আজকাল ওয়েবডেস্ক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা , রোবোটিক্স এবং থ্রিডি প্রিন্টিং এই তিন প্রযুক্তির সমন্বয় আমূল বদল আনতে চলেছে আগামী দিনের শিল্পব্যবস্থায়। বর্তমানে থ্রিডি প্রিন্টিং মহাকাশ গবেষণা, চিকিৎসাবিজ্ঞান, প্রতিরক্ষা, অটোমোবাইল, স্থাপত্য, শিক্ষা এবং উৎপাদন শিল্পে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।
আর পড়ুয়ারা যাতে আরও ভাল করে থ্রি-ডি প্রিন্টিংকে রপ্ত করতে পারেন সে কারণে শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির ইলেকট্রনিকস বিভাগে গড়ে উঠেছে থ্রি-ডি প্রিন্টিং অ্যান্ড অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং সেন্টার অফ এক্সেলেন্স। ভারত সরকারের ইলেকট্রনিক্স ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রক এবং C-DAC কলকাতার সহযোগিতায় তৈরি করা হয়েছে এই বিশেষ কেন্দ্র। ফলে, উত্তরবঙ্গের পড়ুয়াদের জন্য এই আধুনিক প্রযুক্তিতে দক্ষতা অর্জনের নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে।
শিলিগুড়ি ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজির মূল লক্ষ্য উত্তরবঙ্গের শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের 3D প্রিন্টিং প্রযুক্তিতে দক্ষ করে তোলা এবং আধুনিক শিল্পক্ষেত্রের জন্য প্রস্তুত করা। বর্তমানে উৎপাদন শিল্প, স্বাস্থ্যসেবা, অটোমোবাইল, মহাকাশ গবেষণা, স্টার্ট-আপ এবং বিভিন্ন প্রকৌশল ক্ষেত্রে এই প্রযুক্তির চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ফলে এই প্রশিক্ষণ ভবিষ্যতের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ তৈরি করছে।
এই কেন্দ্রে Stratasys F190CR Industrial 3D Printer রয়েছে। যার মাধ্যমে ABS, ASA এবং Carbon Fiber Reinforced Material ব্যবহার করে টেকসই প্রোটোটাইপ, ফাংশনাল পার্টস, জিগ, ফিক্সচার এবং শিল্পে ব্যবহৃত বিভিন্ন কম্পোনেন্ট তৈরি করা যায়। এছাড়া, 4DS Smart One 3D Printer-এর মাধ্যমে PLA, PETG এবং TPU ফিলামেন্ট ব্যবহার করে শিক্ষামূলক মডেল, ইঞ্জিনিয়ারিং প্রজেক্ট, কাস্টম ডিজাইন এবং ছোট যন্ত্রাংশ তৈরির প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় পড়ুয়াদের।
তবে শুধু 3D প্রিন্টার পরিচালনাই নয়, পড়ুয়াদের CAD Modeling, 3D Scanning, Reverse Engineering, Slicing Software, Prototype Development এবং Post Processing-এর উপরও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। আগে এই কোর্স করার জন্য পড়ুয়াদের কলকাতা, বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ বা দেশের অন্যান্য প্রান্তে যেতে হত। কিন্তু বর্তমানে শিলিগুড়ি SIT-তেই আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি সহ প্রশিক্ষণ নিতে পারবেন পড়ুয়ারা।
কী এই থ্রি-ডি প্রিন্টিং?
অ্যাডিটিভ ম্যানুফ্যাকচারিং বা থ্রি-ডি প্রিন্টিংয়ে কম্পিউটার-নির্ভর ডিজিটাল নকশা অনুসারে একের পর এক সূক্ষ্ম স্তর যুক্ত করে ধাপে ধাপে একটি সম্পূর্ণ বস্তু তৈরি করা হয়। এই প্রযুক্তির মাধ্যমে জটিল নকশার পণ্য সহজে তৈরি করা যায়, উপকরণের অপচয় কম হয়, উৎপাদনের সময় হ্রাস পায় এবং ব্যবহারকারীর চাহিদা অনুযায়ী কাস্টমাইজড পণ্য তৈরিও সম্ভব হয়।
কেন বাড়ছে থ্রি-ডি প্রিন্টিংয়ের গুরুত্ব?
বিশ্বজুড়ে উৎপাদন শিল্প বর্তমানে মাস প্রোডাকশন থেকে শুরু করে ব্যক্তিনির্ভর কাস্টমাইজ প্রোডাকশনের ক্ষেত্রেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই ধরনের পণ্য বিপুল সংখ্যায় তৈরির বদলে, প্রত্যেক ব্যবহারকারীর প্রয়োজন অনুযায়ী আলাদা আলাদা করে তৈরি করা হচ্ছে। এখানেই অত্যন্ত কার্যকরী থ্রি-ডি প্রিন্টিং। ইতিমধ্যেই বিমান, মহাকাশ, প্রতিরক্ষা, চিকিৎসা এবং উচ্চপ্রযুক্তির উৎপাদন শিল্পে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে।
কোথায় কোথায় ব্যবহৃত হচ্ছে?
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রোগীর শারীরিক গঠন অনুযায়ী কৃত্রিম অঙ্গ, ডেন্টাল ইমপ্ল্যান্ট, অস্ত্রোপচারের মডেল, সার্জিক্যাল গাইড এবং ব্যক্তিগতকৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম তৈরিতে থ্রি-ডি প্রিন্টিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
এমনকী, মহাকাশ বিজ্ঞানের ক্ষেত্রে রকেট ইঞ্জিনের জটিল যন্ত্রাংশ এখন অনেক দ্রুত এবং নির্ভুলভাবে তৈরি করা সম্ভব হচ্ছে থ্রি-ডি প্রিন্টিংয়ের মাধ্যমে। ভারতের একাধিক মহাকাশ স্টার্টআপও উৎপাদনের সময় কমাতে এই প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
অটোমোবাইল শিল্পে গাড়ির প্রোটোটাইপ, জিগ, ফিক্সচার, টুলিং এবং হালকা ওজনের যন্ত্রাংশ তৈরিতে এই প্রযুক্তির ব্যবহার দিন দিন বাড়ছে। এছাড়াও, শিক্ষা, স্থাপত্য সহ একাধিক খাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে এই থ্রি-ডি প্রিন্টিং।
ইতিমধ্যেই, ভারতের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেন্টাল ক্রাউন, ইমপ্ল্যান্ট এবং মুখের অপারেশনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়েছে এই থ্রি-ডি প্রিন্টিং। এমনকী, ভারতীয় রেল বিভিন্ন কোচের স্পেয়ার পার্টস দ্রুত উৎপাদনের জন্য থ্রি-ডি প্রিন্টিং প্রযুক্তি ব্যবহার করছে।
মূলত, বি.টেক, পলিটেকনিক, আইটিআই, বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, ডিগ্রি কলেজের পড়ুয়া, গবেষক, উদ্যোক্তা এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত পেশাজীবীরা এই প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রে ইতিমধ্যেই শিলিগুড়ি, জলপাইগুড়ি, কোচবিহার, আলিপুরদুয়ার, দার্জিলিং, কালিম্পং ও মালদা-সহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার বহু পড়ুয়া এই কোর্স করেছেন বলে জানা গিয়েছে।