আজকাল ওয়েবডেস্ক: একজন স্বপ্ন দেখেন, আর সেই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে দশ জন মরিয়া হয়ে লড়ে যান। এই দলটার নাম আর্জেন্টিনা।
এখানে একজন লিওনেল মেসি আর তাঁর পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বাকি দশ জন অটল বিশ্বাস, নিঃস্বার্থ ত্যাগ আর অবিচল প্রতিশ্রুতির প্রতীক। তাই বারবার মনে হয়, মেসি আর ওরা দশজন, এই নিয়েই আর্জেন্টিনা।
কানসাস সিটিতে সুইস গেট ভাঙতে রীতিমতো ঘাম ঝরাতে হল নীল-সাদা জার্সিধারীদের। সমর্থকদের টেনশন বাড়িয়ে লিওনেল মেসির দল সেমিফাইনালের টিকিট জোগাড় করল। শেষ চারে আর্জেন্টিনার সামনে এবার ইংল্যান্ড।
এক্সট্রা টাইমে প্রথমে আলভারেজ রামধনুর মতো বাঁক খাওয়ানো শটে গোল করে ২-১ করেন। ধারাভাষ্যকাররা বলে উঠলেন,''এই হল চ্যাম্পিয়ন দলের কোয়ালিটি।'' যে কোনও মুহূর্তে ম্যাচের রং বদলে দিতে পারে তারা। আলভারেজের গোলের পর লাওতারো মার্টিনেজ ৩-১ করে যান। যখন মনে হবে রাস্তা কঠিন হচ্ছে, ঠিক তখনই আর্জেন্টিনা ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প লেখে। একবার নয়, বারবার।
কেপ ভার্দে থেকে মিশর, তারপর সুইসদের চ্যালেঞ্জ, প্রতিটি বাধা অতিক্রম করে এগিয়ে চলেছে আর্জেন্টিনা। কঠিন পথই যেন তাদের জয়ের গল্পকে আরও স্পেশাল করে তুলছে। যতই নিন্দুকরা বলুন না কেন, অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে ম্যাচ জিতে শেষ চারে পৌঁছেছে লিওনেল স্কালোনির দল। আর্জেন্টিনা কিন্তু আছে আর্জেন্টিনাতেই। লক্ষ্যে অবিচল মেসির দল।
কোয়ার্টার ফাইনালের বাঁশি বাজার আগেই আবেগে ভারী হয়ে ওঠে কানসাস সিটির আকাশবাতাস। আর্জেন্টিনার প্রতিটি ফুটবলারের হাতে ছিল কালো আর্মব্যান্ড। সদ্যপ্রয়াত কিংবদন্তি মিডফিল্ডার আন্তোনিও রাতিনের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রদর্শন করেন মেসিরা।
রাতিন ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালের বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার হয়ে খেলেছিলেন। ১৯৬৬-র বিশ্বকাপে ইংল্যান্ডের বিরুদ্ধে তাঁর বিতর্কিত বহিষ্কারই ফুটবলে বড় এক পরিবর্তন করে। সেই ঘটনার পর ১৯৭০ বিশ্বকাপ থেকে লাল ও হলুদ কার্ড চালুর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
এক মিনিটের নীরবতায় দক্ষিণ আফ্রিকার প্রয়াত বিশ্বকাপার জেডেন অ্যাডামসকেও শ্রদ্ধা জানায় দুই দল। প্রতিদ্বন্দ্বিতার আগে মানবিকতার এই মুহূর্তই ফুটবলের আসল সৌন্দর্য।
ম্যাচের ১০ মিনিটে জাদুকরী ছোঁয়া দেখান লিওনেল মেসি। তাঁর নিখুঁত কর্নার থেকে ভেসে আসা বল দুর্দান্ত হেডে জালে জড়ান অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার। শুরুতেই গোল করে এগিয়ে যায় আর্জেন্টিনা।
তবে সহজে হার মানেনি সুইজারল্যান্ডও। একের পর এক আক্রমণে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগকে চাপে রাখে তারা। দ্বিতীয়ার্ধের ৫০ মিনিটে দারুণ সুযোগ তৈরি করেছিল সুইজারল্যান্ড। কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তে লিসান্দ্রো মার্টিনেজের অসাধারণ রক্ষণ এবং এমিলিয়ানো মার্টিনেজের দুর্দান্ত সেভ আর্জেন্টিনাকে বড় বিপদ থেকে রক্ষা করে। তবে বেশিক্ষণ গোল ধরে রাখতে পারেনি আর্জেন্টিনা।
নীল-সাদার রক্ষণ ভেঙে ম্যাচের ৬৭ মিনিটে সমতা ফেরায় সুইজারল্যান্ড। রিকার্দো রদ্রিগেজের নিখুঁত পাস ধরে বল জালে জড়ান ড্যান এনদোয়ে। তাঁর দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ১-১ সমতায় ফেরে সুইসরা।
৭২ মিনিটে প্লে-অ্যাক্টিংয়ের অভিযোগে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড (লাল কার্ড) দেখে মাঠ ছাড়তে হয় ব্রিল এমবোলোকে।
বাকি সময় নিউমেরিক্যাল অ্যাডভান্টেজ কাজে লাগাতে পারেনি আর্জেন্টিনা। নির্ধারিত সময়ের খেলা শেষের দিকে মেসি বক্সের বাইরে থেকে ডান পায়ে শট নেন। তা অল্পের জন্য লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়। এক্সট্রা টাইমে আর্জেন্টিনা বুঝিয়ে দেয় কেন তারা বিশ্বচ্যাম্পিয়ন। আলভারেজ, মার্রটিনেজ গোল করে মেসির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখেন।
আর্জেন্টিনা পৌঁছে গেল বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে। কিংবদন্তি রাতিনের স্মৃতিকে সম্মান জানিয়ে শুরু হওয়া রাত শেষ হয় জয়ের উল্লাসে।
এই দলে একজনের স্বপ্ন সত্যি করার মরিয়া চেষ্টা করে পুরো দল। মেসি আর ওরা দশ জন, এই নিয়েই আর্জেন্টিনা। একজন স্বপ্ন দেখেন, আর বাকি দশজন সেই স্বপ্নকে ইতিহাসে পরিণত করার লড়াই চালিয়ে যান। গোটা বিশ্বকাপ জুড়েই সেই দৃশ্য দেখা যাচ্ছে।