• মঙ্গলকোটের একাধিক পঞ্চায়েতে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় দুর্নীতি, টাকা এসেছিল মৃত ব্যক্তিদের নামেও
    বর্তমান | ১৪ জুলাই ২০২৬
  • সংবাদদাতা, কাটোয়া: পূর্ব বর্ধমানের মঙ্গলকোটে প্রধানমন্ত্রী আবাস যোজনায় বড়সড় দুর্নীতির পর্দাফাঁস। কয়েক হাজার উপভোক্তার আইডি, জবকার্ড ব্যবহার করে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। মৃত ব্যক্তির নামও আবাস তালিকায় ঢুকিয়ে টাকা তুলে নেওয়া হয়েছে। সেইসব টাকা ঢুকেছে তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য সহ নেতাদের অ্যাকাউন্টে। এই চাঞ্চল্যকর অভিযোগ ঘিরে সরগরম মঙ্গলকোট। 

    বিধায়ক শিশির ঘোষ বলেন, আমরা সামান্য দু’ বছরের আবাস তালিকা দেখছি। তাতেই প্রায় দু’ হাজার দুর্নীতি ধরা পড়েছে। পুরো তালিকা দেখলে জেলে আর জায়গা হবে না। আমরা ব্লক প্রশাসনকে বলেছি তদন্ত কবে দেখতে। 

    মঙ্গলকোট ব্লকে ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ দু’টি আর্থিক বর্ষে কৈচর-১ সহ বহু পঞ্চায়েতেই যাঁদের নামে আবাসের টাকা এসেছে, তাঁরা সে কথা জানতেনই না। তাঁদের টাকা তুলে নিয়েছে অন্য কেউ। দশ বছর আগে মৃত ব্যক্তির নামও তালিকায় তুলে টাকা নিয়ে নেওয়া হয়েছে। তাঁদের পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি জেনে পঞ্চায়েতে গিয়ে অভিযোগ জানাচ্ছেন।

    কৈচর-১ পঞ্চায়েতের কৈচর গ্রামের বাসিন্দা পদ্মাবতী যশ বাপের বাড়িতে থাকেন। তিনি ও তাঁর দাদা নির্মল কোঁয়ারের নাম ওই দু’টি অর্থবর্ষে আবাস তালিকায় ছিল। পঞ্চায়েতে গিয়ে তাঁরা জানতে পারেন, তাঁদের ১ লক্ষ ২০ হাজার টাকা ঘর তৈরির জন্য দেওয়া হয়েছে। অথচ তাঁরা সেই টাকা পাননি। পদ্মাবতী বলছেন, আমি ঘর পাওয়ার জন্য আবেদন করিনি। অথচ পঞ্চায়েতে গিয়ে দেখছি, আমাদের ভাই-বোনের নামে টাকা এসেছিল। আমাদের অ্যাকাউন্টে নাকি টাকা দিয়ে দেওয়া হয়েছে। আদতে আমাদের অ্যাকাউন্টে কোনো টাকাই আসেনি। আমাদের প্রশ্ন, তাহলে আমাদের আইডি ব্যবহার করে কে বা কারা টাকা তুলে নিল সেটা তদন্ত করা দেখা হোক। ওই গ্রামেরই বাসিন্দা রবীন্দ্রনাথ ভট্টাচার্য লিখিত অভিযোগে জানিয়েছেন, তাঁর নামে ২০২১ সালের ১২ অক্টোবর ৬০ হাজার, ৩০ অক্টোবর ৫০ হাজার ও ২২ নভেম্বর ১০ হাজার টাকা ঘর তৈরির জন্য দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ওই টাকা তাঁর ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে ঢোকেনি। কৈচর-১ পঞ্চায়েতের বাসিন্দা জীবনকৃষ্ণ চৌধুরী ২০১২ সালে মারা গিয়েছেন। তিনি অবিবাহিত ছিলেন। অথচ দেখা যাচ্ছে ২০২১-২২ বর্ষের আবাস তালিকায় তাঁর নাম রয়েছে। জীবনকৃষ্ণবাবুর আইডি নম্বর ডব্লিউবি ৩০৮৯২৭৩। তাঁর অ্যাকাউন্টে ২০২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যেই তিনটি কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার এসেছে। তাঁর ভাই নবকুমার চৌধুরী বলছেন, দাদা তো আগেই মারা গিয়েছেন। দাদার কোনো অ্যাকাউন্টও নেই। তাহলে কার অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকল তা তদন্ত করা হোক। একই গ্রামের বাসিন্দা দেউল ঘোষ মারা গিয়েছে ২০১৮ সালে। তাঁর ২০২০-২১ বর্ষে আবাস তালিকায় নাম রয়েছে। যার আইডি নম্বর  ডব্লিউবি ৪৭০৫৭৬৯। তাঁর অ্যাকাউন্টে ২০২১ সালের জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি ও জুলাই মাসে তিনটি কিস্তিতে ১ লক্ষ ২০ হাজার এসেছে বলে জানা গিয়েছে। তাঁর নাতি সন্তু ঘোষ বলছেন, এসবের কিছুই আমরা জানি না। 

    এদিকে কৈচর-১ অঞ্চলের ৮ নম্বর সংসদের তৃণমূলের সদস্য মিলন যশ বলেন, আমার অ্যাকাউন্টে আবাসের ঘরের টাকা ঢুকেছিল। আমার পাকা বাড়ি রয়েছে। কিন্তু প্রধান আমাকে বলেছিল, ওই টাকা তুলে দিতে। আমি তাই করেছি। কোন উপভোক্তার টাকা ঢুকেছিল তা জানি না। বরুণ প্রধান নামে এক যুবক বলেন, আমি ১০০ দিনের কাজের সুপারভাইজার ছিলাম। আমার অ্যাকাউন্টেও আবাস প্রকল্পের টাকা ঢুকেছিল। আমিও পঞ্চায়েত প্রধানকে তুলে দিয়েছিলাম। অভিযোগ, মঙ্গলকোট ব্লকের বহু পঞ্চায়েতেই এমন দুর্নীতি হয়েছে। কারা সেই টাকা পেল, তা নিয়ে তদন্ত চাইছেন উপভোক্তারা। কৈচর-১ পঞ্চায়েতের প্রধান সুফল প্রধান গা ঢাকা দিয়েছেন, তার অবস্থান কেউ জানেন না। ওই পঞ্চায়েতের সেক্রেটারি বাবলু মালিক বলেন, বিষয়টি নিয়ে বিডিওর সঙ্গে আলোচনা করব। 
  • Link to this news (বর্তমান)