• লাহেক আলিকে কোন কোন ধারায় মামলা দিল পুলিশ?
    আজকাল | ১৪ জুলাই ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: বারুইপুরের সূর্যপুরে নাবালিকা ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে যে নজিরবিহীন অশান্তি এবং গণপিটুনির পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, তাতে হিংসায় উসকানি ও প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে গ্রেপ্তার করা হয়েছে সিপিআই(এম) নেতা লাহেক আলিকে। রবিবার রাতে খোদারবাজারের নিজ বাসভবন থেকে তাঁকে প্রথমে আটক করে নরেন্দ্রপুর থানায় নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরবর্তীতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সোমবার সকালে কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে লাহেক আলিকে বারুইপুর আদালতে পেশ করা হলে মহামান্য আদালত তাঁর জামিনের আবেদন স্থগিত রেখে ২১ তারিখ পর্যন্ত অর্থাৎ ৮ দিনের পুলিশ হেফাজতের নির্দেশ দেয়।

    আদালত চত্বরে আনার সময় যেকোনও ধরণের অপ্রীতিকর পরিস্থিতি বা ডিম হামলার আশঙ্কায় কড়া পুলিশি পাহারায় হেলমেট পরিয়ে লাহেক আলিকে প্রিজ়ন ভ্যানে তোলা হয়। এ সময় সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে ধৃত বাম নেতা নিজেকে সম্পূর্ণ নির্দোষ দাবি করে বলেন, তিনি রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়েছেন। বিরোধীদের আন্দোলন দমন করতেই তাঁর বিরুদ্ধে এই মিথ্যা অভিযোগ আনা হয়েছে এবং তিনি যে উস্কানিমূলক বক্তব্য দিয়েছেন, পুলিশকে তা প্রমাণ করার চ্যালেঞ্জ জানান তিনি।

    সূর্যপুরের এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে শুরু থেকেই রাজনৈতিক তরজা তুঙ্গে। পুলিশের বিরুদ্ধে নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগ তুলে এলাকাবাসী যখন বিক্ষোভে শামিল হন, তখন প্রথম থেকেই তাঁদের পাশে দাঁড়িয়েছিল স্থানীয় সিপিআই(এম) নেতৃত্ব। সুজন চক্রবর্তী, শমীক লাহিড়ী এবং রতন বাগচীর মতো প্রবীণ বাম নেতারা নির্যাতিতার পরিবারের সাথে দেখাও করেছিলেন। বামপন্থীদের অভিযোগ, বিজেপি এই ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক রং দেওয়ার চেষ্টা করছে এবং রাজ্য সরকার ও পুলিশ প্রশাসন নিজেদের ব্যর্থতা ঢাকতে বিরোধী নেতাদের নিশানা করছে। এমনকি বেশ কিছু সংবাদমাধ্যমও এই বিষয়ে ভুয়ো খবর প্রচার করে মানুষের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছে বলে তাঁরা দাবি করেছেন।

    এর আগে গত মঙ্গলবার বারুইপুরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, যারা পুলিশের ওপর হামলা করেছে এবং এই ঘটনায় উস্কানি দিয়েছে, তাদের কাউকে রেয়াত করা হবে না। রেল লাইন উপড়ে দেওয়া এবং পুলিশের গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় ২০০ জনকে চিহ্নিত করার কথাও তিনি বলেছিলেন। মুখ্যমন্ত্রীর এই বিবৃতির পরই পুলিশের তৎপরতা বৃদ্ধি পায় এবং সিসিটিভি ফুটেজ ও বিভিন্ন ভিডিও খতিয়ে দেখে অবশেষে এই বাম নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। রাজ্য বিজেপির প্রধান মুখপাত্র দেবজিৎ সরকার পুলিশের এই পদক্ষেপকে সমর্থন করে জানিয়েছেন যে, হিংসায় উস্কানি দেওয়ার স্পষ্ট ভিডিও ফুটেজ রয়েছে এবং আইন নিজের পথেই চলছে। অন্যদিকে সিপিএমের শতরূপ ঘোষ তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেছেন, পুলিশকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে ব্যবহার করে রাজ্য সরকার এই কাজ করেছে এবং এর বিরুদ্ধে তাঁরা উচ্চ আদালতে গিয়ে আইনি লড়াইয়ে জয় ছিনিয়ে আনবেন।

