শনিবার ডানকুনিতে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বলেন, 'ভূমি পুজো ও শিলান্যাসে আপনারা অংশ নিয়েছেন, আপনাদের ধন্যবাদ। বাংলায় থাকা শিল্পপতিরা শুধু নন, বিশ্বের শিল্পপতিরা আসবেন। স্বপ্ন দেখিয়েছেন শমীকদা। আমি বাস্তবায়নের চেষ্টা করব। ডবল ইঞ্জিন সরকারের সুফল পেতে শুরু করেছেন আপনারা।'
এরপরই তিনি বলেন, 'গুজরাট, মহারাষ্ট্র, অসম আজকে পুরো পরিবেশ বদলে দেওয়ার কাজ করছে। এই রাজ্যে তিনটে ক্ষেত্র বেহাল হয়ে আছে, হাল ফেরাতে হবে। আইনশৃঙ্খলা, দাদাগিরি, কাটমানি, এর থেকে বেরিয়েছি অনেক। ডানকুনির ট্রাকে কেউ হাত পাতে না। এই কোম্পানিতে মাসো হারা টাকা চাইছে না।'
মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্য, 'এই রাজ্য রেভিনিউতে প্লাস ছিল। ভাল অর্থনীতি ছিল। গুজরাটের থেকেও। বর্তমানে যে ঋণের বোঝা, তারমধ্যে ১ লক্ষ কোটি টাকা ঋণের সুদ দিতে চলে যাচ্ছে। এটা থাকলে অনেক কিছু করতে পারতাম। এই জায়গা থেকে বেরিয়ে আসতে গেলে নিজস্ব রেভিনিউ বাড়াতে হবে। বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। এখানে ১ হাজার কোটি রেভিনিউ আর্নিং বাড়বে। চারিদিকে কাজ চাই। ২ কোটির বেশি শিক্ষিত বেকার। ১ কোটি ছুঁই ছুঁই পরিযায়ী শ্রমিক।'
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, 'আশা বেড়েছে। ভরসা বেড়েছে। আগে স্নাতকে যে ভর্তি হয়েছিল তার থেকে বেশি। অবাক হয়েছি হাজার হাজার ছাত্রছাত্রী বেশি ভর্তি হয়েছে। ভরসা পাচ্ছেন অভিভাবকরা। এই সরকার চাকরি দিতে চায়। সব সরকারি চাকরি দেওয়া সম্ভব না। ডাইরেক্ট ও ইনডাইরেক্ট এমলয়মেন্ট দিতে হবে। অনেকে ব্যবসা করতে চায়। তাই তাদের লোন দেওয়ার ব্যবস্থা ও করেছি। সব লোন অল্প ইন্টারেস্টে লোন দিয়ে গুড বিসনেস ম্যান তৈরি করব।'
তিনি এদিন আরও জানিয়েছেন, 'ল্যান্ড কোন সমস্যা হবে না। আমরা ডাইরেক্ট ল্যান্ড কিনে আপনাদের হাতে হস্তান্তর করব। ১০০ কোটির বেশি টাকা ইনভেস্ট করলে কোন পুরসভা, পঞ্চায়েত থেকে পারমিশন নিতে হবে না। যত গণ্ডগোল ওখানে। সিঙ্গেল উইন্ডো সিস্টেমে লাইসেন্স পাবেন। এনওসি পাবেন। বাংলায় আবহাওয়া বদলে গেছে। ১৭ তারিখ মেজিয়াতে শ্যাম স্টিলের শিলান্যাস হবে। আমূল কোম্পানির শিলান্যাস হবে। অমিত শাহ আসছেন আমূলের শিলান্যাস অনুষ্ঠানে। দুর্গাপুরে একটা স্টিল কারখানার সম্প্রসারণের শিলান্যাস হবে আগস্টে।'
এদিনের অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী আরও জানিয়েছেন, 'নতুন এয়ারপোর্ট হচ্ছে কল্যাণীতে। বালুরঘাট, পুরুলিয়ায় নতুন এয়ারপোর্ট। নতুন সি পোর্ট হচ্ছে। বাংলায় বিকাশ। আরও কাজ হবে।'
এদিনের অনুষ্ঠানে শিল্পমন্ত্রী তাপস রায় বলেন, 'পশ্চিমবঙ্গের শিল্পোন্নয়নের ক্ষেত্রে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।' তাঁর দাবি, শিল্পের মুকুটে নতুন পালক যুক্ত হওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী তাঁকে জানিয়েছেন, পুজোর আগেই আরও পাঁচটি বড় শিল্প প্রকল্পের সূচনা হবে।
মন্ত্রী জানান, তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় স্টার্ট-আপ ও শিল্পোন্নয়নের দায়িত্বও পান। তাঁর অভিযোগ, আগের সরকার শিল্পের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি বলেই রাজ্যে শিল্পে দীর্ঘদিন স্থবিরতা তৈরি হয়েছে।
