আজকাল ওয়েবডেস্কঃ পাহাড় এবং সমতলে লাগাতার বৃষ্টির জেরে উত্তরবঙ্গের বিস্তীর্ণ এলাকায় বন্যা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। গত সপ্তাহ থেকে শুরু হওয়া এই ভারী বর্ষণের সঙ্গে ভুটান পাহাড়ের বৃষ্টি যুক্ত হওয়ায় শুক্রবার সকাল থেকেই ডুয়ার্সের সঙ্কোশ, রায়ডাক, তোর্সা ও ডুডুয়ার মতো নদীগুলির জলস্তর দ্রুত বাড়ছে। পাশাপশি, জলপাইগুড়ির তিস্তা ও জলঢাকা নদীর অবস্থাও অত্যন্ত আশঙ্কাজনক। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে তিস্তা ব্যারেজ থেকে দফায় দফায় জল ছাড়ায় নদীটি ফুঁসছে। এর ফলে জাতীয় সড়ক ৩১, তিস্তার দোমহনি এবং মেখলিগঞ্জে ইতিমধ্যেই হলুদ সতর্কতা জারি করেছে প্রশাসন।
গ্রামের পাশাপাশি কোচবিহার ও অন্যান্য জেলার পুরশহরগুলিও এখন জলমগ্ন, যার ফলে ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক জনজীবন। আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি ও কোচবিহারের নদী তীরবর্তী বহু বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় হু হু করে লোকালয়ে জল ঢুকছে। বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রশাসন বহু মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিয়ে গিয়েছে।এই দুর্যোগে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে জলপাইগুড়ি জেলা। বিশেষ করে ময়নাগুড়ি ব্লকের মরিচবাড়ি ও দোমোহনি এলাকায় তিস্তার তীব্র ভাঙনে নদীপাড়ের প্রায় তিন হাজার পরিবার চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। এখানকার বাসিন্দাদের মূল জীবিকা তিস্তার চরে চাষাবাদ করা।
স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না করায় বাঁধটি দুর্বল হয়ে পড়েছিল, যা এখন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। অবিলম্বে এই ভাঙন রোধ করা না গেলে বিঘার পর বিঘা জমির ফসল নষ্ট হবে এবং হাজার হাজার কৃষক পরিবার সম্পূর্ণ নিঃস্ব হয়ে আর্থিক সংকটের মুখে পড়বে। গতকালকেই রাজ্যের রাজ্যপাল আর এন রবি উত্তরবঙ্গের শিলিগুড়িতে উত্তরকন্যায় উত্তরবঙ্গের বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে বিশেষ বৈঠকে প্রশাসনিক কর্তাদের সঙ্গে বসেন।
বিগত বছরগুলিতে যেভাবে উত্তরবঙ্গের মানুষ বন্যা কবলিত হয়েছিল তার রেশ এখনো পর্যন্ত কাটেনি। রাজ্যে নতুন সরকার আসার পর বন্যা নিয়ে বাড়তি সতর্কতা ও দ্রুততার সহিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এক ধাপ এগিয়ে। সদ্য ভেঙে যাওয়া সিকিম ও শিলিগুড়ি সংযোগকারী দুধিয়া সেতুর শুভ উদ্বোধন করা হয় ভার্চুয়ালি মুখ্যমন্ত্রীর হাত দিয়ে। সিকিমের ভয়াবহ বন্যার ছবিটা এখনো পরিষ্কার হয়নি উত্তরের বন্যা কবলিত মানুষ গুলোর কাছে। তাই এবার প্রশাসনের তরফে বর্ষা নামার আগেই নেওয়া হয়েছে একাধিক পদক্ষেপ। অন্যদিকে সিকিম গ্যাংটক দার্জিলিং যাওয়ার একমাত্র পথ ন্যাশনাল হাইওয়ে ১০ এ একাধিক জায়গায় ধ্বস নামার কারণে এনডিআরএফ-এর তরফে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে রাস্তা সংস্কারের কাজ করা হচ্ছে।
দার্জিলিং প্রশাসন সূত্রে খবর, শিলিগুড়ির কাছে সেবক ব্রিজের অদূরেই প্রবল ধসের কারণে রাস্তায় যানজট তৈরি হয়েছে। সে কারণেই পর্যটক সহ পাহাড়ি মানুষগুলোকে বিকল্প পথ ন্যাশনাল হাইওয়ে ৭১৭ ধরে যাতায়াত করার নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছে এদিকে পাহাড়ি নদী তিস্তা প্রবল জনস্মৃতি বাড়িয়ে মালবাজারের টোটগাঁও গ্রামকে পুরোপুরি জনশূন্য করে দিয়েছে। প্রশাসন তাদের পুনর্বাসন করার পরিকল্পনা নিচ্ছে।
দার্জিলিং সাংসদ তথা মন্ত্রী রাজু বিস্তা জেলা পুলিশ ও বন্যা বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনীর সঙ্গে সরজমিনে সমস্ত কিছু খতিয়ে দেখছে। অন্যদিকে বন মন্ত্রী মনোজ ওরাও বনদপ্তরকে বাড়তি নজরদারি রাখতে তৎপরতার সঙ্গে বন্যপ্রাণ রক্ষার কথা জানিয়েছেন। কারণ ডুয়ার্সের নদীগুলি মূলত জঙ্গলের ভেতর দিয়েই বয়ে চলা। বিগত দিনে বন্যার কারণে বহু বন্যপ্রাণীকে নদীর জলে ভেসে যাওয়ার ছবি ধরা পড়েছিল। পাশাপাশি ডুয়ার্সের নাগরাকাটা, বানারহাট, মালবাজার এলাকার চা বলয়ের নদী তীরবর্তী মানুষগুলিকে প্রশাসনের তরফে মাইকিং করে সতর্কতা করা হচ্ছে।
তবে আবহাওয়া দপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আজ সকাল থেকেই যেভাবে ভারী বৃষ্টি শুরু হয়েছে জেলা জুড়ে রাতভর সেই বৃষ্টি অবিরাম চলতে থাকলে উত্তরবঙ্গ যে আবারো ভয়াবহ বিপদের সামনে তাকেবলমাত্র সময়ের অপেক্ষা।