'গেট আপ কিংশুক'-এর পাশে শিবপ্রসাদ-নন্দিতা, কবে আসছে ছবি
eTV Bharat | ০৯ জুলাই ২০২৬
কলকাতা, 9 জুলাই: 31তম কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবের বেঙ্গলি প্যানোরমা প্রতিযোগিতা বিভাগে জায়গা করে নিয়েছিল 'গেট আপ কিংশুক' (Get up Kingshuk)। প্রশংসা পায় দর্শকের। আর এবার বড় পর্দায় মুক্তির পালা এই ছবির। ছবিতে মুখ্য চরিত্র অর্থাৎ কিংশুকের ভূমিকায় অভিনয় করেছেন শাহির রাজ। এই ছবির পরিচালক নন্দন ঘোষ, যিনি দীর্ঘদিন শিবপ্রসাদ-নন্দিতার সহকারী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছেন। এই ছবিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রে অভিনয় করেছেন উইন্ডোজ প্রোডাকশনের মার্কেটিং ও পিআরের দায়িত্ব থাকা ভাগ্যশ্রী রায়চৌধুরী। এবার এই ছবির পাশে দাঁড়ালেন শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও নন্দিতা রায়। আর তাতে আপ্লুত ছবির পরিচালক নন্দন ঘোষ, ভাগ্যশ্রী রায়চৌধুরী দুজনেই।
নন্দন ঘোষ বলেন, "আমি, অর্ণব এবং প্রীতম একটা ফ্ল্যাটে থাকতাম। অর্ণব তখন কলেজে পড়ে, ক্যামেরার কাজ শুরু করেছে। টুকটাক ইভেন্ট করে। প্রীতম এবং আমি তখন উইন্ডোজে চাকরি করছি। এক দেড় বছর হয়েছে। প্রীতম একদিন বলল চল একটা ফিচার ফিল্ম বানাই এবার। এতগুলো শর্ট ফিল্ম করেছি আমরা। প্ল্যান করলাম পাঁচটা রবিবারে কীভাবে একটা ছবি করা যায়। আমি একটা স্ক্রিপ্ট লিখলাম। সময় নিয়েছিলাম প্রায় দেড় দু'মাস। আমাদের কাছে সেরকম বাজেট ছিল না। ক্যামেরা নিতে পারব না, ফুলটাইম অভিনেতা নিতে পারব না। তাই আমাদের বন্ধুদের মধ্যে যে ভালো অভিনেতা, থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত, গান গায় এমনই একজনকে নিলাম।"
নন্দনের কথায়, "শাহির দা তখন সদ্য কাজ শুরু করেছে। বেশ কিছু ভালো কাজও করেছে। এরপর গল্প, স্ক্রিপ্ট, শিডিউল বানাই। বন্ধুদের বাড়িকে লোকেশন বানিয়েছি, রাস্তাঘাট, লুকিয়ে শুট, তাড়া খাওয়া সব সেখানে ছিল। কাস্টিং করার পর পাঁচটা রবিবার আমরা শুট করি। সারা সপ্তাহ কাজ করর পর রবিবারেই বসতাম এডিটিং, কালারে। ধীরে ধীরে এগোয়। প্রায় দু'মাস ধরে চিত্রনাট্য লেখার পর সীমিত বাজেটের কথা মাথায় রেখে বন্ধুদের নিয়েই তৈরি হয় অভিনয়শিল্পীদের দল। রবিবারে শুটিং, রবিবারেই এডিটিং, ডাবিং ও পোস্ট প্রোডাকশন করতে করতেই তিন বছরে শেষ হয় ছবির কাজ। ছবির মূল ভাবনাটাও এসেছে একেবারে নিজের জীবন থেকেই।"
নন্দন আরও জানান, "প্রীতম আমাকে বলেছিল আমার জীবনে নাকি তেমন কোনও সমস্যা নেই। চাকরি আছে, স্টেডি গার্ল ফ্রেন্ড আছে। তখনই আমি উপলব্ধি করি আমার সবচেয়ে বড় সমস্যা ঘুম। অনেক রাত অবধি জেগে থাকা, সকালে উঠতে না পারা এবং সময়মতো অফিসে না পৌঁছনো- যা আজকের প্রজন্মের খুব পরিচিত বাস্তব। সেই অভিজ্ঞতাকেই হাসির মোড়কে তুলে ধরা হয়েছে 'গেট আপ কিংশুক'-এ। নির্মাণে অনুপ্রেরণা ছিল স্বল্প বাজেটের গেরিলা স্টাইলের সিনেমা, পুরনো বাংলা টেলিফিল্ম এবং নিউ ওয়েভ ধারার ছবি।"
