লোকাল ট্রেনের কামরায় আরাম এক সময়ে ছিল বিলাসিতা। এসি লোকাল, তাও বনগাঁ শাখায়! হেসেই খুন হয়ে যেতেন অনেকে। কিন্তু সেই সব এখন অতীত। এসি লোকাল শুধু চলছেই না, ভিড়ও হচ্ছে ভালোই। বনগাঁ, রানাঘাট-সহ একাধিক শাখায় চলছে এসি ট্রেন। আর বিলাসিতাই ধীরে ধীরে হয়ে উঠছে বহু নিত্যযাত্রীর অভ্যাস। এক সময়ে অফিসযাত্রার সমার্থক ছিল—ভিড়, ধাক্কাধাক্কি আর দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা।
সেই চেনা ছবিতে ধীরে ধীরে বদলের ছোঁয়া আনছে শিয়ালদহ শাখার এসি লোকাল। আরামদায়ক যাত্রার টানে বাড়ছে যাত্রীদের ভিড়, এমনকী অনেক দিনই সিটিং ক্যাপাসিটিকেও ছাপিয়ে যাচ্ছে যাত্রীর সংখ্যা। পরিসংখ্যান বলছে, যেখানে এসি লোকালের দৈনিক সিটিং ক্যাপাসিটি (আপ, ডাউন মিলিয়ে) ২,২৩২, সেখানে গড়ে প্রায় ১২৬ শতাংশ বেশি যাত্রী নিয়ে চলছে এসি লোকাল। ওয়াকিবহাল মহলের মতে, সংখ্যার এই হিসাব শুধু আয়ের অঙ্ক বাড়ার নয়, বরং যাত্রীদের মানসিকতার বদলের প্রতিচ্ছবি।
পূর্ব রেলের একটি সূত্রে খবর, শিয়ালদহ-রানাঘাট এসি লোকাল পরিষেবা চালুর পর থেকেই ট্রেনটি যাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে। জুন মাসের হিসাব অনুযায়ী, ট্রেনে মোট যাত্রী যাতায়াত করেছেন ৮০,৪০৮ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,৮৭২ জন এই এসি লোকালে সফর করেছেন। আপ ও ডাউন মিলিয়ে ট্রেনটির দৈনিক মোট সিটিং ক্যাপাসিটি ২,২৩২। সেই হিসাবে প্রতিদিন গড়ে ক্যাপাসিটির প্রায় ১২৮.৭ শতাংশ যাত্রী ট্রেনে ভ্রমণ করেছেন। অর্থাৎ, গড়ে প্রতিদিন সিটিং ক্ষমতার তুলনায় প্রায় ৬৪০ জন বেশি যাত্রী এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন। আয়ের দিক থেকেও ছবিটা ইতিবাচক। জুন মাসে এই ট্রেন থেকে মোট ৬১.৩৮ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে।
মেট্রোর মতোই যাত্রী উপস্থিতি ২০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে
রাজীব সাক্সেনা, ডিআরএম
বনগাঁ শাখার এসি লোকাল—প্রথম দিকে যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা সংশয় থাকলেও, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই ছবিও বদলেছে। জুন মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এই ট্রেনে সফর করেছেন ৮১,৩৩২ জন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৩,১২৮ জন যাত্রী এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন। অথচ ট্রেনটির দৈনিক সিটিং ক্যাপাসিটি ২,২৩২। ফলে গড়ে ১৪০ শতাংশ যাত্রী দখল নিয়ে ছুটেছে বনগাঁ শাখার এসি লোকাল। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৮৯৬ জন বেশি যাত্রী সিটিং ক্ষমতার তুলনায় এই ট্রেনে সফর করেছেন। কয়েকটি দিনে যাত্রীর সংখ্যা ১৮৫ থেকে ১৮৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে, যা এই পরিষেবার বাড়তে থাকা চাহিদার স্পষ্ট ইঙ্গিত। আয়ের নিরিখে জুন মাসে ৬২.৩৬ লক্ষ টাকা আয় হয়েছে রেলের।
কৃষ্ণনগর শাখার এসি লোকালের চিত্রটা কেমন? জুন মাসের পরিসংখ্যান বলছে, এসি পরিষেবা চলাকালীন এই ট্রেনে মোট ৬১,৭৯৭ জন যাত্রী সফর করেছেন। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে প্রায় ২,৪৭২ জন যাত্রী AC লোকাল বেছে নিয়েছেন। যেখানে দৈনিক সিটিং ক্যাপাসিটি ২,২৩২, সেখানে গড় যাত্রী উপস্থিতি পৌঁছেছে প্রায় ১১১ শতাংশে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে সিটিং ক্ষমতার চেয়েও বেশি যাত্রী এই পরিষেবা ব্যবহার করেছেন। জুন মাসে এই ট্রেন থেকে আয় হয়েছে ৪৮ লক্ষ টাকারও বেশি।
বিভিন্ন শাখার এসি লোকাল ঘুরে এটা স্পষ্ট, মানুষ একটু স্বাচ্ছন্দ্যের খোঁজে বেশি টাকা খরচ করতে রাজি। অনেকে হয়তো বনগাঁ বা নৈহাটি বা রানাঘাট থেকে মোটা টাকায় গাড়ি ভাড়া করে কোনও রোগীকে কলকাতায় নিয়ে আসতেন, তারাও অবস্থা বুঝে এই লোকালে রোগীকে আনছেন। সেটা যেমন সাশ্রয় হচ্ছে, তেমনই সময়ও অনেকটাই লাগছে। এই মুহূর্তে শিয়ালদহ মেন, বনগাঁ, বারাসত মিলিয়ে মোট ছ’জোড়া ট্রেন চলছে। ভাড়া কেমন? বনগাঁ থেকে শিয়ালদহ এসি লোকালের ভাড়া ১২০ টাকা, রানাঘাট থেকে শিয়ালদহ ১২০ টাকা ভাড়া। আর মান্থলি যথাক্রমে ২৪৩০, ২৪৪০ টাকা। অর্থাৎ ৮১ টাকা দিন প্রতি।
সাধারণ ট্রেনের ভাড়ার প্রায় ৮ থেকে ৯ গুন বেশি ভাড়া এই ট্রেনের। অনেক সময় যাত্রীদের বসার জায়গাও মেলে না। তার পরেও কেন এই ট্রেন পছন্দের? অফিসযাত্রী দেবময় পাল, শ্রেষ্ঠা দাস বলেন, ‘এই ট্রেনে স্পেস বেশি। ভিড় হলেও সেটা গাদাগাদি করার মতো নয়।’
শিয়ালদহের ডিআরএম রাজীব সাক্সেনা 'এই সময়'-কে বলেন, ‘এসি লোকাল পরিষেবা সফল হয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা মতোই সাড়া মিলেছে। যদিও পরিষেবা শুরুর সময়ে কিছুটা আশঙ্কা ছিল। তবে শহরতলির ট্রেন পরিষেবায় মেট্রোর মতোই যাত্রী উপস্থিতি ২০০ শতাংশ পর্যন্ত হতে পারে।’ তা হলে কি আরও পরিষেবা বাড়বে? তাঁর উত্তর, ‘এখনই নতুন এসি লোকাল চালানোর পরিকল্পনা নেই। কারণ, আমাদের হাতে মাত্র দুটি রেক রয়েছে এবং সেগুলিকে ইতিমধ্যেই সর্বোচ্চ মাত্রায় কাজে লাগানো হচ্ছে।’