অনিল জানা
১৯৮৩–৮৪ সালের কথা। আমি তখন গুন্ডা দমন শাখায় সাব ইন্সপেক্টর। সে সময়ে কসবার ত্রাস ছিল কানাই কুমির। যতদূর মনে আছে, ডাকাতি, রাহাজানি, হুমকি, মারধর–সহ প্রায় খান সতেরো মামলা ছিল তার বিরুদ্ধে। কানাইকে গ্রেপ্তারের দায়িত্ব পড়েছিল আমার উপরে। দু’জন এসআই এবং জনা পাঁচেক কনস্টেবল নিয়ে কসবায় কানাইয়ের বাড়িতে যাই। দুপুরবেলা। বৃষ্টি পড়ছে। দেখি নির্মীয়মাণ দোতলা বাড়ি। কনফার্ম খবর ছিল, কানাই ওই বাড়িতে রয়েছে।
বৃষ্টি মাথায় গাড়ি থেকে নেমে বাড়িটা পুলিশ দিয়ে ঘিরে ফেলি। কানাইয়ের কাছে খবর পাঠানো হয়, পুলিশ বাড়ি ঘিরে ফেলেছে। সে যেন নিজে ধরা দেয়। কিন্তু বারবার বলা সত্ত্বেও কানাই উত্তর দেয় না। উল্টে দোতলার ব্যালকনি থেকে বোমা ছোড়ে। তবে আমাদের কপাল ভালো ছিল। সেই বোমা গিয়ে কাদায় পড়ে। বৃষ্টির মধ্যে বোমা ফাটেওনি। আমি ও কনস্টেবল হরেন্দ্র মিশির টিম সিঁড়ি দিয়ে নির্মীয়মাণ বাড়ির দোতলায় পৌঁছই। দেখি মূল কাঠের দরজা বন্ধ। দরজার নীচে ও মেঝের মধ্যে প্রায় ৩ ইঞ্চি ফাঁকা ছিল। সেখান থেকে দেখি ঘরের ভিতরে কানাইয়ের জনা চারেক শাগরেদ রয়েছে। সঙ্গে এক মহিলা ও বাচ্চাও রয়েছে। আমি সাবধান হয়ে যাই। পরিবার ভিতরে থাকা অবস্থায় অপারেশন করতে গেলে সমস্যা হতে পারে। আমি দরজার নীচ থেকেই নজর রাখি।
অপেক্ষা করছিলাম, এমন এক মুহূর্তের, যখন দরজার তলার ওইটুকু ফাঁক দিয়ে কানাইকে দেখতে পাব। ওরা বুঝতে পারেনি যে বন্ধ দরজার এ পারে আমরা রয়েছি। নিঃশ্বাসের শব্দও প্রায় বন্ধ রেখে শুয়ে দরজার নীচ দিয়ে নজর চালাতে থাকি। এক সময়ে কানাইকে দেখতে পাই। ও পিছনে ফিরতেই আমি গুলি করি। গুলি লাগে কানাইয়ের শরীরে। ওরা আমাদের উপস্থিতি বুঝতে পারে। দোতলা থেকে বাইরে নীচে থাকা আমাদের টিমকে লক্ষ্য করে কানাইয়ের শাগরেদরা বোমা ছুঁড়তে শুরু করে। টিমকে বাঁচাতে আমি নীচে নেমে আসি। কপাল ভালো ছিল পুলিশের কেউ আহত হননি।
আমি ফের দোতলায় উঠে দরজার নীচ থেকে নজর রাখতে শুরু করি। দরজার তলা থেকে আমরা ফায়ার করলে কানাইয়ের এক শাগরেদ আহত হয়ে উপর থেকে লাফিয়ে পড়ে চম্পট দেয়। দেখি কানাই ও তার বাকি সঙ্গীরা দরজা খুলে নীচে নামার তোড়জোড় করছে। আমি নীচে নেমে এসে বাড়ির সামনে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ি। আহত অবস্থায় কানাই এক হাতে রিভলভার ও অন্য হাতে বোমা নিয়ে নেমে আসে। কানাইকে দেখে আমি ওর সামনে গিয়ে ওকে জাপটে ধরি। যাতে ও বোমা ছুড়তে না পারে। অফিসার মধুসূদন সর্দার কানাইয়ের রিভলভার ছিনিয়ে নেয়। গুলিবিদ্ধ কানাইকে স্থানীয় হাসপাতালে নিয়ে গেলে তাকে মৃত বলে ঘোষণা করে চিকিৎসকরা।
আজ বারুইপুরে এনকাউন্টারের ঘটনা সামনে আসার পরে কানাইয়ের কথা মনে পড়ে গেল। ৪২ বছর আগের কথা। তাও কেমন স্পষ্ট মনে রয়েছে। এ ছাড়াও ২০০০ নাগাদ নাকতলা– যাদবপুরের একটি ঘটনা মনে পড়ছে। ওই এলাকায় এক দুষ্কৃতী পচপন পাসোয়ান অত্যাচারে অতিষ্ঠ সকলে। তার বিরুদ্ধে ভূরি ভূরি তোলাবাজির অভিযোগ। তাকে গ্রেপ্তারের জন্য আমি জনা পাঁচেক পুলিশ নিয়ে নাকতলা পৌঁছই। গাড়ি ছাড়া, সাধারণ মানুষের বেশে। গোপনে খবর এসেছিল, এক ব্যবসায়ীর থেকে দু’লক্ষ টাকা তোলা চেয়েছে পচপন।
টাকা নিয়ে নাকতলার কাছে আসতে বলা হয়েছে ব্যবসায়ীকে। টিম নিয়ে আমি এলাকা ঘিরে ফেললে পচপন তা বুঝে যায়। সে এসেছিল মোটরবাইকে। ব্যবসায়ী টাকা নিয়ে রেডি। পচপনও বাইক থেকে নেমে সেই টাকা নিতে যায়। তখনই দেখে ফেলে আমাদের। কোমরে গোঁজা রিভলবার বার করে বাইক নিয়ে পালানোর চেষ্টা করে। ওর সঙ্গে একাধিক বাইকে ওর সঙ্গীরা ছিল। আমি গুলি করি। পাল্টা ওরা গুলি ছোড়ে। আমার সঙ্গী অফিসারও গুলি চালান। পচপনের পেটের নীচে ও কপালের সাইডে গুলি লাগে। ওকে ফেলে বাকিরা পালায়। পচপনকে রক্তাক্ত অবস্থায় এমআর বাঙুর হাসপাতালে নিয়ে গেলে মৃত বলে ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।
লেখক: কলকাতা পুলিশের প্রাক্তন অ্যাসিস্ট্যান্ট কমিশনার