সীমান্ত নিরাপত্তায় জোর, মালদায় আরও ৩টি থানা ও নতুন ফাঁড়ির প্রস্তাব
আজ তক | ১০ জুলাই ২০২৬
India Bangladesh Border Malda: ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্তে নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে এবং সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বড় পদক্ষেপের পথে মালদা জেলা পুলিশ। সীমান্তবর্তী এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, অপরাধ দমন এবং জরুরি পরিষেবা দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আরও তিনটি নতুন থানা ও দু'টি নতুন পুলিশ আউটপোস্ট তৈরির জন্য রাজ্য সরকারের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
বর্তমানে বৈষ্ণবনগর, কালিয়াচক এবং হবিবপুর থানার অধীনে বিস্তীর্ণ সীমান্ত এলাকা রয়েছে। কিন্তু সংশ্লিষ্ট থানাগুলি সীমান্ত থেকে অনেক দূরে হওয়ায় কোনও অপরাধ, অনুপ্রবেশ, চোরাচালান বা সাধারণ আইনশৃঙ্খলার সমস্যা দেখা দিলে পুলিশ পৌঁছতে অনেক সময় লাগে। একইভাবে সীমান্তবাসীদেরও অভিযোগ জানাতে বা প্রশাসনিক সাহায্য পেতে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
এই পরিস্থিতি বদলাতেই বৈষ্ণবনগর থানার কুম্ভীরা পুলিশ ফাঁড়ি, কালিয়াচক থানার গোলাপগঞ্জ ফাঁড়ি এবং হবিবপুর থানার বুলবুলচণ্ডী পুলিশ ফাঁড়িকে পূর্ণাঙ্গ থানায় উন্নীত করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি হবিবপুরের জাজইল এবং বামনগোলার জগদ্দলায় দুটি নতুন পুলিশ আউটপোস্ট তৈরিরও পরিকল্পনা রয়েছে।
জেলা পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, প্রতিটি নতুন থানা চালু করতে গড়ে ২০-২৫ জন পুলিশ অফিসার এবং প্রায় ৫০ জন পুলিশকর্মীর প্রয়োজন হবে বলে রাজ্য প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। মালদার পুলিশ সুপার অনুপম সিং জানিয়েছেন, নতুন থানা চালু হলে সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষের কাছে পুলিশি পরিষেবা আরও দ্রুত পৌঁছবে এবং অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা নেওয়া সম্ভব হবে।
হবিবপুরের বিজেপি বিধায়ক তথা রাজ্যের মন্ত্রী জোয়েল মুর্মুর দাবি, হবিবপুর, বৈষ্ণবনগর ও কালিয়াচকের বিস্তীর্ণ অংশে এখনও কাঁটাতারের বেড়া সম্পূর্ণ হয়নি। তাঁর মতে, নতুন থানা ও আউটপোস্ট তৈরি হলে অবৈধ অনুপ্রবেশ, গরু পাচার, মাদক চোরাচালান এবং সীমান্তবর্তী অপরাধের বিরুদ্ধে আরও কড়া নজরদারি চালানো সম্ভব হবে। তিনি বলেন, সীমান্ত রক্ষায় বিএসএফের পাশাপাশি স্থানীয় পুলিশের সক্রিয় উপস্থিতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন প্রয়োজন নতুন থানা?
মালদার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত দীর্ঘদিন ধরেই নিরাপত্তার দিক থেকে স্পর্শকাতর বলে পরিচিত। বিশেষ করে বৈষ্ণবনগর, কালিয়াচক, হবিবপুর ও বামনগোলা সংলগ্ন বিভিন্ন এলাকায় অতীতে অনুপ্রবেশ, গবাদি পশু পাচার, জাল নোট, মাদক পাচার এবং মানবপাচারের মতো অপরাধের অভিযোগ উঠেছে। সীমান্তের কিছু অংশে নদী, চর এলাকা এবং যেখানে এখনও সম্পূর্ণ কাঁটাতারের বেড়া নেই, সেখানে নজরদারি তুলনামূলকভাবে কঠিন হয়ে পড়ে।
গত কয়েক বছরে কী বলছে তথ্য?
জেলা-ভিত্তিক গত ১০ বছরের সরকারি অনুপ্রবেশের পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশিত না হলেও বিএসএফের দক্ষিণবঙ্গ ফ্রন্টিয়ারের তথ্য অনুযায়ী সীমান্তে অনুপ্রবেশ ও চোরাচালান রুখতে নিয়মিত অভিযান চলছে। ২০২৩ সালে দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তে অনুপ্রবেশে সহায়তার অভিযোগে ৫৩ জন দালালকে গ্রেফতার করা হয়। একই বছরে ১৮৬ জন বাংলাদেশি নাগরিক এবং ৪৯৩ জন ভারতীয়কে বিভিন্ন চোরাচালান মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছিল। ২০২৪ সালেও একাধিক গ্রেফতারি অভিযান চালানো হয় এবং সীমান্তে নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে।
সম্প্রতি মালদা সীমান্তে বিএসএফের হাতে একাধিক বাংলাদেশি নাগরিক ধরা পড়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। বৈষ্ণবনগরের সুখদেবপুর এলাকায় কাঁটাতারবিহীন সীমান্ত দিয়ে অনুপ্রবেশের চেষ্টা ঘিরে বিএসএফ ও বিজিবির মধ্যে উত্তেজনার ঘটনাও ঘটে, যা এই সীমান্তের সংবেদনশীলতার দিকটি আবারও সামনে এনে দিয়েছে।
নতুন থানা হলে কী সুবিধা?
নতুন থানাগুলি চালু হলে সীমান্ত এলাকায় পুলিশের প্রতিক্রিয়ার সময় উল্লেখযোগ্যভাবে কমবে। কোনও অনুপ্রবেশ, অপরাধ বা দুর্ঘটনার খবর পেলেই দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছতে পারবে পুলিশ। স্থানীয় বাসিন্দাদের থানায় অভিযোগ জানাতে দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে হবে না। পাশাপাশি বিএসএফ ও জেলা পুলিশের মধ্যে সমন্বিত টহল, গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং অপরাধ দমনের কাজ আরও কার্যকর হবে।
এছাড়া সীমান্ত এলাকায় মানবপাচার, মাদক পাচার, জাল নোট চক্র, গবাদি পশু পাচার এবং আন্তঃসীমান্ত অপরাধ মোকাবিলায় নতুন থানাগুলি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিতে পারবে বলে মনে করছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। প্রশাসনের আশা, নতুন পুলিশ অবকাঠামো গড়ে উঠলে সীমান্তবাসীর নিরাপত্তা যেমন বাড়বে, তেমনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষার ক্ষেত্রেও ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।