• প্রাক্তন ডিসি সেন্ট্রালের গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে গুলি, পাল্টা হাঁকে পুলিশও, শেষমেশ যা হলো...
    এই সময় | ১১ জুলাই ২০২৬
  • প্রায় ২৭ বছর আগের কথা। ১৯৯৯ সাল। কলকাতা শহরে একের পর এক ব্যবসায়ী অপহরণে জেরবার জ্যোতি বসুর সরকার। তার শেষতম সংযোজন এক্সাইড সংস্থার এক কর্তার অপহরণ।

    দক্ষিণ কলকাতায় বসে গ্যাংস্টার শেখ শাহজাদা অপারেশন চালাচ্ছিল। নাস্তানাবুদ করছিল পুলিশকে। তারই শাগরেদ ছিল শেখ দীনেশ। বিভিন্ন গ্যাংয়ের মধ্যেও চলছিল লড়াই। কলকাতা কার্যত দুষ্কৃতীদের মুক্তাঞ্চল হয়ে উঠেছিল। সেই রকম এক সময়ে শাহজাদার রাইভাল গ্রুপ খবর পাঠায়: দীনেশ কোনও এক ব্যবসায়ীর কাছ থেকে ‘তোলা’ তুলতে ইডেন গার্ডেন্স এলাকায় আসছে।

    আইপিএস রাজ কানোজিয়া এখন অবসর নিয়েছেন। যে সময়ের কথা হচ্ছে, তখন তিনি কলকাতার সেন্ট্রাল ডিভিশনের দায়িত্বে থাকা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার। প্রতিবেদক ফোন করতেই ও পার থেকে বলে ওঠেন, ‘এতদিন আগের কথা। যতদূর মনে আছে, সে দিন ইডেনে খেলা ছিল। আমি ইডেনের দিকেই ছিলাম। আমাদের একটা টিম ছিল প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে। সন্ধেবেলা। দীনেশের টিপ-অফ পেয়ে আমরা অপেক্ষা করছিলাম।’

    স্মৃতি হাতড়ে তুলে আনলেন রাজ—দীনেশের গাড়ি কলকাতা হাইকোর্টের দিক থেকে মোড় ঘুরে ইডেনের দিকে আসতেই দেখতে পায় পুলিশকে। বুঝে যায়, সামনে বিপদ। পালাতে যায় প্রিন্সেপ ঘাটের দিকে। ও দিক থেকেও এগিয়ে আসে পুলিশের টিম। দু’পক্ষের মাঝে পড়ে ফেঁসে যায় দীনেশ। গাড়ি থেকে গুলি চালাতে শুরু করে। রাজ বলছেন, ‘আমার গাড়ির উইন্ডস্ক্রিনে গুলি লাগে। আমরা পাল্টা গুলি চালাই। বাকিরা পালাতে পারলেও দীনেশ গুলি খেয়ে পড়ে যায়। হাসপাতালের পথে মারা যায় সে।’ সে বছরেই কলকাতা দাপিয়ে বেড়ানো আর এক গ্যাংস্টার—চিকনা অনিল—দক্ষিণ কলকাতায় এক এনকাউন্টারে মারা যায়।

    তখন অশান্ত কলকাতা। যখন–তখন ব্যবসায়ীদের তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। আটকাতে গেলে চলছে গুলি। বড় অঙ্কের মুক্তিপণ নিয়ে তবেই ছাড়া হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। মুক্তিপণ দিতে না চাইলে মিলছে লাশ। শহরে সন্ধে নামলেই ঝাঁপ বন্ধ করে দিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। আতঙ্কে ঘুম ছুটেছে তাঁদের। বেশিরভাগ সময়ে মোবাইল বন্ধ রাখছেন। অন্য সময়ে অচেনা নম্বর থেকে ফোন এলে তা ধরছেন না। তাতেও অবশ্য রেহাই মিলছে না। তুলে নিয়ে গেলে জানতেও পারছিল না পুলিশ। চুপিচুপি মুক্তিপণ দিয়ে ছাড়িয়ে আনা হচ্ছিল ব্যবসায়ীদের। পুলিশকে জানালে বেড়ে যাচ্ছিল মৃত্যুর আশঙ্কা। তাতে আরও বেলাগাম হয়ে উঠেছিল চিকনা রাজু, চিকনা অনিল, শেখ বিনোদ, শেখ দীনেশ, শেখ শাহজাদা, সোনা, গব্বররা।