    পুলিশের পক্ষ থেকে ধৃত এই বাম নেতার বিরুদ্ধে যে সমস্ত ধারা দেওয়া হয়েছে, তার তালিকা অত্যন্ত দীর্ঘ এবং গুরুতর। ভারতীয় ন্যায় সংহিতা বা বিএনএস (BNS)-এর অধীনে তাঁর বিরুদ্ধে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের জন্য BNS 61(2), খুন সংক্রান্ত অপরাধে BNS 103(2) এবং মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবনযোগ্য অপরাধে প্ররোচনা দেওয়ার অভিযোগে BNS 55 ধারা প্রয়োগ করা হয়েছে। এছাড়াও বেআইনি জমায়েতের সদস্য হওয়ার জন্য BNS 189(2), বেআইনি জমায়েতের সাধারণ উদ্দেশ্যে সংগঠিত অপরাধে সকল সদস্যের দায় বর্তানোর BNS 190, দাঙ্গা বাধানোর জন্য BNS 191(2) এবং দাঙ্গা উসকে দেওয়ার অপরাধে BNS 192 ধারা দেওয়া হয়েছে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিদ্বেষ ছড়ানোর অভিযোগে BNS 196, গুজব বা মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে এক সম্প্রদায়কে অন্যের বিরুদ্ধে উসকানি দেওয়ার জন্য BNS 353(1)(c) এবং সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ সৃষ্টির জন্য BNS 353(2) ধারা যুক্ত করা হয়েছে। ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার উদ্দেশ্যে অপমানের জন্য রয়েছে BNS 299 ধারা। সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা বা সরকারি কাজকর্মে বাধা সম্পর্কিত অপরাধের জন্য BNS 121(1) ও 121(2), সরকারি কর্মচারীর ওপর হামলা বা বলপ্রয়োগ সংক্রান্ত BNS 132, স্বেচ্ছায় আঘাত করার অপরাধে BNS 115(2), গুরুতর আঘাত করার জন্য BNS 117(4), সম্পত্তি নষ্ট বা ক্ষতির জন্য BNS 324(2) ও 324(6), অপরাধমূলক অনধিকার প্রবেশের জন্য BNS 329(3) এবং অপরাধমূলক ভয় দেখানোর অভিযোগে BNS 351 ধারা দেওয়া হয়েছে।

    বিএনএস-এর পাশাপাশি লাহেক আলির বিরুদ্ধে অন্যান্য বিশেষ আইনেও মামলা রুজু হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ১৯৮৪ সালের পিডিপিপি অ্যাক্ট (PDPP Act)-এর ৩ নম্বর ধারা, যা সরকারি সম্পত্তি ভাঙচুর বা ক্ষতিসাধনের সঙ্গে সম্পর্কিত। এছাড়াও ১৯৭২ সালের এমপিও অ্যাক্ট (MPO Act)-এর ৯ নম্বর ধারায় জনসম্পত্তি ও পাবলিক অর্ডার সংক্রান্ত বিশেষ অপরাধের মামলা দেওয়া হয়েছে। রেল চলাচলে বাধা সৃষ্টি, রেলপথ বা রেল সম্পত্তির ক্ষতি এবং যাত্রীদের নিরাপত্তা বিপন্ন করার মতো গুরুতর অপরাধের জন্য ১৯৮৯ সালের ইন্ডিয়ান রেলওয়ে অ্যাক্ট (Indian Railways Act)-এর ১৫০, ১৫১, ১৫৩ এবং ১৭৪ নম্বর ধারাও যুক্ত করেছে পুলিশ।

    আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, খুন, খুনে প্ররোচনা, দাঙ্গা উসকে দেওয়া এবং রেলের সম্পত্তি নষ্টের মতো একাধিক জামিন অযোগ্য ও অত্যন্ত সংবেদনশীল ধারা থাকায় বারুইপুর কাণ্ডে ধৃত সিপিআই(এম) নেতা লাহেক আলির পক্ষে শীঘ্রই জামিন পাওয়া প্রায় অসম্ভব বললেই চলে। নিম্ন আদালতে এই ধরণের মারাত্মক অভিযোগের ক্ষেত্রে সাধারণত জামিন মঞ্জুর হয় না। ফলে বাম নেতৃত্বকে যদি এই মামলায় স্বস্তি পেতে হয়, তবে পুলিশ হেফাজতের মেয়াদ শেষে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হয়েই দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের মাধ্যমে জয় ছিনিয়ে আনার চেষ্টা করতে হবে।
  • Link to this news (আজকাল)