নন্দন জানান যে তাঁরা প্রথমে ছবিটিকে ইউটিউবে মুক্তি দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিলেন। কারণ নতুন পরিচালক ও নতুন মুখদের নিয়ে তৈরি ছবির প্রতি খুব একটা আগ্রহ দেখাননি কেউ। কিন্তু ঠিক ইউটিউবে মুক্তির আগের দিনই আসে কলকাতা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব থেকে নির্বাচনের ইমেল আসে। উৎসবে ছবির দুটি প্রদর্শনীই ছিল হাউসফুল। দর্শকদের প্রশংসা এবং দীর্ঘ লাইনই তাঁদের বিশ্বাস করিয়ে দেয়, ছবিটি বড়পর্দায় মুক্তি পাওয়া উচিত।
এই গোটা সফরের সবচেয়ে চমকপ্রদ দিক, ছবি তৈরির কথা শিবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় এবং নন্দিতা রায়কে এতদিন জানানোই হয়নি। নন্দন বলেন, "ভয় নয়, বরং এক ধরনের লজ্জা আর সংকোচ কাজ করেছে। কিন্তু কিফে নির্বাচনের পর সব জানানোর পর শিবপ্রসাদ শুধু পাশে দাঁড়াননি, ছবিটি দেখে বলেন, এটি মোবাইলের জন্য নয়, বড়পর্দার ছবি। তাঁর উদ্যোগেই ছবির সেন্সরের কাজও এগোয়। সোশাল মিডিয়ায় শিবপ্রসাদ লিখেছেন, "স্বাধীন পরিচালকদের সবচেয়ে বড় লড়াই ছবি মুক্তির সময়। মাত্র 48 ঘণ্টার প্রচার নিয়েও তিনি দর্শকদের হলে গিয়ে ছবিটি দেখার আবেদন জানিয়েছেন। তাঁর বিশ্বাস, সিনেমার সবচেয়ে বড় শক্তি বাজেট নয়, কনটেন্ট।"
ছবির অন্যতম অভিনেত্রী ভাগ্যশ্রী রায়চৌধুরীর ছোটবেলা থেকে থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও উইন্ডোজে যোগ দেওয়ার পর অভিনয়ে সময় দিতে পারেননি। কেননা সেখানে গুরুদায়িত্ব সামলাতে হয় তাঁকে। বর্তমানে তিনি সংস্থার মার্কেটিং ও পিআরের দায়িত্ব সামলান। নন্দন ঘোষের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কও সহকর্মীর গণ্ডি ছাড়িয়ে ভাইবোনের মতো। একদিন গভীর রাতে নন্দন তাঁকে ছবির গল্প শোনান, আর সেখান থেকেই শুরু হয় এই যাত্রা।
ভাগ্যশ্রী জানিয়েছেন, "নিজের অভিনীত ছবির প্রচারের জন্য সবচেয়ে কম সময় পেলাম। তবু দাদা-দিদির সমর্থন পেয়েছি এটা বড় প্রাপ্তি আমার। ছবি দেখে দাদা বলেছিলেন, অভিনয়ই তাঁর আসল জায়গা। এটাও একটা বড় প্রাপ্তি।" শাহিরের কথায়, "এই ছবি কিংশুককে কেন্দ্রে রেখে। তার মফস্বলে জন্ম। কলকাতায় আসে। চাকরিও পেয়ে যায় চটপট। একটা প্রেমও হয়। মানে গোছানো সুন্দর একটা জীবন। এখানেই শেষ নয়, ঘটনাচক্রে সে যে বাড়িটাতে থাকে সেখানে তার রুমের পাশে থাকে একটি মেয়ে। দেখতে গেলে তার একটা ভালোই জীবন আছে। কিন্তু সমস্যা অন্য জায়গায়। তার রাতে তাড়াতাড়ি ঘুম আসে না। উঠতে পারে না সকালে। তাই ঘুম আনতে নানা চেষ্টা করে সে। ছোট সমস্যা মনে হলেও এই সমস্যাটা ছোট নয় একেবারেই। সে ঠিক কাজ ঠিক সময়ে করতে পারে না। গার্লফ্রেন্ডকে সময় দিতে পারে না। গোটা দিন তার পিছিয়ে যায়। এভাবেই চলে ওর জীবন। এরপরে কী হয় সেটাই দেখার।"
10 জুলাই নন্দন 2-এ মুক্তি পাচ্ছে 'গেট আপ কিংশুক'। শাহির রাজ, সন্দীপন তপাদার, অনুতর্ষ মুখোপাধ্যায়, অরূপ কর, কৌশিক মণ্ডল, দ্বীপান্বিতা দাস, ভাগ্যশ্রী রায়চৌধুরী, রাজশ্রী বিশ্বাস এবং মৌপর্ণা সাহা অভিনীত এই ছবির মাধ্যমে একদল তরুণ নির্মাতা প্রমাণ করতে চাইছেন, বড় বাজেট নয়, ভালো গল্পই শেষ পর্যন্ত দর্শকের মন জিতে নেয়।