বঙ্গোপসাগরে ডুবে যাওয়া ট্রলার থেকে উদ্ধার নয়জন মৎস্যজীবীর দেহ। পূর্ব মেদিনীপুরের দিঘার শঙ্করপুর বন্দর থেকে গত ২ জুলাই মাছ ধরার উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল ‘জয় মা কালী’ নামে ট্রলারটি। ৬ জুলাইয়ের পর থেকে ট্রলারের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। টানা আট দিন তল্লাশির পরে ট্রলারটিকে বকখালি উপকূল থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে বাঘেরচরের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়। রাজ্যের মৎস্যজীবীদের মৃত্যুতে শোকজ্ঞাপন করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। তিনি এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘পশ্চিমবঙ্গের দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলায় নৌকাডুবিতে প্রাণহানির ঘটনা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। শোকের এই মুহূর্তে আমি শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর পাশে আছি। আহতরা দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠুন, এই কামনা করি।’ প্রধানমন্ত্রী জাতীয় ত্রাণ তহবিল (PMNRF) থেকে মৃতদের পরিবারকে ২ লক্ষ টাকা করে অনুদান দেওয়ার কথা ঘোষণা করেন তিনি। আহতদের পরিবারকে ৫০,০০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হবে।
শনিবার বিকেলে দক্ষিণ ২৪ পরগনার গোবর্ধনপুর থানার পুলিশ এবং ভারতীয় উপকূল রক্ষী বাহিনী বাঘেরচরের কাছে ডুবো ট্রলার শনাক্ত করে। রবিবার দিনভর চেষ্টা চালিয়ে মৎস্যজীবীদের বেশ কয়েকটি ট্রলার শক্তপোক্ত কাছি দিয়ে দুর্ঘটনাগ্রস্থ ট্রলারটিকে টেনে পাথরপ্রতিমার সীতারামপুরের উপকূলে নিয়ে আসা হয়। রাতভর উদ্ধারকাজ চালিয়ে ট্রলারের ভেতর থেকে ৯ জন মৎস্যজীবীর দেহ উদ্ধার করা হয়। জানা গিয়েছে, ওই ট্রলারে মোট ১৫ জন মৎস্যজীবী ছিলেন। এখনও ৬ জনের কোনও খোঁজ মেলেনি। উদ্ধার হওয়া দেহগুলি ময়নাতদন্তের জন্য কাকদ্বীপ মহকুমা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। নিখোঁজদের সন্ধানে সোমবার দিনভর তল্লাশি অভিযান চালানো হয় বঙ্গোপসাগরে। মৃতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রশাসনের।
প্রশাসনের তরফে অনুমান করা হচ্ছে, খারাপ আবহাওয়ার মাঝে পড়ে ট্রলারটি উল্টে যাওয়ার কারণে মৎস্যজীবীরা সমুদ্রে পড়ে গিয়ে তলিয়ে যেতে পারেন। ঘটনার খবর পেয়ে শঙ্করপুর থেকে ট্রলারের মালিকপক্ষ কাকদ্বীপ ও নামখানায় পৌঁছন। মর্মান্তিক ট্রলার দুর্ঘটনায় এক পরিবারের তিন ভাই নিখোঁজ রয়েছেন বলে জানা গিয়েছে।
ওডিশার বালেশ্বরের বাসিন্দা রবীন্দ্র মাঝি (৫২), জয়রাম মাঝি (৪৯) ও জগন্নাথ মাঝি (৪৫)। নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের আত্মীয় সন্ন্যাসী মাঝি জানান, তিন ভাই ওডিশা থেকে শঙ্করপুরের ট্রলারে করে বঙ্গোপসাগরে মাছ ধরার জন্য এসেছিল। এর আগেও তারা এখানে এসে মাছ ধরে গিয়েছে। এই প্রথম দুর্ঘটনার কবলে পড়ে একসঙ্গে তিন ভাইয়ের জীবনটাই চলে গেল। ওদের বাড়িতে বৃদ্ধ বাবা মা ও ছোট ছোট ছেলে মেয়ে রয়েছে। সরকার সহযোগিতা না করলে তিন ভাইয়ের পরিবার একেবারেই অথৈ জলে পড়বে।
বাকি নিখোঁজ ও মৃত মৎস্যজীবীদের বাড়ি পূর্ব মেদিনীপুর, হাওড়া ও নদীয়া জেলার বিভিন্ন এলাকায়। উৎকণ্ঠায় মৃত ও নিখোঁজ মৎস্যজীবীর পরিবারের সদস্যরা কাকদ্বীপ সুপার স্পেশালিটি হাসপাতাল মর্গের সামনে অপেক্ষায় ছিলেন। মৎস্যজীবীদের পরিবারের তরফ থেকে জানানো হচ্ছে, চলতি মাসের ২ তারিখে বাড়ি থেকে বেরিয়েছিলেন। তারপর থেকে পরিবারের সঙ্গে আর কোনওরকম যোগাযোগ হয়নি।
রবিবার রাতে ট্রলারটিকে পাথরপ্রতিমা সীতারামপুরের উপকূলে টেনে নিয়ে আসার খবর পেয়েই ঘটনাস্থলে পৌঁছন সুন্দরবন উন্নয়ন প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা। উপস্থিত ছিলেন সুন্দরবন পুলিশ জেলার এসপি বিশ্বচাঁদ ঠাকুর-সহ বনদপ্তরের আধিকারিক ও ভারতীয় উপকূল রক্ষী বাহিনীর জওয়ানরা। সুন্দরবন উন্নয়ন দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী দীপঙ্কর জানা বলেন, ‘মর্মান্তিক ঘটনা। খবর পেয়েই মুখ্যমন্ত্রীকে জানিয়েছিলাম। তারপর তাঁর নির্দেশেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলাম। রাতভর ট্রলারের ভেতর থেকে দেহ উদ্ধারের কাজ চলেছে। মোট ৯ জনের দেহ পাওয়া গিয়েছে। বাকি নিখোঁজ মৎস্যজীবীদের খোঁজে সমুদ্রে তল্লাশি অভিযান চালানো হচ্ছে।’