দিব্যেন্দু সরকার, আরামবাগ
রাজ্যে নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পরে নদী থেকে বালি চুরি রুখতে একগুচ্ছ পদক্ষেপ নিয়েছে প্রশাসন। তাতে সরকারের রাজস্ব আদায় বাড়লেও বাজারে বালির দাম আগের থেকে অনেকটাই চড়ে গিয়েছে। এর ফলে বিপাকে পড়েছেন গৃহস্থরা। বালির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নির্মাণ খরচ এক ধাক্কায় বেড়ে যাওয়ায় আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ছেন প্রোমোটার ও ডেভলপাররা। অনেক সরকারি ঠিকাদাররা আপাতত কামকর্ম বন্ধ রেখেছেন। রাজ্যে পালাবদলের পরে আবাস যোজনা প্রকল্পে সম্প্রতি গ্রামের দিকে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু হলেও হঠাৎ করে বালির দাম বেড়ে যাওয়ায় সেই কাজও থমকে গিয়েছে।
ব্যবসায়ীরা জানাচ্ছেন, গত এক মাসে প্রতি ১০০ সিএফটি বালির দাম ২৮০০–৩০০০ টাকা পর্যন্ত বেড়ে গিয়েছে। বাড়তি টাকা দিয়েও সব সময় পর্যাপ্ত বালি পাওয়া যাচ্ছে না। সুযোগ বুঝে খুচরো ব্যবসায়ীরা ইচ্ছা মতো দাম চাইছেন। তাতে বাড়ি নির্মাণের খরচ অনেকটাই বেড়েছে। আবাস যোজনা প্রকল্পে সম্প্রতি অনেক উপভোক্তার অ্যাকাউন্টে প্রথম কিস্তির ৬০ হাজার টাকা ঢুকেছে। সেই টাকা হাতে পেয়েই অনেকে বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করে দিয়েছেন। তাঁদের কারও বাড়িতে সব ইটের গাঁথুনি হয়েছে। আবার যাঁরা দ্বিতীয় কিস্তির টাকা পেয়েছেন, তাঁদের লিনটন ঢালাই শুরু হয়েছে। এরই মাঝে আচমকা বালির দাম বেড়ে যাওয়ায় বিপাকে পড়েছেন আবাস যোজনা প্রকল্পের উপভোক্তারা।
হুগলির আরামবাগ মহকুমা বরাবরই বালির জন্য বিখ্যাত। এখান থেকেই হুগলি শহর এলাকা ছা়ডা সমগ্র হাওড়া জেলা, কলকাতা এবং উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বালি সরবরাহ হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে বালির জোগান তলানিতে এসে ঠেকেছে। বালির অভাবে বহু নির্মাণ কাজ বন্ধ হয়ে গিয়েছে।
জেলা প্রশাসনের কর্তারা জানাচ্ছেন, মাঝে বিধানসভা ভোট এসে যাওয়ায় হুগলি জেলার সমস্ত বালি খাদান বন্ধ ছিল। নির্বাচনী বিধিলাগু হওয়ার পর থেকে কোনও খাদানেই বালি উত্তোলন হয়নি। আবার জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত টানা তিনমাস নদীগুলি জলে পরিপূর্ণ থাকে। ফলে এই সময়ে এমনিতেই নদী থেকে বালি তোলা যায় না। এই জোড়া ধাক্কায় বাজারে বালির জোগান একেবারেই কমে গিয়েছে। জেলা প্রশাসনের এক শীর্ষ কর্তার ব্যাখ্যা, এখন নতুন করে বালি না ওঠায় যাঁদের কাছে বালি মজুত আছে, তাঁরাই বালি বিক্রি করছেন। জোগানের তুলনায় চাহিদা বেশি হওয়ায়, কিছু ব্যবসায়ী ইচ্ছামতো বালির দাম চাইছেন। আগে এক গাড়ি বালির দাম ছিল ৫৫০০ টাকা। সেই বালি বর্তমানে বিক্রি হচ্ছে ৮৫০০ টাকায়। অথচ, সরকারি নির্দেশিকা অনুযায়ী, আবাস যোজনায় যাঁরা বাড়ি করবেন, তাঁদেরকে ১২০০ টাকায় বালি দিতে হবে। কিন্তু বালির জোগান কমে যাওয়ায় অনেকেই সেই নিয়ম মানছেন না বলে অভিযোগ।
গোঘাটের বালি খাদানের মালিক জ্যোছন রায় বলেন, ‘সরকার যে মূল্য নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেই দামেই আবাস যোজনার উপভোক্তাদের বালি বিক্রি করতে সবাই বাধ্য। কিন্তু শ্রমিকদের মজুরি বেড়ে যাওয়ায়, পরিবহণ খরচ বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে আমাদের খরচ–খরচা বেড়ে গিয়েছে। তার জন্যই বেশি দামে বালি বিক্রি করতে হচ্ছে। তবুও আমরা সরকারের মুখ চেয়ে আবাস যোজনায় বাড়ি প্রাপকদের নির্ধারিত দামেই বালি বিক্রি করছি।’
গোঘাটের বিজেপি বিধায়ক প্রশান্ত দিগার বলেন, ‘বিগত সরকার যে ভাবে কোটি কোটি টাকা দুর্নীতি করে গিয়েছে, তাতে বহু মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন আর তৃণমূল নেতাদের পকেট ভর্তি হয়েছে। আমরা আশা করছি, আমাদের মুখ্যমন্ত্রী যে ভাবে সচেষ্ট হয়েছেন, তাতে একটা সমতা আসবে। আশা করছি, পুজোর পরে অক্টোবর মাস থেকে একটা নির্দিষ্ট নিয়মে চলে আসবে। তার ফলে উপকৃত হবেন সাধারণ মানুষ।’ সম্প্রতি আবাস যোজনার বাড়ি তৈরির কাজ শুরু করেছেন গোঘাটের বাসিন্দা অর্চনা লোহার। তিনি বলেন, ‘প্রথম কিস্তিতে পেয়েছি মাত্র ৬০ হাজার টাকা। এখন যা পরিস্থিতি, বালি কিনতেই অর্ধেক টাকা বেরিয়ে যাবে। এর পরে আর বাড়ি বানাব কী করে?’ ময়না লোহার বলেন, ‘যে ভাবে বালি–সহ সমস্ত জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে, তাতে অর্ধেক কাজও হবে না।’