নেপলসে ঈশ্বরের মর্যাদা পেয়েছিলেন মারাদোনা, নরওয়ের হাল্যান্ডও কি ম্যানচেস্টারের ততটাই ‘নিজের’?
এই সময় | ০৮ জুলাই ২০২৬
বিশ্বকাপ বললে প্রথমেই যাঁদের নাম উঠে আসে আলোচনায়, সেই তালিকায় উপরের দিকে থাকবেন দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনা। আর্জেন্তিনার ইতিহাসে সর্বকালের অন্যতম সেরা। ফুটবলপ্রেমীদের কাছে কিংবদন্তি। তবে নেপলসের মানুষের কাছে তিনি ‘ঈশ্বর’-এর সমান। মৃত্যুর ছয় বছর পরেও পাল্টায়নি যে তকমা। মারাদোনা ও নেপলসের ‘লাভস্টোরি’ আজও চর্চিত। কিন্তু ২০২৬ বিশ্বকাপের মাঝে কেন চর্চায় এই প্রসঙ্গ? সৌজন্যে ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচ এবং আর্লিং হাল্যান্ড। শেষ আটের ম্যাচে মুখোমুখি দুই দেশ।
যে ম্যাচে টমাস তুচেলের দলের সবচেয়ে বড় মাথাব্যথা ইংল্যান্ডের ক্লাব ম্যানচেস্টার সিটির তারকা স্ট্রাইকার হাল্যান্ড। ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে দিয়েগোর জন্য আর্জেন্তিনার হয়ে গলা ফাটিয়েছিলেন ইতালির নেপলসের ফুটবলপ্রেমীরা। এ বার কি হাল্যান্ডের জন্য গলা ফাটাবে ইংল্যান্ডবাসী? কোথাও গিয়ে কি মিলে যাবেন মারাদোনা ও হাল্যান্ড? চলছে চর্চা।
এই প্রতিবেদন থেকে কী কী জানতে পারবেন?
কেন নেপলসে মারাদোনাকে ঈশ্বর বলা হয়?
১৯৯০ বিশ্বকাপে নেপলস কেন ইতালির বদলে আর্জেন্তিনাকে সমর্থন করেছিল?
হাল্যান্ডের সঙ্গে ম্যানচেস্টারের সম্পর্ক কতটা গভীর?
কেন ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচ ঘিরে আবেগের দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে?
মারাদোনা ও হাল্যান্ডের মধ্যে কোথায় মিল, কোথায় অমিল?
নেপলস ও মারাদোনার ‘লাভস্টোরি’
১৯৮৪ সালে তৎকালীন বিশ্বরেকর্ড ট্রান্সফার ফি-তে ইতালির ক্লাব নাপোলিতে যোগ দেন মারাদোনা। তখন উত্তর ইতালির ধনী ক্লাবগুলোর কাছে নেপলস ছিল অবহেলিত ও উপহাসের পাত্র। সাত বছরে মারাদোনা সেখানে গিয়ে শুধু ট্রফি জেতেননি, বরং নিঃস্ব এক শহরের আশার আলো হয়ে উঠেছিলেন। দারিদ্র্য থেকে উঠে এসে নেপলসের মানুষের সঙ্গে একাত্ম হয়েছিলেন মারাদোনা।
আর্জেন্তিনার বুয়েনস আইরেসের দরিদ্র এলাকা ‘ভিলা ফিওরিতো’তে বড় হওয়া মারাদোনা ছোটবেলা থেকেই অভাবের সঙ্গে লড়াই করেছেন। সেই কারণেই দক্ষিণ ইতালির শ্রমজীবী ও বঞ্চিত নেপলসের মানুষের জীবনসংগ্রামের সঙ্গে নিজের মিল খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি।
নাপোলির ইতিহাস বদলে দিয়েছিলেন ‘ডন ডিয়েগো’
মারাদোনার হাত ধরেই নাপোলি প্রথমবারের মতো দু’টি Serie-A ট্রফি জেতে। ক্লাবের একমাত্র ইউরোপীয় ট্রফি উয়েফা কাপও আসে তাঁর নেতৃত্বে। সাত বছরে তিনি ১১৫টি গোল করেন, যা দীর্ঘদিন ক্লাবের সর্বোচ্চ গোলের রেকর্ড ছিল। মারাদোনার প্রতি নেপলসবাসীর ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ দেখা গিয়েছিল ১৯৯০ সালের বিশ্বকাপে। সেমি ফাইনালে যখন আর্জেন্তিনা ইতালির মুখোমুখি হয়েছিল নেপলসে, তখন স্থানীয় সমর্থকদের একাংশ নিজেদের দেশের বদলে মারাদোনার আর্জেন্তিনাকে সমর্থন করেছিলেন।
মৃত্যুর পরেও ঈশ্বরের মর্যাদা
২০২০ সালে মারাদোনার মৃত্যুর পরেও নেপলসে তাঁর প্রভাব কমেনি। নাপোলির স্টেডিয়ামের নাম পাল্টে দিয়েগো আর্মান্দো মারাদোনার নামে রাখা হয়। নেপলসে আজও মারাদোনার বিশাল ম্যুরাল, পতাকা ও স্মৃতিচিহ্নে ভরে রয়েছে।
কেন চর্চায় হাল্যান্ড?
