• মাঠে ৬৪ শতাংশ সময়ে শুধুই হাঁটছেন মেসি
    এই সময় | ১২ জুলাই ২০২৬
  • সব্যসাচী সরকার, মায়ামি

    যেন মায়ামির সমুদ্রসৈকতে মর্নিং ওয়াকে বেরিয়েছেন! বড় আশ্চর্য আর অলস সেই পদচারণা, যার সঙ্গে মিশে আছে উদাসীনতা। মাঝে মাঝে হাল্কা পায়ে ওয়ার্ম আপের ঢঙে একটু দৌড়।

    এককথায়, এই হলেন এ বারের বিশ্বকাপে ‘অফ দ্য বল’ লিওনেল মেসি, আর্জন্তিনার পাঁচ ম্যাচে ৮ গোল করে সোনার বুটের দৌড়ে কিলিয়ান এমবাপের সঙ্গে যুগ্ম ভাবে শীর্ষে। তফাত বলতে এমবাপের তিনটে অ্যাসিস্ট, মেসির একটা। কাতার বিশ্বকাপ থেকে দেখলে মাঠে বেশির ভাগ সময়েই হেঁটে বেড়াতে দেখা যায় মেসিকে। সেটাই যেন রুটিন। শুধু পায়ে বল পড়লেই ম্যাজিক!

    ফিফার ডেটা বলছে, এই বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত মাঠে মোট ৩৫.৮৭১ কিলোমিটার দূরত্ব কভার করেছেন মেসি। তার মধ্যে ২২.৯৬০ কিলোমিটার তাঁর গতি ছিল ঘণ্টায় ০ থেকে ৭ কিলোমিটারের মধ্যে। অর্থাৎ, মাঠে থাকা মোট সময়ের ৬৪ শতাংশ মেসি শুধু হেঁটেছেন। আবার যেটুকু সময় তিনি দৌড়েছেন, সেটা কখনওই ঘণ্টায় ৩০ কিলোমিটারের উপরে যায়নি।

    এর পরেও কী ভাবে প্রতি ম্যাচে গোল? ২০২২ সালে মেসির বয়স ছিল ৩৫, এখন ৩৯। লম্বা সোলো রান যে এখন সম্ভব নয়, জানেন। গতি কমেছে, কমেছে রিঅ্যাকশন টাইম। সে জন্যই ওই আলস্য মাখা নিঃশব্দ হাঁটাহাঁটির মধ্যে থেকে গিয়েছে নিখুঁত পরিকল্পনা। বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের পিছনে অফসাইড পজিশনে এমন ভাবে হাঁটছেন, যাতে ডিফেন্ডার স্বচ্ছন্দ বোধ করছে। তাঁর কাছে বল গেলে তো অফসাইড হবে। এখানে কেপ ভের্দে ম্যাচে প্রথম গোলের রিপ্লে দেখলে পরিষ্কার হবে, কী ভাবে এই অফসাইড ফাঁদ তৈরি করেছিলেন মেসি। প্রথমে লিসান্দ্রো মার্তিনেসকে একটা ইঙ্গিত। তখন তিনি অফসাইড পজি়শনে। কেপ ভের্দের দুই ডিফেন্ডারের লক্ষ্য সামনে বলের দিকে। নিঃশব্দে মেসি ডিফেন্ডারের অলক্ষ্যে চলে আসেন অনসাইড পজিশনে। তার পরেই লিসান্দ্রোর উঁচু করে বাড়ানো বল। বাঁ পায়ে ম্যাজিক টাচে রিসিভ এবং ভোজ়িনিয়াকে দাঁড় করিয়ে গোল। একই ভাবে মিশর ম্যাচে ০-২ অবস্থা থেকে উইং পজিশনে চলে আসা, যখন তিনি বক্সের মধ্যেই নেই। ঠিক সময়ে রোমেরোর মাথা লক্ষ্য করে ভাসিয়ে দেওয়া ক্রস। যা থেকে হেড করে রোমেরো ১-২ করেন।

    ‘বি ইয়োর বেস্ট’ বলে এক আমেরিকান সংস্থা এই বিশ্বকাপে প্লেয়ারদের ‘পেরিফেরাল ভিশন’, ‘ডিসিশন মেকিং’ এবং ‘কগনিটিভ এবিলিটিজ়’ নিয়ে কাজ করছে। পেরিফের‍াল ভিশন, অর্থাৎ মাথার দু’পাশের বস্তু যা দু’চোখে ভালো করে দেখা যাচ্ছে না, কিন্তু আন্দাজ করার ক্ষমতা। ডিসিশন মেকিং বলতে কত দ্রুত সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট প্লেয়ার আর কগনিটিভ এবিলিটিজ় হলো কোন পরিস্থিতিতে কোনটা সঠিক হতে পারে, সেই বিষয়ে স্পষ্ট বিচারক্ষমতা। ওই সংস্থার ডেটা বলছে, যে কোনও বল রিসিভ করার আগে ১০ সেকেন্ডে মেসি ৩.৪ থেকে ৪.৫ বার ভিস্যুয়াল স্ক্যান করছেন, অর্থাৎ নানা রকম বিকল্প খতিয়ে দেখছে তাঁর মস্তিষ্ক। যা ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগে যে কোনও ফরোয়ার্ডের চেয়ে বেশি। সঙ্গে থাকছে অবিশ্বাস্য পেরিফেরাল ভিশন। অর্থাৎ ‘অফ দ্য বল’ পজি়শনে বলের দিকে না তাকিয়েও বল কোথায় যাচ্ছে বা যেতে পারে, তা নিয়ে একটা স্বচ্ছ ধারণা থাকছে, ফলে গোলের জন্য এমন জায়গায় পৌঁছে যাচ্ছেন, যেখানে গড়পড়তা স্ট্রাইকার যাবেই না।

    অধিকাংশ বল মেসি রিসিভ করছেন মিডল থার্ড বা অ্যাটাকিং থার্ডে। বেশির ভাগ সময়েই ওয়ান টাচে বল ছেড়ে দিচ্ছেন, আবার কখনও দুটো বা তিনটে টাচে টিমমেটদের জন্য স্পেস তৈরি করছেন বা হাত তুলে নির্দেশ দিচ্ছেন। যেমন মিশর ম্যাচে ২-২ থাকা অবস্থায় হুলিয়ান আলবারেসকে বলেছিলেন, ফাঁকায় থাকা লাউতারোকে বল দিতে। শেষে লাউতারোর ক্রস থেকেই হেডে জয়ের গোল করেন এন্‌সো ফের্নান্দেস।

    কোয়ার্টার ফাইনাল পর্যন্ত পৌঁছলেও আর্জেন্তিনার ডিফেন্সকে এখন থেকে প্রতি ম্যাচে আরও বড় পরীক্ষা দিতে হবে। যে জন্য সুইস ক্যাপ্টেন গ্রানিট জ়াকা ম্যাচের আগে বলছেন, ‘ওদের শেষ দুটো ম্যাচ আমাদের মোটিভেট করছে। সু়যোগ আমাদের আসবে। সেটাকে কাজে লাগানোটাই আসল কথা।’

    মেসিকে ডাবল বা ট্রিপল কভারিংয়ে রাখা হতেই পারে। তার পরেও থাকবে ওই অলস হাঁটাহাঁটি। কিন্তু বল পায়ে পড়লে কী হবে, ফুটবল বিশ্ব জানে!
  • Link to this news (এই সময়)