তাপস রায়ের কথায়, রাজ্যে শিল্প ও কর্মসংস্থান বাড়লে পরিযায়ী শ্রমিকদের অন্য রাজ্যে যেতে হবে না। লাক্স গ্রুপের ৬০০ কোটি টাকার বিনিয়োগে প্রায় ৯ হাজার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। এছাড়া চলতি মাসেই আরও দুটি শিল্প প্রকল্পের ঘোষণা হবে এবং দুর্গাপুজোর আগেই মোট আরও পাঁচটি প্রকল্পের কাজ শুরু হবে বলে তিনি জানান।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানান, লাক্স কোজি কর্তৃপক্ষ তাঁর সঙ্গে দেখা করে জানিয়েছিলেন, একসময় তাঁরা পশ্চিমবঙ্গে আর ব্যবসা সম্প্রসারণের কথা ভাবেননি। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বড় উৎপাদন কেন্দ্র গড়ার পরিকল্পনার কথা জানালে তিনি তাঁদের শিল্পমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করার পরামর্শ দেন।
তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন রাজ্যে প্রকৃত অর্থে শিল্পবান্ধব সরকার ছিল না বলেই শিল্পপতিরা প্রথমে সরকারের বদলে রাজনৈতিক নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। তাঁর কথায়, শুভেন্দু অধিকারীর নেতৃত্বে এমন একটি সরকার গড়ে উঠেছে, যা শিল্পায়নকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিচ্ছে।
শমীক ভট্টাচার্যের দাবি, পশ্চিমবঙ্গে নতুন খনিজ সম্পদ ও পেট্রোলিয়াম সম্ভাবনার সন্ধান মিলছে। বন্ধ জুটমিলগুলিও ধীরে ধীরে খুলছে এবং আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল-সহ একাধিক ক্ষেত্রে বিনিয়োগের আগ্রহ বাড়ছে। যেসব শিল্পগোষ্ঠী অতীতে রাজ্য ছেড়ে চলে গিয়েছিল, তাদেরও ফিরে এসে বিনিয়োগ করার আহ্বান জানান তিনি। তাঁর বক্তব্য, আদিত্য বিড়লা গোষ্ঠী অতীতে রাজ্য ছেড়ে গেলেও কুমার মঙ্গলম বিড়লার নেতৃত্বে তারা আবার ফিরতে পারে। তবে শিল্পের পাশাপাশি শ্রমিকদের স্বার্থও সুরক্ষিত রাখতে হবে।
তিনি আরও বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের মানুষ শিল্পায়নের পরিবর্তিত চিত্র দেখতে পাবেন। অতীতের রাজনৈতিক স্লোগানের বদলে বাস্তব উন্নয়নই হবে সরকারের লক্ষ্য। তিনি শিল্পমন্ত্রীকে সিঙ্গুরে সেমি ও ইমিটেশন জুয়েলারি পার্ক গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়ার আবেদন জানান।
শমীক ভট্টাচার্য বলেন, এই মুহূর্তে বাংলায় ব্যাপক বিনিয়োগের প্রয়োজন। তাঁর মতে, যাঁরা বাড়িতে মারোয়াড়ি বা রাজস্থানি ভাষায় কথা বলেন, তাঁরাও বাংলার মানুষ এবং ভারতীয়। অতীতের রাজনৈতিক বিভাজন ভুলে শিল্পোন্নয়নের স্বার্থে সবাইকে একসঙ্গে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
তাঁর বক্তব্য, বর্তমানে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করা বহু তরুণ মাত্র ২২ হাজার টাকার চাকরি করতে বাধ্য হচ্ছেন, সেই পরিস্থিতির পরিবর্তন দরকার। তিনি দাবি করেন, ভবিষ্যতে টাটা, বাটা, রিলায়েন্স, আদানি-সহ দেশ-বিদেশের বহু শিল্পগোষ্ঠী পশ্চিমবঙ্গে বিনিয়োগ করবে। মহারাষ্ট্র ও গুজরাটের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যেতে রাজ্য সরকার নতুন শিল্পনীতি ও বিনিয়োগে উৎসাহমূলক (ইনসেনটিভ) নীতির উপর কাজ করছে বলেও জানান তিনি।