ভারতীয় রেলের এসি কোচে যাত্রীদের জন্য দেওয়া তোয়ালে, বেডশিট, বালিশের কভার, কম্বল-সহ নানা লিনেন সামগ্রী চুরির ঘটনা উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। প্রত্যেক ট্রেনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) কোচে প্রত্যেক যাত্রীর জন্যই থাকে দু’টি চাদর, একটি বালিশ, একটি বালিশের কভার এবং একটি তোয়ালে। কিন্তু যাত্রা শেষে রেলের সেই সম্পত্তি নিজের মনে করে অনেক যাত্রীই ব্যাগে পুরে নেন। যাত্রীদের এই ‘হাত টান’-এর জেরেই কোটি কোটি টাকার ক্ষতির মুখে ভারতীয় রেল।
সাম্প্রতিক সমীক্ষা বলছে, প্রতি ১,০০০ যাত্রীর মধ্যে একজন চাদর, বালিশ ও তোয়ালের মধ্যে অন্তত একটি জিনিস নিয়ে চলে যান। এই ভাবে গত চার বছরে (২০২১-২২ থেকে ২০২৪-২৫) রেলের এসি কোচ থেকে মোট ১ কোটি ২৬ লক্ষ ৮৩ হাজার ৭০৪টি লিনেন সামগ্রী অর্থাৎ চাদর-বালিশ-তোয়ালে উধাও হয়ে গিয়েছে। সংসদে কেন্দ্রীয় রেলমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব লিখিত ভাবে এই বিপুল পরিমাণ বেড রোল উধাও হওয়ার তথ্য দিয়েছেন।
রেল মন্ত্রকের তথ্য অনুযায়ী, চুরি যাওয়া সামগ্রীর মধ্যে রয়েছে ফেস টাওয়েল, হ্যান্ড টাওয়েল, বেডশিট, পিলো কভার, বালিশ ও কম্বল। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যাত্রীকে পরিষ্কার লিনেন সরবরাহ করতে হয় ভারতীয় রেলকে। কিন্তু যাত্রীদের একাংশ এই সব জিনিস নিয়ে চলে যাওয়ায় রেলের উপর আর্থিক চাপ ক্রমশ বাড়ছে। একটি সর্বভারতীয় সংবাদপত্রে উদ্ধৃত RTI তথ্য অনুসারে, বিগত চার বছরে এই চুরির কারণে বেডরোল ঠিকাদারদের প্রায় ১০৪.৫১ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে।
সংসদে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চার বছরে চুরি হওয়া সামগ্রীর মধ্যে সবচেয়ে বেশি রয়েছে তোয়ালে। এর পরেই রয়েছে বেডশিট ও পিলো কভার। এছাড়া, উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় বালিশ ও কম্বলও নিখোঁজ হয়েছে। চার বছরে প্রায় ৫৫.৭৪ লক্ষ ফেস টাওয়েল উধাও হয়েছে। ৩৩.৭৪ লক্ষ হ্যান্ড টাওয়েল, ১৫.৮৭ লক্ষ বেডশিট, ১১.৬৯ লক্ষ পিলো কভার, ৫.২৩ লক্ষ বালিশ এবং ৪.৫৬ লক্ষ কম্বলেরও খোঁজ নেই।
এই কারণে রেলকে বারবার নতুন লিনেন কিনতে হচ্ছে, যার ফলে ব্যয় বাড়ছে। তবে রেলের জন্য এটি শুধু জিনিস হারানোর বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বিপুল আর্থিক ব্যয়ও। প্রতিটি লিনেন সেট ধোয়া, জীবাণুমুক্ত করা, সংরক্ষণ এবং পুনরায় ট্রেনে সরবরাহ করার জন্য আলাদা খরচ হয়। অতীতে রেল জানিয়েছিল, একটি সম্পূর্ণ লিনেন সেট ধোয়ার খরচই প্রায় ₹৪০-৫০। ফলে বারবার নতুন লিনেন কিনতে হওয়ায় রেলের ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
এই নতুন সমস্যা নয়। বহু বছর ধরেই তোয়ালে ও বেডশিট চুরি রেলের মাথাব্যথা। কড়া আইন ও জরিমানার হুঁশিয়ারিতেও বন্ধ হচ্ছে না এই প্রবণতা। এর জেরে ২০১৩ সালেই রেল মন্ত্রক অনেক রুটে কাপড়ের তোয়ালে তুলে দেওয়া বা ডিসপোজেবল বিকল্প ব্যবহারের কথা বিবেচনা করেছিল। পরে কোভিড মহামারির সময়ে স্বাস্থ্যবিধির কারণে কিছু সময়ের জন্য ট্রেনে কম্বল, চাদর ও বালিশ সরবরাহও বন্ধ রাখা হয়েছিল। কিন্তু পরে দুনিয়া নিউ নর্ম্যাল ব্যবস্থায় অভ্যস্ত হতে যাত্রীদের কথা ভেবে ফের বেড রোল দেওয়া শুরু করে রেল। কিন্তু যাত্রীদের একাংশের চুরির প্রবণতা বন্ধ হয়নি।
রেল মন্ত্রক জানিয়েছে, লিনেন চুরি রোধে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কোচ অ্যাটেনডেন্টদের আরও সতর্ক করা হয়েছে এবং লিনেন বিতরণ ও সংগ্রহের উপর নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। পাশাপাশি কোথায় কত সামগ্রী বিতরণ হচ্ছে এবং যাত্রা শেষে কত ফেরত আসছে, তার হিসাবও আরও কড়াভাবে রাখা হচ্ছে।
রেল সূত্রের মতে, প্রতিদিন এসি কোচে যাত্রীদের জন্য বিপুল পরিমাণ লিনেন সরবরাহ করা হয়। কিন্তু বারবার চুরির ঘটনা ঘটায় পরিষেবা বজায় রাখা এবং পর্যাপ্ত মজুত রাখা রেলের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ধরনের চুরি শুধু রেলের আর্থিক ক্ষতির সমস্যা নয়, অন্য যাত্রীদের জন্যেও অসুবিধা তৈরি করছে। রেল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, সরকারি সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক যাত্রীর দায়িত্ব। বারবার লিনেন চুরির ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতির বোঝা বহন করতে হয় সরকারি সংস্থাকেই, যার প্রভাব পড়ে করদাতাদের অর্থের উপরও।