স্তন ক্যান্সারের জীবনদায়ী ওষুধ রিবোসিক্লিব (Ribociclib) পাওয়ার দাবিতে কেরালা হাইকোর্টে মামলা দায়ের হয়েছিল ২০২২ সালের জুন মাসে। ২০২৩ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে চূড়ান্ত শুনানির (Final Hearing) জন্য ওই মামলা ৫৭ বার আদালতে তালিকাভুক্ত হলেও, এখনও পর্যন্ত তার কোনও শুনানিই হয়নি।
দেশের বিচার ব্যবস্থার শম্বুক গতি নিয়ে গত অর্ধ শতাব্দী ধরে কম বিতর্ক হয়নি। কী ভাবে বিচার প্রক্রিয়ায় গতি আনা যায়, তা নিয়ে সুপ্রিম কোর্ট, বিভিন্ন হাইকোর্ট নানা সময়ে একাধিক পরিকল্পনা নিয়েছে। কিন্তু তাতেও কাজের কাজ হয়নি বলে অভিযোগ আইনজীবীদের একাংশের। কেরালা হাইকোর্টের ওই মামলার শুনানি এখনও না হওয়ায় আইনজীবীদের এ হেন অভিযোগ আরও গুরুতর হয়ে উঠেছে। গুরুতর এই কারণে যে, ক্যান্সার আক্রান্ত যে মহিলার জন্য মামলাটি দায়ের হয়েছিল, তিনি মামলার প্রাথমিক পর্যায়েই মারা যান।
সূত্রের খবর, মামলাটি দিয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে মৃত মহিলার আইনজীবীরা, ক্যান্সার আক্রান্ত অন্য রোগীরা, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এবং শিক্ষাবিদরা সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে সম্প্রতি একটি চিঠি দিয়েছেন। দেশের প্রধান বিচারপতির কাছে তাঁদের আবেদন, তিনি যেন বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে মামলাটির দ্রুত শুনানির ব্যবস্থা করতে হস্তক্ষেপ করেন। প্রসঙ্গত, স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে মহিলা মারা যাওয়ায় কেরালা হাইকোর্ট বৃহত্তর স্বার্থে স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলাটি চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখনও তার শুনানি শুরুই হয়নি।
ভারতে মহিলাদের মধ্যে স্তন ক্যান্সার বাড়ছে। গ্লোবাল ক্যান্সার অবজারভেটরির ২০২২ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভারতে ১.৯ লক্ষেরও বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছে এবং ৯৮,৩০০ জনের মৃত্যু হয়েছে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির শুরুতে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রকের পক্ষ থেকে সংসদে পেশ করা সরকারি তথ্যে আনুমানিক ২.৪ লক্ষ রোগীর কথা বলা হয়েছে। এদের মধ্যে লুমিনাল এ (HR+/HER2-) স্তন ক্যান্সারে আক্রান্ত রোগীদের জীবন বাঁচাতে রিবোসিক্লিব এবং অ্যাবেমাসিক্লিবের মতো 'টার্গেটেড' ওষুধের প্রয়োজন হয়। এই ক্যান্সার এক ধরনের ইনভেসিভ সাবটাইপ, যা শরীরের অন্যান্য অংশে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতিকে লেখা চিঠিতে বলা হয়েছে, এই সব ওষুধ HR+HER2- রোগীদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এগুলো দিয়ে প্রাথমিক পর্যায়েই রোগীদের চিকিৎসা করা যায়। তবে, এই ওষুধগুলো পেটেন্ট সুরক্ষার অধীনে থাকায় এগুলোর দাম আকাশছোঁয়া (রাইবোসিক্লিবের দাম প্রতি মাসে ৭৮,৪০০ টাকার বেশি এবং অ্যাবেমাসিক্লিবের দাম প্রতি মাসে ৪৭,৭০০ থেকে ৯৫,৫০০ টাকা)।
সূত্রের খবর, মূল মামলার আবেদনে পেটেন্ট আইনের ১০০ ধারার অধীনে একটি সরকারি ব্যবহারের লাইসেন্স চাওয়া হয়েছিল, যা কম দামে রিবোসিক্লিব পাওয়ার সুযোগ করে দিত। একটি সরকারি ব্যবহারের লাইসেন্স স্থানীয়ভাবে এবং কম দামে ওষুধটির জেনেরিক সংস্করণ উৎপাদনের সুবিধা দেয়। প্রায়শই, জেনেরিক সংস্করণগুলোর দাম মূল ওষুধের চেয়ে ৯০%-৯৫% সস্তা হয়। সরকার ওষুধটির কার্যকারিতা স্বীকার করলেও স্তন ক্যান্সারকে জাতীয় জরুরি বিষয় নয় বলে সরকারি ব্যবহারের লাইসেন্স দিতে অস্বীকার করেছে বলে চিঠিতে দাবি করা হয়েছে। চিঠিতে আরও বলা হয়েছে যে, জীবন রক্ষাকারী ওষুধের সহজলভ্যতা এবং সংবিধানে স্বাস্থ্য সম্পর্কিত মৌলিক অধিকার নিয়ে সরকার কোনও যুক্তিযুক্ত জবাব দেয়নি।
সূত্রের খবর, স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে মামলা চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরে কেরালা হাইকোর্ট একজন অ্যামিকাস কিউরি (আদালতবান্ধব) নিযুক্ত করে এবং ভারত সরকার-সহ বিভিন্ন পক্ষকে বিস্তারিত বক্তব্য জানাতে বলে।
ওষুধ প্রস্তুতকারক সংস্থাগুলিকে মামলায় যুক্ত করা হয় এবং তারাও তাদের বক্তব্য পেশ করেছে। চিঠিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, মামলার সঙ্গে সম্পর্কিত সব পক্ষের বক্তব্য শোনা হয়েছে। প্রধান বিচারপতিকে লেখা চিঠিতে এও বলা হয়েছে, সংবিধানের ২১ নং অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সরকারের বাধ্যবাধকতা সংক্রান্ত সাংবিধানিক প্রশ্নগুলো অমীমাংসিতই রয়ে গেছে।
চিঠির শেষ পর্বে বলা হয়েছে, মামলার দ্রুত ফয়সালা এই মারাত্মক রোগে আক্রান্ত অন্যদের মনে আশা জাগাবে, যাঁদের আদালতে যাওয়ার আদৌ সামর্থ্য নেই।