• দৈনিক স্টেটসম্যানের খবরেই সিলমোহর: বিজেপিতে সুখেন্দু-সুস্মিতা-প্রকাশ, এবার রাজ্যসভার পথে
    দৈনিক স্টেটসম্যান | ১০ জুলাই ২০২৬
  • দৈনিক স্টেটসম্যান প্রথম জানিয়েছিল, সেই খবরেই বৃহস্পতিবার সিলমোহর পড়ল। তৃণমূল কংগ্রেসের তিন পদত্যাগী রাজ্যসভা সাংসদ সুখেন্দুশেখর রায়, প্রকাশ চিক বরাইক এবং সুস্মিতা দেব আনুষ্ঠানিকভাবে বিজেপিতে যোগ দিলেন। বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যর হাত ধরে পদ্মশিবিরে প্রবেশ করলেন তিনজনই, এবং দৈনিক স্টেটসম্যানের খবর অনুযায়ী বিজেপির টিকিটেই আগামী ২৪ জুলাইয়ের রাজ্যসভা উপনির্বাচনে (Rajya Sabha byelection) প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে চলেছেন তাঁরা। নামেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা, কারণ সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে তাঁরা তিন জনই অনায়াসে রাজ্যসভায় যাবেন।

    গত এক মাসে বাংলার রাজনীতিতে এই তিনটি নাম বারবার শিরোনামে এসেছে। সবার আগে গত ৮ জুন রাজ্যসভার সদস্যপদ থেকে ইস্তফা দেন সুখেন্দুশেখর রায়। তাঁর মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০২৯ সালে। এরপর ১০ জুন পদত্যাগ করেন সুস্মিতা দেব, যাঁর মেয়াদ ছিল ২০৩০ সাল পর্যন্ত। সবশেষে ১১ জুন সাংসদ পদ ছাড়েন প্রকাশ চিক বরাইক। তিনজনই একইসঙ্গে তৃণমূলের প্রাথমিক সদস্যপদও ত্যাগ করেন। নির্বাচন কমিশন এই তিন শূন্য আসনে উপনির্বাচনের যে সূচি ঘোষণা করেছে, তাতে মনোনয়ন জমার শেষ দিন ১৪ জুলাই, প্রতীক প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ১৭ জুলাই এবং ভোটগ্রহণ ২৪ জুলাই।

    পদত্যাগের পর থেকেই তিনজনের বক্তব্যে দলের প্রতি ক্ষোভের সুর স্পষ্ট ছিল। প্রকাশ চিক বরাইক পদত্যাগের কারণ হিসেবে জানিয়েছিলেন, নির্বাচনী বিপর্যয়ের পর দলের আর জনাদেশ (mandate) নেই। সুখেন্দুশেখর রায় প্রকাশ্যেই দলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মন্তব্য করেছিলেন যে, যে দুর্নীতি হয়েছে তাতে ভবিষ্যতে এই দল আর টিকবে না। সুস্মিতা দেব অবশ্য শুরুতে সরাসরি বিজেপিতে যাওয়ার কথা স্বীকার করেননি, শুধু বলেছিলেন গণতান্ত্রিক দেশে কোন রাজনীতি করবেন তা সম্পূর্ণ তাঁর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত। তবে অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার সঙ্গে বৈঠক এবং পরবর্তীতে অমিত শাহর ডাকা বৈঠকে সুখেন্দুর উপস্থিতি জল্পনাকে ক্রমশ জোরালো করে তোলে।

    লক্ষণীয় বিষয়, গত ২৯ মে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য নিজেই স্পষ্ট ভাষায় বলেছিলেন, নিজের সম্পত্তি বাঁচাতে কেউ বিজেপিতে আসতে চাইলে তাঁদের জন্য দলের দরজা বন্ধ থাকবে, এবং আগামী তিন মাস তৃণমূল থেকে যোগদান কার্যত বন্ধ রাখার কথাও তিনি ঘোষণা করেছিলেন। মাত্র দেড় মাসের মাথায় সেই একই শমীক ভট্টাচার্যর হাত ধরে তিনজন প্রাক্তন তৃণমূল সাংসদের দলে যোগদান রাজনৈতিক মহলে স্বাভাবিকভাবেই চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে। বিজেপির অন্দরের ব্যাখ্যা, প্রশাসনিক বা আর্থিক অভিযোগে অভিযুক্ত নেতা-নেত্রীদের জন্যই দরজা বন্ধ রাখার কথা বলা হয়েছিল, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরব হয়ে দল ছাড়া নেতাদের ক্ষেত্রে সেই নীতি প্রযোজ্য নয়।

    বিধানসভার বর্তমান সংখ্যাতত্ত্ব বিজেপির পক্ষেই স্পষ্টভাবে হেলে রয়েছে। ২৯৪ আসনের বিধানসভায় বিজেপির নিজস্ব বিধায়ক সংখ্যা ২০৮, অর্থাৎ একটি রাজ্যসভা আসন জিততে যেখানে প্রয়োজন প্রায় ৭০টি ভোট, সেখানে বিজেপির একার শক্তিতেই তিনটি আসনেই জয় নিশ্চিত বলে ধরে নেওয়া হচ্ছে। উল্টোদিকে তৃণমূলের মোট বিধায়ক সংখ্যা ৮০ হলেও দলের পরিষদীয় অংশ এখন দুই শিবিরে বিভক্ত, ফলে ঐক্যবদ্ধ প্রার্থী দেওয়াই তাদের কাছে চ্যালেঞ্জ। ফলে বিজেপির টিকিট পাওয়া তিন প্রার্থীই যে রাজ্যসভায় যাবেন, তা একপ্রকার নিশ্চিত।

    সুখেন্দু-সুস্মিতাদের যোগদানকে নিছক তিনটি আসনের অঙ্ক হিসেবে না দেখে বিজেপির সার্বিক রাজনৈতিক কৌশলের অংশ হিসেবেও দেখছেন পর্যবেক্ষকরা। বিধানসভা নির্বাচনে জয়ের পর তৃণমূলের প্রবীণ ও পরিচিত মুখদের দলে টেনে বিজেপি একদিকে যেমন নিজেদের সাংগঠনিক ভিত মজবুত করতে চাইছে, তেমনই তৃণমূলের অভ্যন্তরীণ দুর্নীতি ও বিভাজনের বিরুদ্ধে নিজেদের বয়ানকেও আরও জোরালো ভিত্তি দিতে চাইছে বলে মনে করা হচ্ছে। উল্লেখ্য, তৃণমূল ছাড়ার পর সুখেন্দুশেখর সম্প্রতি ৬ জুলাই শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের জন্মদিনে তাঁর একটি পুরনো চিঠি প্রকাশ্যে এনেছিলেন, যা তাঁর রাজনৈতিক অভিমুখ বদলের ইঙ্গিত হিসেবেও ব্যাখ্যা করছেন অনেকে।
  • Link to this news (দৈনিক স্টেটসম্যান)