• আবাস যোজনার টাকা পেলেন মৃত! বেহিসেবী অর্থ অন্য অ্যাকাউন্টেও, দুর্নীতির পর্দাফাঁস মঙ্গলকোটে
    প্রতিদিন | ১৪ জুলাই ২০২৬
  • আবাস যোজনায় বড়সড় দুর্নীতির পর্দাফাঁস বর্ধমানের মঙ্গলকোটে। কেউ আবেদন না করেও আবাস যোজনার টাকা পাচ্ছেন, আবার মৃত ব্যক্তির নামেও ঢুকছে টাকা! ঘটনা সামনে আসতেই মঙ্গলকোট জুড়ে একেবারে হৈহৈ পড়ে গিয়েছে। ইতিমধ্যে ঘটনায় তদন্তের দাবি জানিয়েছেন মঙ্গলকোটের বিজেপি বিধায়ক শিশির ঘোষ। তাঁর কথায়, ”আমরা সামান্য দু’টি আর্থিক বর্ষের আবাস যোজনার তালিকা দেখছি৷ তাতেই প্রায় দু’ হাজার এই ধরনের দুর্নীতি ধরা পড়েছে৷ তৃণমূল কংগ্রেসের ১৫ বছরের জমানার পুরো তালিকা দেখলে জেলে আর জায়গা হবে না৷”

    ঘটনা এক, মঙ্গলকোটের কৈচর গ্রামের বাসিন্দা পদ্মাবতী যশ তাঁর বাপের বাড়িতে থাকেন৷ সম্প্রতি তিনি জানতে পারেন প্রশাসনিক রেকর্ড অনুযায়ী তাঁর এবং তাঁর দাদা নির্মল কোঁয়ারের নামে আবাস যোজনার ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা অনুমোদন করা হয়েছিল। সেই টাকা উঠেও গিয়েছে। কিন্তু আদপেই তাঁরা আবাস যোজনার অনুদানের জন্য আবেদনই করেননি। তাঁদের অ্যাকাউন্টে টাকাও আসেনি। ঘটনা দুই, মঙ্গলকোটের কৈচরের জীবনকৃষ্ণ চৌধুরী ২০১২ সালে মারা গিয়েছেন৷ তিনি অবিবাহিত ছিলেন৷ দেখা যাচ্ছে ২০২১-২২ বর্ষের আবাস তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে৷ তার আইডি নম্বর ডাব্লিউবি ৩০৮৯২৭৩। ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে তিনটি কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার ঢুকে গিয়েছে ৷ মৃত ‘উপভোক্তার’ ভাই নবকুমার চৌধুরীর প্রশ্ন, “দাদা আগেই মারা গিয়েছেন৷ দাদার কোনও অ্যাকাউন্ট নেই৷ তাহলে কার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকল?”

    এখানেই শেষ নয়, এমন ঘটনা রয়েছে আরও! মঙ্গলকোটের কৈচরের বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য সম্প্রতি জানতে পারেন, তাঁর নামে আইডি ব্যবহার করে ২০২১ সালের ১২ অক্টোবর ৬০ হাজার, ৩০ অক্টোবর ৫০ হাজার ও ২২ নভেম্বর ১০ হাজার টাকা ঘর তৈরির জন্য দেওয়া হয়েছিল৷ কিন্তু আদতে তিনি ওই টাকা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আসেনি৷ সেই টাকা কোথায় গেল, তা জানতে তিনি প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা দেউল ঘোষ মারা গিয়েছে ২০১৮ সালে৷ অথচ তাঁর ২০২০-২১ বর্ষে আবাস তালিকায় নাম রয়েছে৷ যার আইডি নম্বর ডাব্লিউবি ৪৭০৫৭৬৯। দেখা যাচ্ছে, ২০২১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও জুলাই মাসে তিনটি কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার ওই মৃত ব্যক্তির নামে এসেছে৷ স্বর্গত দেউল ঘোষের নাতি সন্তু ঘোষের কথায়, ”এতবড় কারচুপির কথা আমরা জানতেই পারিনি।”

    অভিযোগ এভাবেই মঙ্গলকোটে কয়েক হাজার উপভোক্তার নামের ফেক আইডি ও জবকার্ড ব্যবহার করে সরকারি অনুদানের টাকা লোপাট করে দেওয়া হয়েছে! মৃত ব্যক্তিদের নামে আবাস তালিকায় নাম ঢুকিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে৷ ইতিমধ্যে পুরো ঘটনা ব্লক প্রশাসনকে জানানো হয়েছে বলে জানিয়েছেন মঙ্গলকোটের বিজেপি বিধায়ক শিশির ঘোষ। তাঁর মন্তব্য, সমগ্র বিষয় তদন্ত করে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য আবেদন রেখেছি।

    জানা গিয়েছে, মঙ্গলকোট ব্লকে ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ দুটি আর্থিক বর্ষে কৈচর -১ পঞ্চায়েত সহ বেশকয়েটি পঞ্চায়েতে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনা নিয়ে ব্যাপক গড়মিল ধরা পড়েছে। রাজ্যে পালাবদলের পর ধীরে ধীরে তা সামনে আসছে। ফেক উপভোক্তাদের নামে সরকারি অনুদানের টাকা লোপাট করে দেওয়া হয়েছে। ভুয়ো নথি ব্যবহার করে মৃত ব্যক্তিদের নামেও টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। একের পর এক নাগরিক প্রশাসনের কাছে অভিযোগপত্র জমা দিতে শুরু করেছেন।

    ঘটনাগুলি প্রকাশ্যে আসার পর কৈচর-১ অঞ্চলের ৮ নম্বর সংসদের তৃণমূলের সদস্য মিলন যশ স্বীকার করেছেন, ”আমার অ্যাকাউন্টে আবাসের ঘরের টাকা ঢুকেছিল৷ আমার পাকা বাড়ি রয়েছে৷ প্রধান আমাকে বলেছিল ওই টাকা তুলে দিতে৷ আমি সেটাই করেছি৷ কিন্তু কোন উপভোক্তার টাকা আমার অ্যাকাউন্টে ঢুকেছিল তা জানি না৷” আবার বরুন প্রধান নামে এক বাসিন্দা বলেন, আমি ১০০ দিনের কাজের সুপারভাইজার ছিলাম৷ আমার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে আবাস প্রকল্পের টাকা ঢুকেছিল৷ আমিও পঞ্চায়েত প্রধানকে তুলে দিয়েছিলাম।” ৷ যদিও কৈচর -১ পঞ্চায়েতের প্রধান সুফল প্রধানকে এদিন বাড়িতে পাওয়া যায় নি ৷ তিনি কোথায় গা ঢাকা দিয়েছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।
  • Link to this news (প্রতিদিন)