারণেরও পরিকল্পনা রয়েছে বলে ইঙ্গিত মিলেছে।
বর্তমানে দিল্লি থেকে শিলিগুড়ি বা নিউ জলপাইগুড়ি পৌঁছতে ট্রেনে সময় লাগে প্রায় কুড়ি ঘণ্টা। বুলেট ট্রেন চালু হলে সেই দূরত্ব পেরোতে সময় লাগবে মাত্র ছয় ঘণ্টা। অর্থাৎ যাত্রাপথের সময় কমবে প্রায় সাড়ে তিন ভাগের একভাগে। মুম্বাই-আমদাবাদ করিডরের পরে এটি হতে চলেছে ভারতের দ্বিতীয় হাই-স্পিড রেল প্রকল্প, আর দৈর্ঘ্যের বিচারে সম্ভবত দেশের দীর্ঘতম।
এখানেই সবচেয়ে জরুরি বিষয়টি জানা দরকার। জাতীয় হাই স্পিড রেল কর্পোরেশন লিমিটেডের (National High Speed Rail Corporation Limited বা NHSRCL) তৈরি সাতটি নতুন করিডরের মধ্যে ছয়টির জন্য বিস্তারিত প্রকল্প রিপোর্ট (Detailed Project Report বা DPR) ইতিমধ্যে রেল মন্ত্রকে জমা পড়েছে। কিন্তু বারাণসী-শিলিগুড়ি অংশের ডিপিআর এখনও প্রস্তুতির পর্যায়ে। অর্থাৎ, এই একটি করিডরই বাকি ছয়টির তুলনায় সবচেয়ে পিছিয়ে। জমি অধিগ্রহণ, পরিবেশগত ছাড়পত্র বা নির্মাণকাজ শুরু হতে এখনও অনেকটা পথ বাকি। দিল্লি-বারাণসী অংশের ডিপিআর যেখানে আগেই জমা হয়ে গিয়েছে এবং আনুমানিক খরচ ধরা হয়েছে ১ লক্ষ ৭১ হাজার কোটি টাকা, সেখানে শিলিগুড়ি পর্যন্ত সম্প্রসারিত অংশের খরচ বা সময়সীমা নিয়ে এখনও কোনও চূড়ান্ত পরিসংখ্যান সরকারিভাবে প্রকাশ পায়নি।
শিলিগুড়িকে বলা হয় উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রবেশদ্বার (Gateway to Northeast India)। আসাম, সিকিম, ভুটান, নেপাল এবং বাংলাদেশের একাংশের সঙ্গে সংযোগের কেন্দ্রবিন্দু এই শহর। দিল্লির সঙ্গে সরাসরি হাই-স্পিড সংযোগ তৈরি হলে শুধু যাত্রী পরিবহণ নয়, উত্তরবঙ্গের পর্যটন, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সামগ্রিক পরিকাঠামোয় বড়সড় বদল আসতে পারে বলে মত পরিবহণ বিশেষজ্ঞদের একাংশের। জমি ও রিয়েল এস্টেট মহলেও ইতিমধ্যে এই প্রকল্প ঘিরে আগ্রহ তৈরি হয়েছে।
নবান্নে দাঁড়িয়ে বৈষ্ণব দাবি করেছিলেন, পশ্চিমবঙ্গে বর্তমানে প্রায় এক লক্ষ কোটি টাকারও বেশি মূল্যের রেল প্রকল্প রূপায়ণের পথে রয়েছে। তিনি এর জন্য পূর্বতন রাজ্য সরকারের ভূমিকাকে কাঠগড়ায় তোলেন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে প্রকল্প বিলম্বিত করার অভিযোগও তোলেন, বিশেষভাবে চিংড়িঘাটা মেট্রো প্রকল্পের আইনি জটিলতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করেন তিনি। ২০১৪ সালের আগে কলকাতা মেট্রোয় মাত্র ২৮ কিলোমিটার সংযোজিত হয়েছিল বলে দাবি করে তিনি জানান, ২০১৪-র পর গত বারো বছরে তা বেড়ে পঁয়তাল্লিশ কিলোমিটার হয়েছে।
সব মিলিয়ে দিল্লি-শিলিগুড়ি বুলেট ট্রেন এখনও স্বপ্ন থেকে বাস্তবে রূপান্তরের প্রথম ধাপেই রয়েছে। ঘোষণা হয়েছে, রুট চিহ্নিত হয়েছে, কিন্তু ডিপিআর সম্পূর্ণ না হওয়া পর্যন্ত জমি অধিগ্রহণ, চূড়ান্ত খরচ কিংবা নির্মাণের সময়সীমা নিয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা এখনই সম্ভব নয়। উত্তরবঙ্গের মানুষের কাছে এই প্রকল্প যতটা আশার, ততটাই তার বাস্তবায়ন নির্ভর করছে আগামী কয়েক বছরের প্রশাসনিক গতির উপর। তবে ইঙ্গিতটা অত্যন্ত ইতিবাচক বলেই মনে করছে তথ্যাভিজ্ঞ মহল।