• অন্নপূর্ণা যোজনার ৩০০০ টাকা অ্যাকাউন্টে ঢুকতেই অসুস্থ পড়শির হাতে তুলে দিলেন সুস্মিতা, নজির
    News18 বাংলা | ০৯ জুলাই ২০২৬
  • ‘বিপন্ন মানুষের পাশে দাঁড়ানোই তো প্রকৃত ধর্ম।’ আজকের এই চূড়ান্ত ব্যস্ত ও আত্মকেন্দ্রিক যুগে কবি শঙ্খ ঘোষের সেই মানবিক আহ্বানকে যেন অক্ষরে অক্ষরে সত্যি করে দেখালেন উত্তর দিনাজপুরের এক সাধারণ গৃহবধূ। নিজের অভাব-অনটনকে ভুলে, এক চরম অসুস্থ প্রতিবেশীর সাহায্যে যেভাবে তিনি হাত বাড়িয়ে দিলেন, তা দেখে আজ ধন্য ধন্য করছে গোটা রায়গঞ্জ শহর।

    হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া এই ঘটনার সাক্ষী উত্তর দিনাজপুরের রায়গঞ্জ শহরের ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কালীতলা এলাকা। সেখানকার বাসিন্দা সুস্মিতা বিশ্বাস পেশায় এক সাধারণ গৃহবধূ। শনিবার তিনি তাঁর নিজস্ব ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে রাজ্য সরকারের ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকল্পের প্রথম কিস্তির পুরো ৩ হাজার টাকা পান। কিন্তু সেই টাকা নিজের সংসারে খরচ না করে, তিনি সরাসরি তুলে দেন পাশের বাড়ির অত্যন্ত অসহায় ও দীর্ঘদিনের অসুস্থ প্রতিবেশী শঙ্কর চক্রবর্তীর হাতে। সুস্মিতা দেবীর স্পষ্ট কথা, ‘আমার চেয়েও ওঁর এই টাকার প্রয়োজন অনেক বেশি।’

    স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, কালীতলার বাসিন্দা শঙ্কর চক্রবর্তী গত সাত বছর ধরে এক জটিল রোগে আক্রান্ত। রোগ এতই গুরুতর যে, তিনি অনেকদিন আগেই নিজের স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে সম্পূর্ণ ঘরবন্দি হয়ে পড়েছেন। তাঁর দেখভাল করার মতো পরিবারে তেমন কেউ নেই। একমাত্র দিদি আলপনা পাল নিজের সামান্য সামর্থ্যের মধ্যে দিয়ে কোনওক্রমে ভাইয়ের মুখে দু’বেলা অন্ন তুলে দেন। চিকিৎসার খরচ চালানো তো দূরের কথা, নিত্যদিনের সংসার চালানোই তাঁদের কাছে এক বিরাট যুদ্ধ।

    প্রতিবেশীর এই দুর্বিষহ কষ্ট প্রতিদিন চোখের সামনে দেখতেন সুস্মিতা বিশ্বাস। তিনি নিজেও যে খুব একটা আর্থিকভাবে সচ্ছল, তা নয়। টানাপোড়েনের সংসার তাঁরও। তা সত্ত্বেও সরকার বদলের পর অন্নপূর্ণা যোজনার প্রথম কিস্তির টাকাটা হাতে পেতেই তাঁর মনে হয়েছে, এই অর্থ দিয়ে যদি একটা অসুস্থ মানুষের চিকিৎসা সামান্য হলেও এগোয়, তবে সেটাই হবে শ্রেষ্ঠ কাজ।

    সুস্মিতাদেবী বলেন, “প্রথমবার অন্নপূর্ণা যোজনার তিন হাজার টাকা পেয়েছিলাম। কিন্তু আমার চেয়েও অবস্থা খারাপ প্রতিবেশী শঙ্করবাবুর। তাই এই অর্থ ওঁর হাতে তুলে দিলাম, যাতে উনি কিছুটা হলেও চিকিৎসার সুযোগ পান।” এক গৃহবধূর এমন নিঃস্বার্থ ও মানবিক উদ্যোগের খবর ছড়িয়ে পড়তেই প্রশংসায় পঞ্চমুখ এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা। এই ঘটনাকে কুর্নিশ জানিয়ে বিজেপির জেলা সভাপতি নিমাই কবিরাজ বলেন, “সুস্মিতাদেবীর মতো মানুষজন যদি এভাবে মুক্তমনে অসহায়দের পাশে দাঁড়ান, তবে আমাদের সমাজ ও এলাকা আরও সুন্দর হয়ে উঠবে।”

    অন্যদিকে, রায়গঞ্জের বিধায়ক তথা রাজ্যের শিক্ষা, দমকল ও জরুরি পরিষেবা বিভাগের প্রতিমন্ত্রী কৌশিক চৌধুরী বলেন, “সুস্মিতাদেবীর মতো মানুষদের জন্যই সমাজ আজও টিকে আছে, সুন্দর আছে। ওঁর প্রতি আমার শ্রদ্ধা অনেক বেড়ে গেল। সময় সুযোগ করে আমি অবশ্যই ওঁর বাড়ি গিয়ে ওঁর সঙ্গে দেখা করব।” আজকের দিনে যখন মানুষ নিজের ভাল থাকা নিয়েই ব্যস্ত, তখন রায়গঞ্জের কালীতলা এলাকার এই গৃহবধূ প্রমাণ করে দিলেন, মানুষ আজও মানুষের জন্য কাঁদে, এবং মানুষের পাশেই দাঁড়ায়।
  • Link to this news (News18 বাংলা)