পুরসভার ইতিহাসে এই প্রথম! সরকারের ঘরে ফিরে যাচ্ছে কাউন্সিলর তহবিলের ১০০ কোটি
প্রতিদিন | ১৩ জুলাই ২০২৬
প্রায় তিন দশকে কলকাতা পুরসভার (KMC) ইতিহাসে এই প্রথম। সাংসদ-বিধায়ক উন্নয়ন তহবিলের মতো কলকাতার কাউন্সিলরদের জন্য বরাদ্দ ১০০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন, সংস্কার ও পরিষেবা খাতে খরচ সম্ভব হচ্ছে না। প্রশাসনিক নানা জটিলতার কারণে পুর-বাজেটে নানা খাত মিলিয়ে ওয়ার্ড পিছু ৬৫ থেকে ৭৫ লাখের তহবিল বরাদ্দ হলেও প্রকল্পখাতে ব্যয় করা যাচ্ছে না। বাজেট বরাদ্দর পরেই প্রথমে বিধানসভা নির্বাচন ঘোষণা ও পরে মেয়রের ইস্তফায় পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ায় ১৪৪ ওয়ার্ডেই কাউন্সিলর না থাকায় প্রকল্পের সুপারিশ হচ্ছে না। সঙ্গে ১৬টি বরো ও মেয়র পারিষদের মিটিং না হওয়ায় ‘কাউন্সিলর ডেভেলপমেন্ট’ ও ‘মেইনটেনেন্স’ তহবিলের অনুমোদন না পাওয়ায় ইঞ্জিনিয়াররা রাস্তা-জল-নিকাশি-আলো-পার্ক মেরামতের ফাইল করতে পারছেন না। পানীয় জল-সাফাই ও নিকাশির চলতি বড় প্রকল্পগুলির কাজও থমকে গিয়েছে বলে অভিযোগ।
নভেম্বরের শেষে পুরভোটের পর ডিসেম্বরে নয়া পুরবোর্ডের কাউন্সিলরদের সুপারিশ ও তারপর বরো এবং মেয়র পারিষদের বৈঠক প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করে এবছর বরাদ্দ অর্থ খরচের সম্ভাবনা কার্যত নেই বলে দাবি পুরসভার শীর্ষ ইঞ্জিনিয়ারদের। স্বভাবতই সরকারি আর্থিক নিয়মে ১৪৪ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর তহবিলের ১০০ কোটির বেশি ট্রেজারিতেই ফিরে যাবে বলে মেনে নিয়েছে পুরসভার অর্থবিভাগ। যদিও পুরসভার কমিশনার তথা প্রশাসক স্মিতা পাণ্ডে রবিবার জানিয়েছেন, ‘‘ আগে থেকে বিভিন্ন ওয়ার্ডে নানা প্রকল্পখাতে যেখানে যে পরিমাণ অর্থ ধরা আছে সেখানে সেই নির্মাণ ও মেরামতের কাজগুলি যথারীতি হচ্ছে।’’
কলকাতার নাগরিক পরিষেবা বৃদ্ধির পাশাপাশি সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামত এবং স্থায়ী সম্পদ তৈরির জন্য নব্বই দশকের মাঝামাঝি থেকে ‘কাউন্সিলর ডেভেলপমেন্ট’ তহবিল বরাদ্দ শুরু হয়। সাংসদ-বিধায়কদের মতো কলকাতাতেও বর্তমানে ওয়ার্ড পিছু ৫০ লাখ করে বরাদ্দ। এর মধ্যে ‘বরো ইন্টিগ্রেটেড ফান্ড’ও থাকে। সঙ্গে পৌরপ্রতিনিধিদের বস্তি দপ্তর থেকে ‘ডেভেলপমেন্ট’ ও ‘মেইনটেনেন্স’ খাতে পৃথকভাবে অতিরিক্ত ওয়ার্ড পিছু ২০-২৫ লাখ বরাদ্দ হচ্ছে। সব মিলিয়ে এবছর জনতার দাবি মেনে ওয়ার্ড পিছু সমস্ত দলের কাউন্সিলররা ৭০-৭৫ লাখ টাকার প্রকল্পের জন্য সুপারিশ করতে পারতেন। কিন্তু ভোট ঘোষণা ও পুরবোর্ড ভেঙে যাওয়ায় কোনও দলের কাউন্সিলরাই প্রকল্পের সুপারিশ না করতে পারায় বরাদ্দ অর্থ বাজেটের পর কাগজে-কলমে থেকে গিয়েছে। অবশ্য দু’একটি ওয়ার্ডে বরোর ইঞ্জিনিয়াররা ছোট ফাইল করে মেরামত খাতে সামান্য অর্থ খরচের প্রস্তাব পাঠাচ্ছেন পুরভবনে।
বরাদ্দ অর্থ খরচ করতে না পারায় বিজেপির পুর-দলনেতা মীনা দেবী পুরোহিতের অভিযোগ, ‘‘মেয়র ইস্তফা না দিলে তো বোর্ড ভাঙত না, তা হলে কাউন্সিলররা সবাই তহবিল খরচ করতে পারতেন। এখন পুরো ‘ফান্ড’ সরকারের ঘরে ফেরত চলে যাবে।’’ তবে পরিস্থিতির জেরে আগামী বছর ওয়ার্ডের উন্নয়নে নয়া বিপদের আশঙ্কা করেছেন বামফ্রন্টের পুর-দলনেতা মধুছন্দা দেব। দাবি করেছেন,‘‘নিয়ম মেনে টাকা খরচ না হওয়ায় পরের আর্থিক বছরে ওয়ার্ড পিছু বরাদ্দ কম হতে পারে। যদিও এবছরই ব্যতিক্রমী প্রশাসনিক জটিলতা হয়েছে, রাজ্য সরকার নিশ্চয়ই ভেবে দেখবে।’’ বিদায়ী বোর্ডের মেয়র পারিষদ দেবাশীষ কুমার ওয়ার্ডের সঙ্কটের কথা স্বীকার করে বলছেন,‘‘কাউন্সিলরদের তহবিল খরচ না হওয়ায় বাজেটের ঘাটতি কমে যাবে।’’ কালীঘাট-তৃণমূল ঘনিষ্ঠ প্রাক্তন কাউন্সিলর তপন দাশগুপ্তর দাবি, ‘‘নির্বাচন কমিশন ও সরকারের কৌশলেই ওয়ার্ডের সাধারণ মানুষের জন্য বরাদ্দ তহবিল পুরোটাই আটকে গেল।’