• মিলেছে জিআই স্বীকৃতি, নতুন শঙ্খধ্বনিতে মেতে উঠেছে হাটগ্রাম
    এই সময় | ১৩ জুলাই ২০২৬
  • দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া

    লালমাটির জেলা বাঁকুড়ার শতাব্দী প্রাচীন শঙ্খ শিল্প এ বার পেল জিআই (জিওগ্রাফিক্যাল ইন্ডিকেশন) স্বীকৃতি। উচ্ছ্বসিত শিল্পী মহলের আশা, আন্তর্জাতিক বাজারে শঙ্খ শিল্প পাবে নতুন পরিচিতি।

    বাঁকুড়ার ইন্দপুর ব্লকের হাটগ্রামের পাশাপাশি বাঁকুড়া শহরের শাঁখারিপাড়া, বিষ্ণুপুর, শাসপুর, রায়বাঘিনীতে বহু শিল্পী বংশ পরম্পরায় এই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। তবে ইন্দপুরের হাটগ্রাম হলো এ রাজ্যের অন্যতম প্রধান শঙ্খ শিল্পের কেন্দ্র। সূক্ষ্ম কার্ভিং বা শঙ্খের উপরে ভাস্কর্য নির্মাণে এই গ্রামের শিল্পীরাই বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছেন। হাটগ্রাম শঙ্খ বণিক কল্যাণ সমিতি ২০২২–এ আবেদন করেছিলেন প্রায় ৩০০ বছরের পুরোনো এই শিল্পের জিআই ট্যাগের জন্য। অবশেষে মিলেছে স্বীকৃতি।

    হাটগ্রামে রয়েছে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের বাস। তার মধ্যে প্রায় ৩০০ পরিবার শাঁখারি সম্প্রদায়ের। এই পরিবারগুলি তার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ভাবে যুক্ত। সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক হয়েছে হাটগ্রামের শঙ্খ শিল্প। হাতে পরার শাঁখা, পুজোর শঙ্খের পাশাপাশি শিল্পীদের নিপুণ হাতে তৈরি হচ্ছে গৃহসজ্জার নানা সামগ্রী।

    শঙ্খ শিল্পের কাঁচামাল, অর্থাৎ কাঁচা শঙ্খ আসে দক্ষিণ ভারত থেকে। কঠোর পরিশ্রম ও দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা পরিণত হয় শিল্প সামগ্রীতে। প্রথমে পেনসিল দিয়ে নকশা আঁকেন শিল্পীরা। তার পরে বিশেষ কার্ভিং মেশিনের সাহায্যে শাঁখের উপরে ধাপে ধাপে চলে খোদাইয়ের কাজ। আগে এই কাজ হতো ছেনি ও বাটালি দিয়ে, এখন আধুনিক যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। রামায়ণ, মহাভারত, পুরাণের খণ্ডচিত্রের পাশাপাশি মানবসভ্যতার বিবর্তন, সাক্ষরতা অভিযান, পরিবেশ সচেতনতা এবং সমকালীন সামাজিক বার্তাও শঙ্খের গায়ে ফুটিয়ে তুলছেন হাটগ্রামের শিল্পীরা।

    সম্প্রতি শঙ্খের গায়ে সূক্ষ্ম জালি কেটে ত্রিমাত্রিক নকশা তৈরির অভিনব কৌশলও নজর কেড়েছে। শিল্পীরা জানাচ্ছেন, পূর্ণাঙ্গ কারুকার্যমণ্ডিত একটি শঙ্খ তৈরি করতে ছ’দিন থেকে তিন মাস পর্যন্ত সময় লাগে। হাতে পরা শাঁখাতেও খোদাই করে ফুটিয়ে তোলা হয় বিভিন্ন দেবদেবীর ছবি। পশ্চিমবঙ্গ–সহ ঝাড়খণ্ড, বিহার, ওডিশার বিভিন্ন জায়গা থেকে পাইকারি ব্যবসায়ীরা এসে হাটগ্রাম থেকে শিল্পসামগ্রী নিয়ে যায়। এ ছাড়া রাজ্য সরকারের বিভিন্ন বিপণন কেন্দ্র পণ্য নেয়। হাটগ্রামের রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত শঙ্খ শিল্পী বাবলু নন্দী বলছেন, ‘জিআই স্বীকৃতি আমাদের বহু প্রজন্মের সাধনার সম্মান। আন্তর্জাতিক বাজারে হাটগ্রামের শঙ্খ শিল্পের পরিচিতি আরও বাড়বে।’

    বাঁকুড়ার বাসিন্দা ও গবেষক অধ্যাপক সৌমেন রক্ষিত মনে করেন, ‘হাটগ্রামের শঙ্খ শিল্প কেবল হস্তশিল্প নয়, এটি বাংলার ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারক। জিআই স্বীকৃতি এই শিল্পের স্বকীয়তাকে আইনি সুরক্ষা দেবে এবং শিল্পীদের ন্যায্য মর্যাদা ও অর্থনৈতিক উন্নয়নের নতুন দিগন্ত খুলে দেবে। এখন প্রয়োজন গবেষণা, প্রশিক্ষণ, পর্যটন ও বাজার ব্যবস্থাকে একসূত্রে গড়ে তোলা।’

  • Link to this news (এই সময়)