• বঙ্গোপসাগরের বুকে মর্মান্তিক ট্র্যাজেডি!
    আজকাল | ১৩ জুলাই ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: টানা কয়েকদিনের উদ্বেগ, প্রার্থনা এবং অপেক্ষার পর অবশেষে মিলল নিখোঁজ ‘জয় মা কালী’ ট্রলারের সন্ধান। কিন্তু সেই সন্ধান স্বস্তির বদলে নিয়ে এল আরও বড় শোক। বঙ্গোপসাগরে উল্টে যাওয়া অবস্থায় উদ্ধার ট্রলারটির ভেতর থেকে একে একে বেরিয়ে এল মৎস্যজীবীদের নিথর দেহ। সর্বশেষ উদ্ধার অভিযানে মোট ৯ জন মৎস্যজীবীর মৃতদেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও ৬ জন নিখোঁজ রয়েছেন। ফলে মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছে প্রশাসন। ট্রলারের ভেতরে এবং আশপাশের সমুদ্র এলাকায় রাতভর তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে।

    জানা গিয়েছে, গত ২ জুলাই পূর্ব মেদিনীপুরের শঙ্করপুর মৎস্যবন্দর থেকে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে রওনা দিয়েছিল ‘জয় মা কালী’ ট্রলারটি। ট্রলারে মোট ১৫ জন মৎস্যজীবী ছিলেন। প্রথম কয়েকদিন ট্রলারের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ থাকলেও ৫ জুলাইয়ের পর থেকে সম্পূর্ণ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর থেকেই উদ্বেগে দিন কাটতে থাকে পরিবারগুলির। প্রতিদিন বন্দরে এসে প্রিয়জনদের ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা এবং আত্মীয়-স্বজন। দিন যত গড়িয়েছে, ততই বেড়েছে উৎকণ্ঠা।

    ট্রলারটির সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার খবর পাওয়ার পরই শুরু হয় ব্যাপক অনুসন্ধান। ভারতীয় উপকূল রক্ষী বাহিনী, নৌবাহিনী, বনদপ্তর, সুন্দরবন পুলিশ, গোবর্ধনপুর কোস্টাল থানার পুলিশ এবং স্থানীয় অভিজ্ঞ মৎস্যজীবীদের নিয়ে যৌথভাবে বঙ্গোপসাগরের বিস্তীর্ণ এলাকায় তল্লাশি চালানো হয়। দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া, উত্তাল সমুদ্র এবং প্রবল স্রোতের কারণে উদ্ধারকাজে একাধিকবার বাধার মুখে পড়তে হলেও অভিযান বন্ধ করা হয়নি।

    শনিবার থেকে সুন্দরবন টাইগার রিজার্ভের ডেপুটি ফিল্ড ডিরেক্টর চিত্রক ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে উদ্ধার অভিযান আরও জোরদার করা হয়। রামগঙ্গা রেঞ্জের বনকর্মী, সুন্দরবন পুলিশ এবং স্থানীয় মৎস্যজীবীদের সহযোগিতায় রবিবার দক্ষিণ ২৪ পরগনার বকখালি উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে চুলকাঠির জঙ্গলের কাছে বাঘেরচর এলাকায় উল্টে থাকা অবস্থায় ট্রলারটির সন্ধান মেলে।

    এরপর অন্য ট্রলারের সাহায্যে ক্ষতিগ্রস্ত ট্রলারটিকে টেনে পাথরপ্রতিমার গোবর্ধনপুরের সীতারামপুর ঘাটে নিয়ে আসা হয়। সন্ধ্যার পর ঘাটে পৌঁছতেই শুরু হয় ট্রলারের ভেতরে তল্লাশি। প্রথমে ইঞ্জিনের সঙ্গে আটকে থাকা এক মৎস্যজীবীর দেহ উদ্ধার হয়। পরে ট্রলারের ভেতরে জমে থাকা জল শক্তিশালী পাম্পের সাহায্যে বের করার কাজ শুরু হলে একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার হতে থাকে। প্রথমে পাঁচটি দেহ উদ্ধার হলেও পরে আরও চারটি দেহ মিলেছে। ফলে মৃতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯।

    প্রশাসনের আশঙ্কা, এখনও ট্রলারের ভেতরে অথবা দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে আরও দেহ থাকতে পারে। তাই ট্রলারের প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে দেখা হচ্ছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ৬ মৎস্যজীবীর খোঁজে কোস্টগার্ড, বনদপ্তর এবং সুন্দরবন পুলিশের যৌথ তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।

    জানা গিয়েছে, নিখোঁজদের মধ্যে দু'জন ওড়িশার বাসিন্দা। বাকিরা মূলত পূর্ব মেদিনীপুরের শংকরপুর এবং সংলগ্ন এলাকার বাসিন্দা। ট্রলার উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়তেই শংকরপুর, ফ্রেজারগঞ্জ এবং সীতারামপুরে ভিড় জমান নিখোঁজদের আত্মীয়-পরিজনরা। উদ্ধার হওয়া মৃতদেহগুলির পরিচয় নিশ্চিত করার কাজ চলছে। অনেক পরিবার এখনও শেষ আশায় অপেক্ষা করছেন, যদি কোনওভাবে তাঁদের প্রিয়জনের সন্ধান মেলে।

    ঘটনার খবর পেয়ে ট্রলারের মালিকপক্ষও ঘটনাস্থলে পৌঁছেছে। উদ্ধার অভিযানের ওপর নজর রাখছেন প্রশাসনের শীর্ষ আধিকারিকরা। সুন্দরবন উন্নয়নমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা জানান, দুর্ঘটনার খবর পাওয়ার পরই পুলিশ, বনদপ্তর এবং প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরকে দ্রুত উদ্ধারকাজে নামার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। ট্রলারের মধ্যে বিপুল পরিমাণ জল থাকায় উদ্ধারকাজে সমস্যা হচ্ছিল। জল বের করার পরই একের পর এক মৃতদেহ উদ্ধার হচ্ছে। নিখোঁজদের খুঁজে বের করতে অভিযান চলবে বলেও তিনি জানান।

    মন্ত্রী আরও বলেন, মৃত মৎস্যজীবীদের পরিবারের পাশে রাজ্য সরকার থাকবে এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলিকে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে। একই সঙ্গে তিনি মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলির হাতে দ্রুত ক্ষতিপূরণের চেক তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।

    এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরতে যাওয়া ট্রলারগুলির নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কী কারণে ট্রলারটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রতিকূল আবহাওয়া, যান্ত্রিক ত্রুটি, নাকি অন্য কোনও কারণ- সব দিকই তদন্ত করে দেখা হবে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।

    সীতারামপুর ঘাটে এখনও চলছে শোক আর উৎকণ্ঠার আবহ। ট্রলার থেকে জল বের করার কাজ যেমন চলছে, তেমনই সমুদ্রেও অব্যাহত রয়েছে নিখোঁজদের খোঁজে তল্লাশি। প্রতিটি মুহূর্তের সঙ্গে বাড়ছে উৎকণ্ঠা। মৎস্যজীবী পরিবারগুলির একটাই প্রার্থনা, নিখোঁজদের অন্তত খুঁজে পাওয়া যাক। বঙ্গোপসাগরের এই দুর্ঘটনা আবারও মনে করিয়ে দিল, জীবিকার সন্ধানে সমুদ্রে পাড়ি দেওয়া মৎস্যজীবীদের জীবন কতটা অনিশ্চিত এবং ঝুঁকিপূর্ণ।
  • Link to this news (আজকাল)