    ১৯৯৬–৯৯... ওই সময়কালে কলকাতা কলেবরে বেড়ে উঠছিল। শহর ছেড়ে উপান্তে সরে যাচ্ছিল মানুষ। শহরতলিতে শুরু হয়েছিল প্রোমোটিং। আর তাকে ঘিরেই শুরু হয় বেলাগাম তোলাবাজি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে ছিল স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার মদত। তখনই শুরু হয়েছিল শর্ত দেওয়া, বাড়ি তৈরি করতে গেলে মালপত্র নিতে হবে তোলাবাজদের কাছ থেকে। এতেই ক্ষান্ত হয় না তারা। শুরু হয় অপহরণ। অস্ত্র দেখিয়ে যখন-তখন তুলে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল ছোট-মাঝারি-বড় ব্যবসায়ীদের। বড় সংস্থার কর্তা-ব্যক্তিদেরও। অনেক সময়ে মুক্তিপণের টাকা হাওয়ালা মারফত বাইরে পাঠানো হচ্ছিল। দুষ্কৃতীদের এমন খোলামেলা ময়দান দেখে প্রতিবেশী বিহার থেকেও আসতে শুরু করে দুষ্কৃতীরা। তারাও শুরু করে অপহরণ।

    অনেক ক্ষেত্রে দীনেশরা নিজেদের এলাকা ভাগ করে নিয়েছিল। অনেক সময়ে আবার এলাকা দখলের লড়াইয়ে অবিশ্রান্ত গুলি-বোমা চলত শহরে। একটা টার্গেট ছিল টালিগঞ্জ এবং তা ছাড়িয়ে গজিয়ে ওঠা আবাসন এলাকা। একই কারণে কসবা ছিল অন্যতম টার্গেট। রিজেন্ট পার্ক, চারু মার্কেট, যাদবপুরের এক বিস্তীর্ণ এলাকা হয়ে উঠেছিল দুষ্কৃতীদের স্বর্গরাজ্য। এ ছাড়াও বড়বাজার-পোস্তা এলাকায় ত্রাসের সৃষ্টি করেছিল তারা।

    রাজ জানিয়েছেন, এক সময়ে পরিস্থিতি এতটাই হাতের বাইরে চলে যায় যে, পুলিশ ডিপার্টমেন্ট থেকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, এ বার কিছু একটা করতেই হবে। পরিস্থিতি সামলাতে পুলিশ হেঁটে টহল দিতে শুরু করল। রাতবিরেতে সিনিয়র অফিসারেরা এলাকায় ঘুরতে শুরু করেন। টার্গেটেড রেড শুরু হয়। সোর্স নেটওয়ার্ককে আরও শক্তিশালী করা হয়। কয়েক জন দুষ্কৃতীর পিছনে রাজনৈতিক মদত থাকলেও, তখন পুলিশের কাজ করার স্বাধীনতা বেশি ছিল। তাই, পাল্টা অ্যাকশন নিতে সমস্যা হয়নি। দীনেশ ও চিকনা অনিলের এনকাউন্টার তারই ফলশ্রুতি।

    তবে ভিন্ন মতও উঠে আসছে। পুলিশকর্তাদের একটি অংশের মতে, মামলার বুনিয়াদ শক্ত করে, আইনি পথে শাস্তি দিলে সমাজে তার প্রভাব অনেক বেশি। তাঁদের মতে, এ ভাবে পুলিশকে ‘ট্রিগার হ্যাপি’ করে দিলে তার সুদূরপ্রসারি কু-ফল মারাত্মক হতে পারে। উদাহরণ দিয়ে নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক এক পুলিশকর্তা বলেন, ওই ৯০-এর শেষের দিকে যখন একের পর এক এক এনকাউন্টার চলছে, তখন জেলার এক পুলিশ অফিসার টাকার বিনিময়ে এক ব্যবসায়ীর এনকাউন্টার করে দেন। তার ফল গোটা পুলিশ বিভাগকে ভুগতে হয়েছিল।

    তবে ১৯৯৯–র পরে ধীরে ধীরে শান্ত হতে শুরু করে শহর। রাজ কানোজিয়ার পরে ডিসি সাউথ হিসেবে আসেন জুলফিকার হাসান। তখন পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সোনা এবং গব্বর। দু’জনেরই সাজা ঘোষণা হয়।

  • Link to this news (এই সময়)