• কল্পনায় উড়ান দিতে পথচলা শুরু ইমাজিনেশন ল্যাবের, নয়া উদ্যোগ IIT খড়্গপুরের
    এই সময় | ১১ জুলাই ২০২৬
  • জয় সাহা

    একটা সময় ছিল, যখন হাজার মাইল দূরে থাকা কোনও মানুষের সঙ্গে কথা বলার কথা কেউ ভাবতেও পারত না। কিন্তু আলেকজান্ডার গ্রাহাম বেলের কল্পনায় জন্ম নিয়েছিল টেলিফোন। আকাশে পাখির মতো ওড়ার স্বপ্ন মানুষের কাছে নেহাতই পাগলামি ছিল, তবে রাইট ভ্রাতৃদ্বয়ের অদম্য কল্পনাশক্তিতে ভর করেই আজ এরোপ্লেন যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আবার মাইকেল ফ্যারাডে বা টমাস আলভা এডিসনের কল্পনার বৈদ্যুতিক শক্তির ভাবনাকেও তৎকালীন সময়ে মানুষ হেয় চোখে দেখেছিল। অথচ তাঁদের সেই কল্পনাই বদলে দিয়েছিল পুরো পৃথিবীর গতিকে। যে কোনও যুগান্তকারী আবিষ্কারের শুরুটা কোনও চার দেওয়ালের ল্যাবরেটরিতে হয় না, বরং তার জন্ম হয় মানুষের অসীম কল্পনায়।

    এই অমোঘ সত্যকে পাথেয় করেই দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান আইআইটি খড়্গপুরে পথচলা শুরু করল এক সম্পূর্ণ অভিনব উদ্যোগ—‘ইমাজিনেশন ল্যাব’ বা ‘আই-ল্যাব’। প্রখ্যাত চিন্তাবিদ এবং এই প্রতিষ্ঠানের বিশিষ্ট প্রাক্তনী পার্থ ঘোষের অনুদানে গড়ে ওঠা এই গবেষণাগার প্রথাগত সংজ্ঞার চেয়ে একেবারেই আলাদা। সাধারণ ল্যাবরেটরি যেখানে কোনও প্রতিষ্ঠিত ধারণার বৈজ্ঞানিক সত্যতা যাচাই করে, সেখানে এই ইমাজিনেশন ল্যাব তৈরি করবে সেই সমস্ত নিত্যনতুন ধারণা, যা আগামী দিনের গবেষণাগারগুলি যাচাই করবে। উড়োজাহাজ আবিষ্কারের কয়েক শতাব্দী আগেই লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চি যেমন মানুষের ওড়ার যন্ত্রের কল্পনা করেছিলেন, কিংবা ভারতের মহাকাশ গবেষণার শুরুটা যেমন রকেট দিয়ে হয়নি, হয়েছিল বিজ্ঞানীদের এক আকাশছোঁয়া কল্পনা দিয়ে— এই ল্যাব সেই কল্পনাশক্তিরই বিকাশ ঘটাবে। অর্থাৎ আজ যা অবাস্তব, কল্পনা, কে বলতে পারে এই ল্যাবের সূতিকাগারে সেই কল্পনাই হয়তো একদিন হবে বাস্তব।

    প্রতিষ্ঠানের অধিকর্তা সুমন চক্রবর্তী বলেন, ‘বর্তমান যুগে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-এর অভাবনীয় উন্নতির ফলে তথ্যের অভাব নেই। জ্ঞান আজ বিশ্বজুড়ে বিকেন্দ্রীভূত। কিন্তু যা ক্রমশ বিরল হয়ে উঠছে, তা হলো— যা এখনও অস্তিত্বহীন, তাকে নিখুঁতভাবে কল্পনা করার ক্ষমতা। এই শূন্যস্থান পূরণের লক্ষ্যেই ইমাজিনেশন ল্যাবের জন্ম।’ তিনি জানাচ্ছেন, এটি নিছক কোনও ‘মেকারস্পেস’, ‘এআই ল্যাব’ বা ‘ডিজ়াইন স্টুডিয়ো’ নয়। এটি এমন একটি সুশৃঙ্খল ইকোসিস্টেম, যেখানে ‘কল্পনা’ নিজেই একটি প্রাতিষ্ঠানিক বিষয়ে পরিণত হবে। ছাত্রছাত্রী, গবেষক, অধ্যাপকদের কল্পনাকে বাস্তবায়িত করতে এই ল্যাবকে সাহায্য করবেন আইআইটির সমস্ত বিভাগের এক্সপার্টরা।

    ল্যাবটি একটি ‘হাব-অ্যান্ড-স্পোক’ মডেলে কাজ করবে। ভবিষ্যৎ পৃথিবীর জলবায়ু পরিবর্তন, ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য পরিষেবা বা পরিবেশবান্ধব শহরের মতো জটিল সমস্যাগুলি সমাধানে শুধু একটি বিভাগের জ্ঞান যথেষ্ট নয়। তাই এখানে ইঞ্জিনিয়ারিং, আর্কিটেকচার, জীববিজ্ঞান, অর্থনীতি ও মানববিদ্যার এক অভূতপূর্ব মেলবন্ধন ঘটবে।

    ল্যাবটিতে ‘মেটাভার্স’ এবং ‘এআর-ভিআর’ প্রযুক্তির সাহায্যে পড়ুয়ারা কোনও হাসপাতাল বা কারখানা বাস্তবের মাটিতে তৈরি হওয়ার আগেই তার ভেতরে হেঁটে অভিজ্ঞতার সঞ্চয় করতে পারবেন। থাকবে ‘প্যারামেট্রিক ডিজাইন স্টুডিয়ো’, ‘কগনিটিভ মিরর’ এবং ‘জিওস্পেশিয়াল আর্থ সিস্টেম ল্যাবরেটরি’-র মতো অত্যাধুনিক সুবিধা, যা সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরিবেশকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে যাচাই করতে সাহায্য করবে।

    এই ল্যাবের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য হলো, এটি আধুনিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির সঙ্গে প্রাচীন ভারতীয় দর্শন ও কল্পনাশক্তির ঐতিহ্যকে মিলিয়ে দেবে। প্রাচীন ভারতের গণিত বা চিকিৎসাবিজ্ঞানের মূলেও ছিল এই সুশৃঙ্খল কল্পনাশক্তি। এখানকার পড়ুয়ারা শুধু ‘প্রজেক্ট’ জমা দেবেন না, বরং তারা শিখবেন এমন সব প্রশ্ন করতে, যা আগে কেউ কখনও ভাবেননি। ল্যাব উদ্বোধন করে অধিকর্তার আশা, আগামী ৫০ বছরে পৃথিবী কোন কোন সমস্যা নিয়ে কাজ করবে, তা নির্ধারণ করার পথপ্রদর্শক হয়ে উঠবে এই ল্যাব। একটি নতুন সংস্কৃতির সূচনা করে এই ইমাজিনেশন ল্যাব আগামী প্রজন্মকে নির্ভীক ভাবে কল্পনা করতে এবং সমাজকে রূপান্তরিত করতে অনুপ্রাণিত করবে বলেও মনে করা হচ্ছে।

  • Link to this news (এই সময়)