• মুঘল আমল থেকেই ‘একহারা’, ‘দোহারা’, ‘মসলন্দ’, এ বার জিআই ট্যাগ পেল সবংয়ের সেই মাদুর কাঠি
    এই সময় | ১৩ জুলাই ২০২৬
  • সুমন ঘোষ

    চাষ করেন ছেলেরা। আর মেয়েরা বোনেন। দুই মননের মিলনেই ৪০০ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে টিকে রয়েছে সবংয়ের মাদুর শিল্প। ‘একহারা’, ‘দোহারা’ থেকে ‘মসলন্দ’! কোনওটায় দড়ির বুনন, কোনওটা আবার তৈরি সুতোর সূক্ষ্ম বুননে। সরু গোলাকার চার হাত দৈর্ঘ্যের গাঁটহীন একটি কাঠি। সেই কাঠি দিয়েই সনাতনী থেকে লুমের মাদুর বোনা চলছে ঘরে ঘরে। অতীতে সবংয়ের এই হস্তশিল্প জাতীয় স্তরে তো বটেই, আন্তর্জাতিক স্তরেও সমাদৃত হয়েছে। জাতীয় পুরস্কারও পেয়েছেন মাদুর শিল্পীরা। এ বার জিআই ট্যাগ পেল সবংয়ের সেই মাদুর কাঠিও।

    মাদুরের ইতিহাস ও মেসোপটেমিয়া সভ্যতা

    ইতিহাসবিদদের মতে, প্রাচীন মেসোপটেমিয়া সভ্যতায় সম্ভবত প্রথম মাদুর বোনা শুরু হয় খড় ও নলখাগড়া দিয়ে। মুঘল আমলেও মাদুরের প্রচলন ছিল। সবংয়ের শিক্ষক অরিজিৎ দাস অধিকারী বলছেন, ‘শোনা যায়, দিল্লির সিংহাসনে যখন জাহাঙ্গির ছিলেন, তখন তাঁর সুন্দরী বেগম মেহের-উন্নিসা সম্রাটকে একটি মসৃণ মাদুর উপহার দিয়েছিলেন। সেই মসৃণ মাদুর থেকেই সম্ভবত মছলন্দ বা মসলন্দ মাদুরের জন্ম, যা আজও বোনা হয় সবংয়ে।’

    মুঘল সাম্রাজ্যের সঙ্গে মাদুরের সম্পর্ক

    মুঘল সম্রাজ্ঞী সবং থেকেই সেই মাদুর দিল্লির দরবারে আনিয়েছিলেন কি না বা সবংয়ের মাদুর তখন দিল্লি যেত কি না, তার কোনও প্রামাণ্য নথি আজ পর্যন্ত মেলেনি। শিল্পীরাও নিশ্চিত নন, ঠিক কোন সময় থেকে সবংয়ে মাদুর তৈরি শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলেন, সবংয়ে মাদুর শিল্পের জন্ম সম্ভবত সার্তা গ্রামে। মসলন্দ মাদুর তৈরি করে ১৯৫২ সালে প্রথম পুরস্কৃত হয়েছিলেন সার্তার বাসিন্দা বাবুলালচন্দ্র জানা। গ্রামের মাদুর শিল্পী, ষাটোর্ধ্ব অশোক জানা বলছেন, ‘আমরা বাপ-ঠাকুরদার কাছেও গল্প শুনেছি। তাঁরাও মাদুর বুনতেন। কিন্তু কত বছর আগে জন্ম, তা আমরাও জানি না। বাপ-ঠাকুরদাও বলতে পারেননি।’

    সবংয়ের ইতিহাসে মাদুর

    তবে সবংয়ের গল্প-কথায় আজও মাদুর তৈরির ইতিহাস ধরা আছে। এলাকার বাসিন্দারা জানান, একসময়ে হেঁসাটি ঘাস দিয়ে বিছানা তৈরি হতো। তাকে বলা হতো হেঁস। কিন্তু ওই ঘাস বেশ মোটা হওয়ায় তা বেশিদিন ব্যবহার করাও যেত না। সেই সময়ে সবংয়ের মোহার এলাকায় বরদার কাছে একটি পুকুরের শ্যাওলা থেকে আর একপ্রকার ঘাস বের হতে দেখা যায়। কেউ কেউ সেই ঘাস দিয়েই নতুন করে বিছানা বুনতে শুরু করেন। সেই থেকেই শুরু মাদুর।

