এই সময়: টেস্ট ক্রিকেটে লড়াই হচ্ছে ভারত–পাকিস্তানের, হঠাৎই সেখানে মৌমাছির হামলা। ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছি।
১৯৭৯–’৮০। ছয় টেস্টের সিরিজ় খেলতে ভারতে এসেছে পাকিস্তান। প্রথম টেস্ট সাবেক ব্যাঙ্গালোর, এখনকার বেঙ্গালুরুর চিন্নাস্বামী স্টেডিয়ামে। সেটা প্রথম দিনের খেলা, ১৯৭৯–র ২১ নভেম্বর। খেলার মধ্যেই আচমকা ঝাঁকে ঝাঁকে মৌমাছির আক্রমণ। সেই হামলা থেকে বাঁচতে স্বরূপ কিষেন–সহ দু’জন আম্পায়ার, মাঠে থাকা ক্রিকেটাররা শুয়ে পড়লেন মাটিতে। দর্শকরাও আড়াল খুঁজতে ব্যস্ত। কিন্তু এক জনের কোনও হেলদোল নেই। চিত্র সাংবাদিক সেই ব্যক্তি মৌমাছির হুলের পরোয়া না–করে ক্যামেরার শাটার বাটন পর পর টিপে যাচ্ছেন। আম্পায়ার, ক্রিকেটার, দশর্ক— গোটা মাঠ শুয়ে পড়েছে মৌমাছির হামলা থেকে রক্ষা পেতে, ওই মুহূর্ত ফ্রেমবন্দি করে আন্তর্জাতিক পুরস্কার ও সম্মান পেয়েছিলেন কলকাতার সেই ক্রীড়া চিত্রসাংবাদিক। তখন তিনি সেই সময়কার স্পোর্টস ম্যাগাজ়িন ‘স্পোর্টসওয়ার্ল্ড’–এ। এ রকম বহু টেস্ট ম্যাচ ও ফুটবল টুর্নামেন্ট, একাধিক অলিম্পিক্স, এশিয়ান গেমস ও বিশ্বকাপ ক্রিকেট কভার করা নিখিল ভট্টাচার্য রবিবার সকালে, ৯৩ বছর বয়সে চলে গেলেন না–ফেরার দেশে।
গত শতাব্দীর সত্তর–আশি–নব্বইয়ের দশকে দাপটের সঙ্গে কাজ করা ওই ক্রীড়া চিত্রসাংবাদিকের শরীর ভালো যাচ্ছিল বা গত এক–দেড় বছর যাবৎ। গত শুক্রবার তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়। সেখানেই এ দিন তিনি মারা যান। নিখিলের স্ত্রীও অসুস্থ। দুই কন্যা রয়েছে দম্পতির।
পাশ করা সিভিল ড্রাফটসম্যান নিখিল ভট্টাচার্য বালিগঞ্জ সায়েন্স কলেজে চাকরি করতে করতে নিছকই শখ হিসেবে শুরু করেছিলেন স্পোর্টস ফোটোগ্রাফি। মুম্বই থেকে প্রকাশিত ‘স্পোর্টসউইক’ ম্যাগাজ়িনে নিয়মিত বেরোত তাঁর তোলা ছবি। প্রথম দিকে নিজের খরচে রাজ্যের বাইরে বেশ কিছু টুর্নামেন্টের ছবি তুলতে গিয়েছেন তিনি। বছর খানেকের বেশি যুক্ত ছিলেন সেই সময়ে ভারতের সর্বাধিক প্রচারিত ক্রীড়া সাপ্তাহিক ‘খেলার আসর’–এর সঙ্গে। কালেদিনে নিখিল ভট্টাচার্য স্পোর্টস ফোটোগ্রাফার থেকে নিজেকে উন্নীত করেন স্পোর্টস ফোটোজার্নালিস্ট হিসেবে। ‘স্পোর্টসওয়ার্ল্ড’–এর সম্পাদক মনসুর আলি খান পটৌদির সঙ্গে তাঁর সখ্য তো ছিলই, অন্য অনেক তারকা খেলোয়াড়ের সঙ্গে নিখিল ভট্টাচার্যের নিবিড় যোগাযোগ বা ডিপ কনট্যাক্ট ছিল বহু তাবড় ক্রীড়া সাংবাদিকের কাছে ঈর্ষণীয়। প্রবীণ ক্রীড়া সাংবাদিক সুব্রত সরকার বলছেন, ‘মোহনবাগানের সঙ্গে গোলমাল হওয়ায় ফুটবলার সৈয়দ নইমউদ্দিন খেলা ছেড়ে, কলকাতা ছেড়ে মুম্বই চলে যাচ্ছেন, সেই স্কুপ আমি পেয়েছিলাম নিখিলের জন্য। আমি তখন সাবেক হিন্দুস্তান স্ট্যান্ডার্ড কাগজে। ১৯৭৩। সেই সময়ে নিখিল ফ্রিল্যান্স ফোটোগ্রাফার। আমাদের অফিসে ও নিজে এসে খবরটা দিয়েছিল। ভিন রাজ্যের বহু প্লেয়ার ও সাংবাদিকও কলকাতায় ভরসা করত শুধু নিখিলকেই। নিখিলের খুব বড় গুণ ছিল, যে খেলাটা ও কভার করত, সেই খেলাটা ও বুঝত, বিশেষ করে ফুটবল ও ক্রিকেট।’
‘খেলার আসর’–এর চিত্রসাংবাদিক পাহাড়ী রায়চৌধুরীর কথায়, ‘নিখিলদা আমার কাছে গুরুদেব। প্লেয়ারদের সঙ্গে ওঁর যোগাযোগ কী পর্যায়ে ছিল, সেটা ভাবা যায় না। আমাদের সময়কার খেলার দুনিয়ায় ওঁকে কে চিনতেন না! আর নিখিলদার রিফ্লেক্স ছিল অবিশ্বাস্য। যে কারণে খেলার অসাধারণ কিছু মুহূর্ত ওঁর পক্ষে ফ্রেমবন্দি করা সম্ভব হয়েছে।’ এ রকমই একটি ছবি ল্যামিনেট করে টাঙিয়ে রাখা ছিল ‘খেলার আসর’–এর সম্পাদকের ঘরের দেওয়ালে। কোনও এক সন্তোষ ট্রফিতে বাংলা–পাঞ্জাব ম্যাচের একটি মুহূর্তের ছবি। শূন্যে থাকা বল দখলের লড়াইয়ে ছ’–সাত জন ফুটবলার এমন পজ়িশনে যে, ছ’–সাতটি সিঁড়ি যেন তৈরি হয়েছে। মানব–সোপান। সেই সম্পাদক চিত্তরঞ্জন বিশ্বাস ওরফে চিরঞ্জীবের মতে, ‘এ রকম মুহূর্তকে ধরার জন্য অসীম ধৈর্য সহকারে নিখিল অপেক্ষা করত, অনন্ত অপেক্ষা যেন। এটাই ছিল ওর প্রধান বৈশিষ্ট্য। এ ক্ষেত্রে বহু পুরোনো চিত্র সাংবাদিক শম্ভু চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে নিখিলের তুলনা করা যায়। যিনি জওহরলাল নেহরু হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ে যাচ্ছেন আর বাবাকে ধরতে যাচ্ছেন ইন্দিরা গান্ধী— এই মুহূর্তকে ফ্রেমবন্দি করেছিলেন।’