নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বারুইপুর কাণ্ডে প্রতিদিন বর্বরতার একের পর এক নিদর্শন সামনে আসছে। বিকৃত যৌনলিপ্সা চরিতার্থ করা এবং তারপর ওই নাবালিকাকে নৃশংসভাবে খুনের ঘটনা নতুন মাত্রা নিয়েছে। বৃহস্পতিবার তদন্তকারী সিটের সূত্রে জানা গিয়েছে, বারবার আঘাত করা হয়েছিল নাবালিকার ঘাড়ে ও পিঠে। সেই আঘাতের অভিঘাত এতটাই প্রবল ছিল যে, তার মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। মারাত্মক ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘাড়ও। সেই ইঙ্গিত মিলেছে ধৃতদের জেরা এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টেও। অভিযুক্ত আনন্দ সরদার ও দিবাকর—দু’জনই পুলিশকে জানিয়েছে, নাবালিকাকে মাটিতে রীতিমতো আছাড় মেরেছিল তারা। সঙ্গ দিয়েছিল প্রভাস মণ্ডল ও কবির মোল্লা। অত্যাচারের এই নির্মমতায় হতবাক হয়ে গিয়েছেন তদন্তকারী আধিকারিকরা। তাঁরা আরও সূত্রের খোঁজে রয়েছেন। ইতিমধ্যেই ঘটনাস্থল থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে ওই নাবালিকার চুল-নখের নমুনা। এই সবই ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হচ্ছে।
তদন্তকারীরা আনন্দকে জেরা করে জানতে পারছেন, নাবালিকার উপর তাদের নজর অনেকদিন ধরেই ছিল। পরিকল্পনা করেই তারা অপহরণ ও গণধর্ষণ করে তাকে। ঘটনার আগে তারা রেললাইনের ধারের ঠেকে মদ ও গাঁজা খায়। তখনই ঠিক করে, তুলে আনবে নাবালিকাকে। যেহেতু প্রভাসের ওই নাবালিকার বাড়িতে যাতায়াত ছিল, তাই তাকেই ‘কাজের ভার’ দেয় আনন্দ। প্ল্যান ছিল, বাড়িতে গিয়ে কিছু না কিছু টোপ দিয়ে সে নাবালিকাকে বাইরে নিয়ে আসবে। ঘটনাচক্রে বান্ধবীর জন্মদিনের জন্য সে উপহার কিনতে বেরনোয় বাড়িতে ঢুকতে হয়নি প্রভাসকে। রাস্তাতেই তাকে পেয়ে যায়। বলে, ঘুরতে নিয়ে যাবে। আনন্দ জেরায় দাবি করেছে, রেললাইনের ধারের ওই ঠেকে নিয়ে আসে তাকে। সেখানে আনন্দ, দিবাকর ও কবির উপস্থিত ছিল। কিছুই বুঝতে দেওয়া হয়নি তাকে। প্রথমে খেতে দেওয়া হয়। খাবার সময়ই তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে চারজন। ভয় পেয়ে যায় নাবালিকা। প্রতিরোধ করে। তখনই হাত বেঁধে ফেলা হয়। দু’জন চেপে ধরে মুখ। চার অভিযুক্তের গায়ের জোরের সঙ্গে পেরে ওঠেনি সে। গণধর্ষণ করা হয় তাকে। তারপর শুরু হয় মার। কিল-ঘুসি মারতে থাকে চারজনই। মাটিতে মাথা ঠুকে দেওয়া হয়। আঘাত করা হয় ঘাড়ে-পিঠে। বারবার। আছাড় মারা হয়। এই অমানুষিক নির্যাতনে মেরুদণ্ড ভেঙে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় ঘাড়ও। এতেই অচৈতন্য হয়ে পড়ে নাবালিকা। তারপরই তাকে পুকুরে ফেলে দেয় অভিযুক্তরা।
আনন্দদের বয়ানের সঙ্গে ময়না তদন্তের রিপোর্ট মিলে গিয়েছে। সেখানে একই ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। বারবার আঘাত না করলে শরীরের এত হাড় ভাঙা সম্ভব নয়। নেশাগ্রস্ত অবস্থায় তারা গোটা কাজটি করেছিল বলে দাবি। অভিযুক্তরা স্বীকার করেছে, তথ্য-প্রমাণ লোপাট করতেই দেহ ফেলা হয়েছিল পুকুরে। সূত্রের খবর, তদন্তকারীরা গণধর্ষণ ও খুনের অভিযোগ প্রমাণের জন্য প্রয়োজনীয় সাক্ষ্য ও তথ্য-প্রমাণ জোগাড় করে ফেলেছেন। বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে সিসি ক্যামেরার ফুটেজ। সেটিও পাঠানো হয়েছে ফরেনসিকে। নাবালিকাকে অপহরণ করে নিয়ে যেতে যিনি দেখেছিলেন, সেই প্রত্যক্ষদর্শীর বয়ান রেকর্ড করা হয়েছে। একইসঙ্গে প্রত্যক্ষদর্শীদের গোপন জবানবন্দির জন্য আদালতে আবেদন জানাচ্ছে পুলিশ। রাজ্য পুলিশের এক শীর্ষ কর্তার কথায়, তদন্তের জাল প্রায় গুটিয়ে এসেছে। দ্রুত চার্জশিট জমা দিয়ে বিচারপর্ব শুরু করতে চান তাঁরা।