ঘরে ফিরে নবজাতকের মুখদর্শন, যন্ত্রণায় প্রলেপ বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ হওয়া দানিশের, কী বলছেন সুইটি?
প্রতিদিন | ১০ জুলাই ২০২৬
এক বছরের প্রতীক্ষার অবসান। আদালতের নির্দেশে বাংলাদেশে ‘পুশব্যাক’ হওয়ার যন্ত্রণায় ইতি টেনে নিজের বাড়ি বীরভূমের পাইকরে ফিরলেন দানিশ শেখ, সুইটি বিবি এবং তাঁর দুই ছেলে। বুধবার তাঁরা বাংলাদেশের সীমান্ত পেরিয়ে মালদার মহদীপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। এরপর দীর্ঘ যাত্রাপথ পেরিয়ে গ্রামে ফিরে নবজাতক ছেলের মুখ দেখা, প্রিয়জনদের কাছে পাওয়া। তাতেই যেন ঘুচল এতদিনের সমস্ত যন্ত্রণা। দানিশ শেখ, সুইটি বিবিরা আনন্দে বিহ্বল। বিশেষত দানিশ শেখের সঙ্গে ৪ মাসের ছেলে আপনের মিলন এক মধুর কাহিনি। তিনি নিজেও বলছেন, “আমার ছোট ছেলে আপনকে কাছে পেয়ে আমি খুব খুশি।জন্মের পর এই প্রথম আমার ছেলের মুখ দেখলাম, ছেলেও তার বাবাকে প্রথম দেখলো। পরিবারের সকলকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে আমার।” সুইটি বিবির প্রতিক্রিয়া, “বাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে পড়ে থাকার জন্য মনের ভিতরটা আমাদের ভালো ছিল না।”
জীবিকার টানে বছরের পর বছর ধরে দিল্লিতে ছিল বীরভূমের পাইকর গ্রামের এই বাসিন্দারা। কিন্তু গত বছরের ২৩ জুন ঘটে যায় অপ্রত্যাশিত ঘটনা। পরিযায়ী শ্রমিকদের ‘বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী’ সন্দেহে আটক করে দিল্লি পুলিশ। আটক হওয়া ছয়জনের মধ্যে ছিলেন পাইকর এলাকার বাসিন্দা অন্তঃসত্ত্বা সোনালি খাতুন ও তাঁর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, পরে ২৬ জুন অসম সীমান্ত দিয়ে তাঁদের বাংলাদেশে পুশব্যাক করা হয়। পরিবারের দাবি ছিল, যথাযথ নাগরিকত্ব যাচাই ছাড়াই তাঁদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়।
এরপর দীর্ঘদিন তাঁদের সঙ্গে কোনও যোগাযোগ না থাকায় উদ্বেগে পড়ে পরিবার। সোনালি খাতুনের বাবা ভদু শেখ গত বছরের ৬ জুলাই পাইকর থানায় নিখোঁজ ডায়েরি করেন।
পরে তাঁদের দেশে ফিরিয়ে আনার দাবিতে সোনালির মামাতো ভাই আমির খান কলকাতা হাই কোর্টে মামলা দায়ের করেন। মামলার শুনানির পর কলকাতা হাই কোর্ট গত বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর সোনালি-সহ ছ’জনকে দেশে ফিরিয়ে আনার নির্দেশ দেয়। পরে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে গত ৫ ডিসেম্বর অন্তঃসত্ত্বা সোনালি খাতুন ও তাঁর ছোট ছেলেকে ভারতে ফিরিয়ে আনা হয়। তবে তাঁর স্বামী দানিশ শেখ, সুইটি বিবি এবং তাঁর দুই ছেলে তখনও বাংলাদেশেই আটকে ছিলেন। অবশেষে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর বুধবার দানিশ শেখ, সুইটি বিবি, কুরবান শেখ ও ইমাম শেখ মালদহের মহদীপুর সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন। মালদায় তাঁদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও অন্যান্য আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পর এদিন রাত্রেই তাঁরা বীরভূমের পাইকরের উদ্দেশ্যে রওনা দেন।
বাড়ি ফিরে দানিশ শেখ জানান, “বাড়ি ফিরে স্বস্তি পেয়েছি। বিশেষ করে আমার ছোট ছেলে আপনকে কাছে পেয়ে আমি খুব খুশি। জন্মের পর এই প্রথম আমার ছেলের মুখ দেখলাম, ছেলেও তার বাবাকে প্রথম দেখল। পরিবারের সকলকে কাছে পেয়ে খুব ভালো লাগছে আমার। রাজ্যসভার তৃণমূল সাংসদ সামিরুল ইসলাম ও অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়কে ধন্যবাদ জানাই।” আবার কি দিল্লিতে কাজ করতে যাবেন? এ প্রশ্নের উত্তরে দানিশ বলছেন, “যদি এখানে একটু ভালো কাজ পেয়ে আমার পরিবারের দায়িত্ব নিতে পারি, তাহলে আর কোথাও যাব না। দেখি কী হয়।” দানিশের ভোটার কার্ড নেই এখনও। তবে আধার, প্যান কার্ড রয়েছে। সেসবের ভিত্তিতে তিনি ভারতের নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র পাওয়ার আবেদন জানিয়েছেন। আশা, খুব দ্রুত তা পাওয়া যাবে।
সুইটি বিবি নিজের তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা জানিয়ে বলেন, “দীর্ঘ এক বছর পর আমি বাড়ি ফিরে খুব খুশি হয়েছি। দিল্লি পুলিশ আমাদের উপর খুব অত্যাচার করেছিল। আমাদের খুব মারধরও করেছিল। বাংলাদেশের দীর্ঘদিন ধরে আমরা জেলে বন্দি ছিলাম। তবে জেলখানাতে কোনরকম অত্যাচারের শিকার হতে হয়নি আমাদের, আমরা সেখানে ভালোই ছিলাম। বাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে পড়ে থাকার জন্য মনের ভিতরটা আমাদের ভালো ছিল না। দিল্লি পুলিশের কাছে আমরা বারবার অনুরোধ করি। বলি যে আমরা বাংলাদেশি নই, তাও জোরজবরদস্তি আমাদের বাংলাদেশ পাঠিয়ে দেয়।”