পশ্চিম মেদিনীপুরের নামী ইংরেজি মাধ্যম স্কুলে প্রথম শ্রেণীর পড়ুয়ার যৌন নির্যাতনের অভিযোগ। ধৃত স্কুলেরই এক অস্থায়ী কর্মী। স্কুল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে অসহযোগিতার অভিযোগ তুলেছেন শিশুর মা ও অন্য পড়ুয়াদের অভিভাবকরা। গত শুক্রবার এই নির্যাতনের ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ। সোমবার সকাল থেকেই স্কুল চত্বরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিভাবকরা। ধৃতের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি তুলেছেন তাঁরা। পাশাপাশি এই ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলেও অভিযোগ তুলেছেন। স্কুলের প্রিন্সিপালের অবিলম্বে পদত্যাগের দাবি তুলছেন তাঁরা। এমনকি অভিযুক্তকেই শিক্ষকদের একাংশ বাঁচাতে চেয়েছিলেন বলেও দাবি অভিভাবকদের। সেই শিক্ষকদেরও সাসপেনশনের দাবিতে গেটের সামনে ধর্নায় বসেন তাঁরা। এদিন পোস্টার-প্ল্যাকার্ড নিয়ে স্কুলের সামনে শয়ে শয়ে অভিভাবক জড়ো হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করতে হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের খবর, শুক্রবার স্কুল ছুটির পর ৬ বছর বয়সী ওই ছাত্র বাড়ি ফিরে তার মায়ের কাছে কান্নায় ভেঙে পড়ে। শিশুর মায়ের বয়ান অনুযায়ী, ওই দিন স্কুলের শৌচাগারে যাওয়ার পর সেখানকার অস্থায়ী পুরুষ কর্মী দরজা বন্ধ করে শিশুর উপর যৌন নির্যাতন চালায়।
নির্যাতিত শিশুর মা জানান, 'আমার ছেলের বয়স মাত্র ছয় বছর। শুক্রবার ও যখন স্কুল থেকে ফিরল, ও ভীষণ ভয় পেয়েছিল। বাড়ি এসে ও কাঁদতে কাঁদতে বলল যে ও এমন একটা কথা বলবে যা বলতে ওর লজ্জা করছে। তার পর ও জানায়, শৌচাগারের কর্মী ওকে ভেতরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করে দেয় এবং ওর ওপর যৌন নির্যাতন চালায়। পাশবিক অত্যাচারের জেরে ওর শ্বাস বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ঠিক সেই সময় ওর ক্লাসেরই অন্য এক বন্ধু বাইরে থেকে বাথরুমের দরজায় ধাক্কা দেয়। সেই আওয়াজ পেয়েই ভয়ে ওই কর্মী আমার ছেলেকে ছেড়ে দেয়। তা না হলে আমার ছেলে ওখানেই দম আটকে জ্ঞান হারিয়ে ফেলত।'
এই মারাত্মক ঘটনার কথা জানার পর পরই নির্যাতিত শিশুর পরিবার স্কুলের প্রিন্সিপালের দ্বারস্থ হন। কিন্তু পরিবারের অভিযোগ, প্রিন্সিপাল অপরাধীর বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়া বা পুলিশে খবর দেওয়ার পরিবর্তে উল্টে অভিযুক্ত কর্মীর পক্ষ নিয়ে সাফাই গাইতে শুরু করেন। স্কুলের বদনাম হবে; এই অজুহাত দেখিয়ে তিনি পুলিশকে জানাতে নিষেধ করেন বলে অভিযোগ।
ঘটনা ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা অধ্যক্ষের, অভিভাবকদের যৌথ উদ্যোগে FIR
এরপরই ক্ষোভে ফেটে পড়েন স্কুলের বাকি অভিভাবকরা। তাঁরা নির্যাতিত শিশুর পরিবারের পাশে দাঁড়ান। সম্মিলিতভাবে স্থানীয় কোতোয়ালি থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। পকসো (POCSO) আইনের নির্দিষ্ট ধারায় মামলা রুজু করে পুলিশ ইতিমধ্যেই অভিযুক্ত অস্থায়ী স্কুল কর্মীকে গ্রেফতার করেছে। শনিবার ধৃতকে মেদিনীপুর জেলা আদালতে পেশ করা হলে বিচারক তাকে ৩ দিনের পুলিশি হেফাজতে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
তবে শুধু কর্মীর গ্রেফতারে শান্ত হননি অভিভাবকরা। সোমবার সকালে তাঁরা নিজেদের সন্তানদের স্কুলে না পাঠিয়ে গেটের সামনেই বসে পড়েন। 'উই ওয়ান্ট জাস্টিস' স্লোগান তুলতে থাকেন। বিক্ষোভে শামিল এক অভিভাবক বলেন, 'স্কুল কর্তৃপক্ষ নিজেদের দায়িত্ব পালনে সম্পূর্ণ ব্যর্থ। যেখানে একরত্তি শিশুরা সুরক্ষিত নয়, সেখানে আমরা কোন ভরসায় বাচ্চাদের পাঠাব? অধ্যক্ষ তো বটেই, এমনকি স্কুলের কিছু শিক্ষকও এই ঘটনা নিয়ে অত্যন্ত আপত্তিকর মন্তব্য করছেন। আমরা ওই শিক্ষকদেরও অবিলম্বে সাসপেন্ড করার দাবি জানাচ্ছি।'
তদন্তে নামলেন এসপি পাপিয়া সুলতানা, স্কুলকে কড়া নির্দেশ
ঘটনার গুরুত্ব বিবেচনা করে সরাসরি তদন্ত প্রক্রিয়ার তদারকি করছেন জেলার পুলিশ সুপার পাপিয়া সুলতানা। এদিন সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে এসপি বলেন, 'যেহেতু এই মামলার ভুক্তভোগী একটি শিশু, তাই আমরা জনসমক্ষে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করতে চাই না। নাবালক শিশুকে হেনস্থার খবর পাওয়া মাত্রই আমরা মামলা রুজু করেছি। স্কুলের সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ খতিয়ে দেখে তা ইতিমধ্যেই বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে এবং পরবর্তী পদক্ষেপের জন্য পাঠানো হয়েছে।' এর পাশাপাশি স্কুলের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা ঢেলে সাজাতে একাধিক কড়া নির্দেশিকা জারি করেছে পুলিশ প্রশাসন। এসপি পাপিয়া সুলতানা জানান, পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত পড়ুয়াদের জন্য সম্পূর্ণ পৃথক শৌচাগারের ব্যবস্থা করতে হবে। বাথরুমের প্রবেশ ও বের হওয়ার পথ পর্যবেক্ষণের জন্য ঠিক বাইরে ক্যামেরা বসাতে হবে। কোনও শিশু সমস্যায় পড়লে সাহায্যের জন্য বাথরুমের বাইরে স্থায়ী আয়া বা পরিচারক মোতায়েন রাখতে হবে। এছাড়াও, স্কুলের যে কোনও স্তরের কর্মী নিয়োগের আগে তাঁদের ব্যাকগ্রাউন্ড ভেরিফিকেশন বা চারিত্রিক শংসাপত্র খতিয়ে দেখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। পুলিশ সুপার জানালেন, ভবিষ্যতে যাতে এই ধরণের ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে, তার জন্য সমস্ত প্রয়োজনীয় কঠোর পদক্ষেপ করা হচ্ছে।