এই সময়: সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট থেকে টাকা ট্রান্সফার হয়েছিল একটি প্রাইভেট এভিয়েশন কোম্পানির অ্যাকাউন্টে। সেই টাকায় কেনা হয়েছিল একটি বিমান ও একটি হেলিকপ্টার। আবার সেই বিমান ও হেলিকপ্টার ভাড়ায় ব্যবহার করতে দেওয়া হয়েছিল তৃণমূলকেই! দলীয় তহবিলের টাকা এ ভাবে ঘুরপথে সাইফন করার অভিযোগে ইতিমধ্যে তদন্ত শুরু করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা ইডি।
জোড়াফুলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত মামলার তদন্তে নেমে মঙ্গলবার নিউ টাউনে ‘কেয়ারওয়েল গ্রুপ অফ কোম্পানিজ়’ নামে ওই এভিয়েশন সংস্থা, রাধাবাজারে ওই সংস্থারই আওতাধীন ট্রাভেলস কোম্পানি–সহ পাঁচটি জায়গায় ইডির তদন্তকারীরা তল্লাশি চালান। বুধবার কেন্দ্রীয় এজেন্সি প্রেস বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, এই তদন্তের সূত্রে তারা একটি বেসরকারি ব্যাঙ্কে থাকা তৃণমূলের তিনটি অ্যাকাউন্টের ৪৪০ কোটি ৪২ লক্ষ টাকা ফ্রিজ় করেছে।
ভাড়া করা এমব্রায়ার বিমানে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক দিল্লি যাতায়াত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে জোড়াফুলের অভ্যন্তরেই। এ নিয়ে একাধিকবার কটাক্ষ ছুড়েছেন বিদ্রোহী তৃণমূলের তরফে বিধানসভার বিরোধী দলনেতা ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায়। বস্তুত, তৃণমূলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকা বেআইনি কাজে ব্যবহার করা হয়েছে কি না, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলে বিধাননগর সাইবার থানায় ঋতব্রত শিবিরের তরফে অভিযোগও দায়ের করা হয়েছে।
তার আগে তৃণমূলের তৎকালীন কোষাধ্যক্ষ অরূপ বিশ্বাসও এই তিনটি অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করা নিয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষকে চিঠি দেন। ওই অ্যাকাউন্টগুলি থেকে ঘুরপথে টাকা বেআইনি ভাবে পাচার করা হয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখতে বিধাননগর কমিশনারেটে দায়ের হওয়া এফআইআরের ভিত্তিতেই পৃথক তদন্ত শুরু করে ইডি।
এ দিন তারা জানিয়েছে, ২০০২–এর ‘প্রিভেনশন অফ মানি লন্ডারিং অ্যাক্টের’ (পিএমএলএ) আওতায় ‘কেয়ারওয়েল গ্রুপ’–এর পাঁচটি ঠিকানায় তল্লাশি চালানো হয়েছে। বিবৃতিতে ইডির দাবি, সর্বভারতীয় তৃণমূল কংগ্রেসের নির্দিষ্ট কিছু ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের মাধ্যমে সন্দেহভাজন তহবিলের লেনদেন, বেআইনি ভাবে অর্থ সংগ্রহ সংক্রান্ত বিষয়েই এই অভিযান চালানো হয়েছিল।
তদন্তকারীদের দাবি, এই সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়টি চলেছে মূলত ২০২৩–এর এপ্রিল থেকে ২০২৬–এর জুনের মধ্যে। ওই সময়ে ‘মেসার্স কেয়ারওয়েল এভিয়েশন ইন্ডিয়া প্রাইভেট লিমিটেড’ এবং তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলিতে প্রায় ১৬০ কোটি টাকা ট্রান্সফার হয়েছিল তৃণমূলের কয়েকটি অ্যাকাউন্ট থেকে।
আবার ২০২৩-২০২৬ এর মধ্যে ‘কেয়ারওয়েল এভিয়েশন’ একটি ‘এমব্রায়ার লিগ্যাসি ৬০০’ বিমান এবং একটি ‘অগাস্টা ১০৯ গ্র্যান্ড নিউ’ হেলিকপ্টার কেনার জন্য অন্য একটি কোম্পানিকে ৮২.৯৬ কোটি টাকা পাঠায়। সব মিলিয়ে এই বিমান ও হেলিকপ্টার কিনতে ১১২ কোটি টাকা খরচ হয়েছে বলেও দাবি তদন্তকারীদের। ইডির আরও দাবি, ওই নির্দিষ্ট হেলিকপ্টারটি কেনার জন্য ২০২৩–এ ওয়েস্টার্ন ক্যারিবিয়ানের কেম্যান আইল্যান্ডের একটি সংস্থার কাছ থেকে ১৭ লক্ষ মার্কিন ডলার আনসিকিওরড ঋণও জোগাড় করা হয়েছিল।
তদন্তকারীদের আরও দাবি, পরবর্তীতে ওই বিমান ও হেলিকপ্টার তৃণমূল কংগ্রেসকেই ভাড়া দেওয়া হয়েছিল। এখানেই ধন্দে তদন্তকারীরা। যে বিমান ও হেলিকপ্টার তৃণমূলের তহবিল থেকে কেনা, সেগুলি ব্যবহারের জন্য আবার ওই কোম্পানিকেই ভাড়া বাবদ কোটি কোটি টাকা পাইয়ে দেওয়া হলো তৃণমূলের তরফে, এই আর্থিক লেনদেনের প্রকৃত উদ্দেশ্য এবং এর আসল সুবিধাভোগী কে— তার খোঁজেই চলছে তদন্ত। ইডি সূত্রের দাবি, খুব শিগগিরই নথিপত্র খতিয়ে দেখে ২০২৩–২৬ এর মধ্যে তৃণমূলের সংশ্লিষ্ট ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলির অথরাইজ়ড সিগনেটরি–সহ বেশ কয়েকজনকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য তলব করা হতে পারে।
ইডির এই অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ় করা নিয়ে তৃণমূলের (কালীঘাটপন্থী) তরফে এক বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ‘দলের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টগুলিতে রাখা সমস্ত তহবিলের হিসেব সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ভাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এই সব তথ্য প্রতি বছর নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হয় এবং পাবলিক ডোমেনেই রয়েছে।’ তবে দলীয় তহবিলের টাকা এ ভাবে ট্রান্সফার করা নিয়ে সরাসরি কোনও মন্তব্য করা হয়নি দলের তরফে। তবে তৃণমূলের বিবৃতিতে দাবি করা হয়েছে, ‘অ্যাকাউন্ট ফ্রিজ়ের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। আমরা এই স্বেচ্ছাচারী ও বেআইনি কাজের তীব্র নিন্দা জানাচ্ছি।’