২০২২ সালে হাল্যান্ড যখন ম্যানচেস্টার সিটিতে আসেন, তখন ইংলিশ ফুটবলে যথেষ্ট দাপট দেখিয়েছে সিটি। কিন্তু ক্যাবিনেটে ছিল না উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ। হাল্যান্ড এসেছিলেন পেপ গুয়ার্দিওলার সাম্রাজ্যের শেষ ও সবচেয়ে শক্তিশালী ‘Missing Piece’টি পূরণ করতে। আর এই শহরের সঙ্গে হাল্যান্ডেরও শিকড়ের টান রয়েছে।
তাঁর বাবা আলফি হাল্যান্ড একসময় ম্যান সিটির খেলোয়াড় ও অধিনায়ক ছিলেন। আর্লিংয়ের জন্মও ইংল্যান্ডে। ছোটবেলা থেকেই তিনি ছিলেন সিটির সমর্থক। তাই হাল্যান্ডের সিটিতে ফেরা আসলে হোমকামিং। সিটির সমর্থকরাও যেন তাই হাল্যান্ডের মাঝে ঘরের ছেলেকে খুঁজে পেয়েছে।
ম্যানচেস্টারে হাল্যান্ডের প্রতি ভালোবাসাটা হয়তো মারাদোনার মতো অতটা উন্মাদনার নয়। কিন্তু এতিহাদ স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে যখন সমর্থকরা হাল্যান্ডের নামে জয়ধ্বনি দেন, তখন বোঝা যায় ম্যান সিটির সমর্থকদের হাল্যান্ডের প্রতি ভালোবাসা। এখানেই প্রশ্ন উঠছে ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচ নিয়ে।
শুক্রবার কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে নামবে নরওয়ে। এই ম্যাচে কি হাল্যান্ডের হয়ে গলা ফাটাবেন ইংল্যান্ডের সমর্থকরা? নাকি বিশ্বজয়ের লড়াইয়ে হাল্যান্ড-প্রেম ভুলে নিজের দেশকেই সাপোর্ট করবেন ম্যানচেস্টার সিটির সমর্থকরা। দ্বিধাবিভক্ত ফুটবলদুনিয়া। চলছে চর্চা।
নেপলসে মারাদোনাকে কেন ঈশ্বর বলা হয়?
মারাদোনা নাপোলিকে প্রথম Serie A ও UEFA Cup জেতান এবং শহরের মানুষের সঙ্গে আত্মিক সম্পর্ক গড়ে তোলেন। সেই কারণেই তিনি আজও নেপলসে কিংবদন্তির চেয়েও বড়।
১৯৯০ বিশ্বকাপে নেপলস কেন আর্জেন্তিনাকে সমর্থন করেছিল?
সেমিফাইনালে ইতালির বিরুদ্ধে আর্জেন্তিনা খেললেও নেপলসের বহু সমর্থক মারাদোনার প্রতি ভালোবাসার কারণে আর্জেন্তিনার পক্ষ নিয়েছিলেন।
হাল্যান্ডের সঙ্গে ম্যানচেস্টারের সম্পর্ক কেন এত বিশেষ?
হাল্যান্ডের বাবা আলফি হাল্যান্ড ম্যানচেস্টার সিটির প্রাক্তন ফুটবলার। আর্লিংয়ের জন্মও ইংল্যান্ডে এবং ছোটবেলা থেকেই তিনি সিটির সমর্থক ছিলেন।
ইংল্যান্ড বনাম নরওয়ে ম্যাচ নিয়ে বিতর্ক কেন?
ম্যানচেস্টার সিটির বহু সমর্থক হাল্যান্ডকে ভালোবাসেন। ফলে দেশের দল ইংল্যান্ড ও ক্লাবের নায়ক হাল্যান্ড— কাকে সমর্থন করবেন, তা নিয়েই আলোচনা চলছে।
মারাদোনা ও হাল্যান্ডের তুলনা কি ফুটবলীয় সাফল্যের?
না। এখানে মূলত দুই ফুটবলারের সঙ্গে একটি শহরের আবেগ, পরিচয় ও সমর্থকদের সম্পর্কের তুলনা করা হচ্ছে; তাঁদের অর্জনের নয়।