দখল হয়ে যাওয়া জমির সমস্যায় জর্জরিত ভারতীয় রেল। দেশের অন্যতম বৃহৎ সরকারি সম্পদের মধ্যে ভারতীয় রেলের জমি অন্যতম। কিন্তু সেই জমির বড় অংশই বছরের পর বছর বেআইনিভাবে দখল করে রেখেছে দেশের জনগণের একাংশ। তার জেরে পরিষেবা সম্প্রসারণ ক্ষেত্রে ব্যাপক অসুবিধার মুখে পড়েছে এশিয়ার বৃহত্তম রেল নেটওয়ার্ক।
সম্প্রতি তথ্যের অধিকার (RTI) আইনে পাওয়া রেল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের মার্চ পর্যন্ত ভারতীয় রেলের ১,০৬৮.৫৪ হেক্টর জমি অবৈধ ভাবে জবরদখলকারীদের হাতে রয়েছে। রেলওয়ের বেদখল হওয়া এই জমি প্রায় ৪২টি নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়ামের সমান। ১,৪৯৬টি ফিফা-মানের ফুটবল মাঠ এঁটে যাবে এই জমিতে।
এখানেই শেষ নয়, রিপোর্টে উল্লেখ, শেষ পাঁচ বছরে রেলের জমি অবৈধ ভাবে দখলের প্রবণতা আরও বেড়েছে। পরিসংখ্যান বলছে আগের থেকে প্রায় ৩২ শতাংশ বেড়েছে জবরদখল। ফলে রেলের জমির সুরক্ষা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠছে।
RTI-এর মাধ্যমে পাওয়া এই তথ্যের ভিত্তিতে এক সর্বভারতীয় সংবাদমাধ্যমের এক রিপোর্টে বলা হয়েছে, দখলে থাকা জমির পরিমাণ এতটাই বিশাল যে সেখানে বিশ্বের বৃহত্তম ক্রিকেট স্টেডিয়াম নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়ামের মতো প্রায় ৪২টি স্টেডিয়াম তৈরি করা সম্ভব। আমেদাবাদের নরেন্দ্র মোদী স্টেডিয়াম প্রায় ৬৩ একর বা আনুমানিক ২৫.৫ হেক্টর জায়গা জুড়ে তৈরি। আবার FIFA মানের প্রায় ১,৪৯৬টি ফুটবল মাঠের সমান এই রেলের জবরদখল হওয়া জমি।
রেল বোর্ডের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী—
অর্থবর্ষ অবৈধ দখলে থাকা জমি
২০২০-২১ ৮১০.৩১ হেক্টর
২০২১-২২ ৭৮২.৮১ হেক্টর
২০২৩-২৪ ১,০৭৮.৫৫ হেক্টর
২০২৪-২৫ ১,০৬৮.৫৪ হেক্টর
২০২১-২২ সালে জবরদখলের প্রবণতা সামান্য কমলেও, পরের দুই বছরে দখলের পরিমাণ দ্রুত বেড়ে যায়। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ অর্থবর্ষে এক বছরে প্রায় ২৬৮ হেক্টর জমি নতুন করে জবরদখল হয়ে যায়, যা পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ২০২৪-২৫ সালে বেদখলের প্রবণতা সামান্য হ্রাস পেলেও সামগ্রিক রিপোর্ট উদ্বেগজনক।
সংসদে রেল মন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১ এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত ভারতীয় রেলের মোট জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৪.৯৯ লক্ষ হেক্টর। তার মধ্যে ১,০৬৮ হেক্টর, অর্থাৎ মোট জমির মাত্র ০.২১ শতাংশ অবৈধ দখলের আওতায় রয়েছে। যদিও শতাংশের হিসেবে এই সংখ্যা কম, বাস্তবে জমির পরিমাণ অত্যন্ত বড়।
রেল বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে মোট ৯৮.০২ হেক্টর জমি দখলমুক্ত করা হয়েছে। কিন্তু একই সময়ে নতুন করে অন্য জায়গায় জমির দখল অনেক বেশি হওয়ায় সমস্যা কার্যত থেকেই গিয়েছে।
রেল মন্ত্রকের দাবি, উদ্ধার হওয়া জমি নতুন রেললাইন, মালবাহী ট্রেনের টার্মিনাল, যাত্রী টার্মিনাল, ওয়ার্কশপ এবং অন্যান্য রেল পরিকাঠামো নির্মাণে ব্যবহার করা হবে। যেসব জমি অবিলম্বে রেলের প্রয়োজন হয় না, সেগুলি Rail Land Development Authority (RLDA)-র মাধ্যমে বাণিজ্যিক উন্নয়নের জন্য হস্তান্তর করা হবে।
প্রসঙ্গত, RTI-তে আবেদনকারী গত ২৫ বছরের জমি দখলের তথ্য চেয়েছিলেন। কিন্তু রেল বোর্ড জানিয়েছে, তারা মাত্র পাঁচ বছরের তথ্য সংরক্ষণ করে। ফলে দীর্ঘমেয়াদি প্রবণতা বিশ্লেষণ করা সম্ভব নয়।
এ ছাড়াও, কোন রাজ্যে সবচেয়ে বেশি রেল জমি দখল হয়েছে, সেই সংক্রান্ত তথ্যও রেল বোর্ডের কাছে নির্দিষ্ট ভাবে নেই। বোর্ড জানিয়েছে, রাজ্য বা জ়োনভিত্তিক তথ্য সংশ্লিষ্ট জ়োনাল রেলের পাবলিক ইনফরমেশন অফিসারের কাছ থেকে সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ, সারা দেশের জমি দখলের কোনও কেন্দ্রীয় ডেটাবেস বর্তমানে রেল বোর্ডের কাছে নেই।
রেল বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বিভিন্ন প্রান্তে নতুন রেললাইন, মালবাহী করিডর, স্টেশন পুনর্নির্মাণ এবং পরিকাঠামো সম্প্রসারণের জন্য বিপুল জমির প্রয়োজন। সেই পরিস্থিতিতে রেলের নিজস্ব জমির উপর অবৈধ দখলদারি ভবিষ্যতের প্রকল্পগুলির ক্ষেত্রে বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে। একই সঙ্গে, পুরোনো তথ্যের অভাব এবং রাজ্যভিত্তিক কেন্দ্রীয় রেকর্ড না থাকায় সমস্যার গভীরে ঢুকে প্রকৃত চিত্র মূল্যায়নকে কঠিন করে তুলছে।