• ভিটেছাড়া পদ্ম-নেতা, তিরে ‘চার ঘণ্টার বিজেপি’
    এই সময় | ০৯ জুলাই ২০২৬
  • সূর্যকান্ত কুমার, কালনা

    তৃণমূল জমানায় শুরু হয়েছিল ভিটেছাড়া হওয়া। কিন্তু নিজের দল রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরেও পৈতৃক ভিটেতে ফিরে রেহাই পেলেন না পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের বিজেপি নেতা বিশাল চৌধুরী। নিজের জমিতেই আক্রান্ত হয়ে কোনওরকমে প্রাণ হাতে নিয়ে পালিয়ে বাঁচলেন তিনি।

    ২০১৮-র পঞ্চায়েত সমিতির প্রার্থী তথা বর্তমানে পূর্বস্থলী দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রের তিন নম্বর মণ্ডলের সহ সভাপতি বিশালের অভিযোগ, ‘৪ মে বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে রাতারাতি তৃণমূল থেকে যারা বিজেপি হয়েছে, সেই সব চার ঘণ্টার বিজেপিরাই এই হামলার নেপথ্যে রয়েছে।’ ২০ জুন নাদনঘাট থানায় লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হলেও পুলিশের কাছ থেকে কোনও সহযোগিতা মিলছে না বলে দাবি তাঁর।

    বিশাল চৌধুরীর স্ত্রী তাপসী চৌধুরী ২০২৩-এর পঞ্চায়েত নির্বাচনে বিজেপির প্রার্থী ছিলেন। এই বছর বিধানসভা নির্বাচনে বুথ এজেন্টের দায়িত্বও সামলেছেন। বর্তমানে ব্যবসার সূত্রে তাঁরা পূর্বস্থলীর কোবলার কাছাকাছি বিদ্যানগর মোড়ের কাছে চাঁদপুর গ্রামে থাকলেও কোবলায় তাঁদের জমি, পুকুর ও বাগান সমেত প্রায় সাত বিঘা সম্পত্তি রয়েছে। বিশালের দাবি, ২০১৪ থেকে সেই ভিটেতে ঢুকতে পারছেন না তিনি। এ নিয়ে দেওয়ানি, ফৌজদারি মামলাও হয়েছে বিভিন্ন সময়ে। তার পরেও পরিস্থিতি বদলায়নি। তিনি বলেন, ‘আমার দাদু গয়ারাম দাসের দান করা জমিতে এলাকায় গড়ে উঠেছে স্কুল (বিদ্যানগর গয়ারাম দাস বিদ্যামন্দির)। কোবলা মৌজায় উত্তরাধিকার সূত্রেই তাঁর সম্পত্তি পেয়েছি। কিছুটা কিনেছি।’

    সমস্যায় সূত্রপাত ২০১৪-য়। বিশালের কথায়, ‘সে সময়ে তৃণমূলের ছত্রছায়ায় থাকা কিছু লোক খেলার মাঠের জন্য সম্পত্তির একটা অংশ দাবি করে। তা না-দেওয়ায় আমাকে ভিটেতে ঢুকতে দেওয়া হতো না। পুকুরের মাছ চুরি করে নেওয়ায় মাছ চাষও বন্ধ করে দিতে হয়। ওই ফাঁকা জায়গায় থাকা গাছপালাও কেটে দেয় ওরা।’

    ১৭ জুন কিছুটা সাহস করে নিজের ভিটেতে গিয়েছিলেন বিশাল। হামলার অভিজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘সে দিন মাঠে ট্র্যাক্টর নিয়ে চাষ করতে গেলে কয়েকজন লাঠি, শাবল হাতে তেড়ে আসে। আমাকে ঘুষি মারলে আমি কোনওরকমে ছুটে এসে স্কুটারে চড়ে চলে যাওয়ার চেষ্টা করলে শাবল দিয়ে হাতে মেরে রক্তাক্ত করে দেয়।’ শ্রীরামপুর গ্রামীণ হাসপাতালে চিকিৎসা করিয়ে সে দিনই তিনি নাদনঘাট থানায় লিখিত অভিযোগপত্র জমা দেন। ২০ জুন এফআইআর দায়ের হয়। তাঁর অভিযোগ, ও দিন তাঁর কাছ থেকে ছিনিয়ে নেওয়া সোনার চেন, মোবাইল ফোন পুলিশ এখনও উদ্ধার করে দিতে পারেনি।

    নিজের দল ক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও এই হেনস্থায় ক্ষুব্ধ বিশাল চৌধুরী বলেন, ‘যখন তৃণমূলের সরকার ছিল তখন অভিযুক্তরা তৃণমূল নেতাদের মদতপুষ্ট হওয়ায় কিছু করতে পারিনি। কিন্তু এখন বিজেপি ক্ষমতায় আসার পরেও এমন ভয়ানক পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে ভাবিনি।’ তিনি স্থানীয় বিধায়ক প্রাণকৃষ্ণ তপাদার, এলাকার বাসিন্দা কিষান মোর্চার রাজ্য সভাপতি রাজীব ভৌমিক এবং কাটোয়া সাংগঠনিক জেলা বিজেপি সভাপতি স্মৃতিকণা বসুকে সব জানিয়েছেন। মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরেও (সিএমও) অভিযোগ জানানো হয়েছে।

    এই বিষয়ে স্মৃতিকণা বসু বলেন, ‘দিন সাতেক আগে বিশাল ও তাপসী চৌধুরী এসেছিলেন আমার কাছে। সবটা শুনে জানতে চাই, কারা করেছে। বিশালবাবু বলেন, যারা করেছে তারা আগে তৃণমূল করত, এখন বিজেপি হয়ে গিয়েছে। এরাই সব জায়গায় নোংরামি করছে। আমি বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় বিধায়কের সঙ্গে কথা বলব।’ পাশাপাশি কালনা মহকুমা প্রশাসনের এক আধিকারিক জানিয়েছেন, তাঁরা বিষয়টি নিয়ে পুলিশের সঙ্গে কথা বলবেন।

    কোথাও কোনও সুরাহা না-মেলায় বিশাল চৌধুরীর ছেলে পার্থপ্রতীম চৌধুরী সোশ্যাল মিডিয়ায় ‘এক সন্তানের ন্যায়বিচারের আবেদন’ জানিয়ে লিখেছেন, ‘ভাবিনি বাবাকে তাঁরই জন্মভিটে, তাঁরই পৈতৃক জমিতে আইনসম্মত ভাবে প্রবেশ করতে গিয়ে কিছু দুষ্কৃতীর হাতে রক্তাক্ত হতে হবে।’ কর্মসূত্রে বেশিরভাগ সময়ে কলকাতায় থাকা পার্থপ্রতীমের দাবি, তাঁর মা-বাবা সক্রিয় বিজেপি কর্মী হওয়ায় তৃণমূলের আমলে সব সময় আতঙ্কে থাকতেন। দল ক্ষমতায় আসায় নিশ্চিন্ত হয়েছিলেন, কিন্তু এখন ন্যায়বিচারের আশায় তাঁদের দরজায় দরজায় ঘুরতে হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)