    প্রথম দিকে মোটা কাঠি দড়ি দিয়ে বেঁধে মাদুর তৈরি হতো। ‘এককাঠি’র সেই মাদুরের এখন আধুনিকীকরণ হয়েছে। চেনা এককাঠি মাদুর থেকে দুই কাঠির মাদুর, মসলন্দ-ফোল্ডিং মাদুর তৈরি হয় সবংয়ের ঘরে-ঘরে। সার্তা, বুড়াল, মোহার, বিষ্ণুপুরের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাদুর কাঠির চাষ দেখলে বোঝা যায়, স্থানীয়েইরা এই শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন। বছর চল্লিশ আগেও সবংয়ের মাদুরের শিল্পে রমরমা ছিল। তখন অর্থাভাব যে ছিল না, তা নয়। ঋণের অভাবে শিল্পীরা পিছিয়ে পড়ছিলেন। শোনা যায়, ১৯৮২ সালে বিধায়ক মানস ভুঁইয়া প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে দু’টি মসলন্দি মাদুর উপহার দিয়েছিলেন। তা দেখে অবাক ইন্দিরা বেশ কিছু ব্যাঙ্কের লাইসেন্স দিয়েছিলেন শুধু মাদুর শিল্পীদের সাহায্যের জন্য। ১৯৮৬ সালের বন্যার কথা আজও মনে রেখেছেন সবংবাসী। তার মধ্যেও ব্যাঙ্ক ঋণের বেশিটাই শোধ করেছিলেন শিল্পীরা।

    মসলন্দ মাদুরের দামের কী-কেন

    আগে হাতেই বোনা হত সাধারণ ও মসলন্দ মাদুর। এখন অবশ্য হস্তচালিত যন্ত্রের সাহায্যে বোনা হয়। মোটা কাঠি ব্যবহার হয় সাধারণত মাটিতে পাতার মাদুরে। এখন তার দাম ৫০০ টাকার মধ্যেই। তবে মসলন্দ মাদুরের দাম ন্যূনতম ২০-২২ হাজার টাকা। দু’জন শিল্পীর ১২ থেকে ৫০দিনের মতো সময় লাগে একটি মসলন্দ মাদুর বুনতে। কিছু কিছু মসলন্দ তৈরি করতে আবার ৩-৬ মাস পর্যন্ত লেগে যায়! একটি কাঠিকে দাঁত দিয়ে সরু করে কেটে সুক্ষ্মভাবে বোনা হয় রবীন্দ্রনাথ, মহাত্মা গান্ধী, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর অবয়ব। কখনও থাকে রাধাকৃষ্ণ, কখনও রাম-রাবণের যুদ্ধ, কখনও আবার চাঁদ-তারা-পাখির রংবেরঙের নকশা।

    কেন মন্দা মাদুর ব্যবসায়?

    তবে মাদুর শিল্পে এখন মন্দা চলছে বলেই জানাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। সার্তার জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী মিঠুরানি জানা বলেন, ‘এখন মসলন্দি মাদুরের চাহিদা রয়েছে। তবে দামের জন্য কেউ নিতে চায় না। সরকারি ভর্তুকি তো পাই না, ফলে কম দামে বিক্রি করতে পারি না।’ সার্তা গ্রামের ঘরে ঘরে মাদুর শিল্পী। তাঁরা প্রায় সাত পুরুষ ধরে মাদুর বুনছেন। এই গ্রাম থেকেই জাতীয় পুরস্কার পেয়ছেন বহু শিল্পী। পুষ্পরানি জানা, অলোক জানা, মিঠু জানা—তালিকাটা যত বড়, জীবনের স্বাচ্ছন্দ্য ততখানি নয়। শিল্পীদের মত, এই পেশা এখন সরকারি সাহায্যের অভাবে ধুঁকছে। কম দামী প্লাস্টিক মাদুর ও চেন্নাইয়ের সিন্থেটিক মাদুর বাজার গ্রাস করছে। তবে এখন মাদুর কাঠি দিয়ে তৈরি হচ্ছে ব্যাগ, টেবিল ম্যাট, মোবাইল কভারের মতো নানা নিত্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম।

    সরকারি উদ্যোগ নিয়ে রাজনৈতিক চাপানউতর বিস্তর হয়েছে। বাম আমল থেকেই এই শিল্প কদর পায়নি বলে নানা সময়ে অভিযোগ উঠেছে। সবংয়ের বিজেপি বিধায়ক অমল পণ্ডা বলেন, ‘সবংয়ের মানুষের কাছে মাদুরের গুরুত্ব অপরিসীম। এই শিল্পের উপর ভিত্তি করে এলাকার অর্থনীতি দাঁড়িয়ে রয়েছে। তাই সবংয়ে মাদুর শিল্পের উন্নয়নে রাজ্য সরকারের কাছে বিভিন্ন প্রস্তাব রাখব। সবংয়ের মাদুর শিল্পের বিস্তার ঘটিয়ে অর্থনৈতিক বিকাশ আমার প্রধান লক্ষ্য। ধীরে ধীরে সে বিষয়ে সব ধরনের পদক্ষেপ করা হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)