• ‘দিদিকে বলো’, ‘দুয়ারে সরকার’কে গুরুত্ব দিতে গিয়ে তৃণমূল আমলে বন্ধ ৬৫ প্রকল্প
    বর্তমান | ১৪ জুলাই ২০২৬
  • বাপ্পাদিত্য রায়চৌধুরী, কলকাতা: ঘড়ি ধরে সাধারণ মানুষকে সরকারি পরিষেবা দিতে এরাজ্যে আইন এনেছিল মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকার। নাম দেওয়া হয়েছিল রাইট টু পাবলিক সার্ভিস অ্যাক্ট বা জন পরিষেবা অধিকার আইন। ২৯টি দপ্তর এই আইনের আওতায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে। মোট ৪২৮টি পরিষেবাকে আনা হয়েছিল আইনের আওতায়। সেই পরিষেবাকে ধাপে ধাপে ৩৬৩টিতে নামিয়ে আনা হয়েছে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষ চাইলেই এখন আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ৬৫টি সরকারি পরিষেবা পাবেন না। গত মার্চের মধ্যে ধাপে ধাপে ওই পরিষেবাগুলি চুপিসারে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে, এমনটাই অভিযোগ। বিজেপি সরকার বিষয়টি খতিয়ে দেখবে বলে আশ্বাস দিয়েছে।

    রেশন কার্ড, ড্রাইভিং লাইসেন্স, কন্যাশ্রী, বার্ধক্যভাতা, বিধবাভাতা, ডুপ্লেকেট মার্কশিট প্রভৃতি হাজারো সরকারি পরিষেবা পেতে একসময় কালঘাম ছুটত সাধারণ মানুষের। প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরেও হতোদ্যম হয়ে পড়তেন বহু মানুষ। পরিষেবা না পেলে কোথায় অভিযোগ জানানো যাবে, তাও জানতেন না তাঁরা। অভিযোগ করলেও যে সমাধান মিলবে, এমন নিশ্চয়তাও ছিল না। 

    সেই খরা কাটাতেই আইন চালু করে তৃণমূল সরকার। তারা নির্দেশ দেয়, প্রতিটি দপ্তর জানাবে, তারা কোন কোন পরিষেবা সাধারণ মানুষকে কতদিনে দিতে পারবে। সেইমতো দপ্তরগুলি বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করতে শুরু করে। পরিষেবার সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২৮টিতে। বিজ্ঞপ্তিগুলিতে উল্লেখ থাকে, যদি কোনো নাগরিক ওই নির্দিষ্ট দিন সংখ্যার মধ্যে পরিষেবা না পান, তাহলে তিনি কোথায় আপিল করতে পারবেন। সেখানেও পরিষেবা না পেলে দ্বিতীয় অ্যাপিলেটেরও সুযোগ করে দেওয়া হয়। 

    এই আইনের আওতায় সরকারি কর্মচারীদের কাজে গাফিলতিতে আর্থিক জরিমানারও ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। গোটা বিষয়টির তদারকির জন্য আলাদা করে একটি কমিশনও গঠন করা হয়। গোটা প্রক্রিয়ার নোডাল অফিস হিসাবে দায়িত্ব দেওয়া হয় ক্রেতাসুরক্ষা দপ্তরকে। অভিযোগ, তলায় তলায় বিভিন্ন দপ্তর একে একে পরিষেবা সংক্রান্ত বিজ্ঞপ্তি বাতিল করেছে। তার ফলেই তালিকা থেকে কমে গিয়েছে ৬৫টি পরিষেবা!

    কোন কোন পরিষেবাকে বাদ দেওয়া হয়েছে, তার নির্দিষ্ট কোনো তালিকাও তৈরি নেই। ফলে সাধারণ মানুষ জানতেও পারেনি, কোন পরিষেবা তারা আর নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে পাবে না। ক্রেতাসুরক্ষা দপ্তরের কর্তারা জানাচ্ছেন, তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তর যে-কটি পরিষেবা এই তালিকায় রেখেছিল, তার প্রত্যেকটিই বাতিল করেছে তারা। বর্তমানে যে-কটি দপ্তরে সবচেয়ে বেশি পরিষেবা চালু আছে, তাদের মধ্যে অন্যতম বিদ্যুৎ, শ্রম ও নগরোন্নয়ন দপ্তর।

    কেন কমানো হল পরিষেবার সংখ্যা? প্রশাসনের একাংশের বক্তব্য, আগের সরকারের ‘দিদিকে বলো’ বা ‘দুয়ারে সরকার’-এর মতো প্রকল্পকে সফল হিসেবে তুলে ধরার তাগিদ ছল। এদিকে সরকারি দপ্তরে এসে সময়ে পরিষেবা মিলে গেলে নাগরিকরা আর শিবিরে হাজির নাও হতে পারতেন। দিদিকে বলো বা মুখ্যমন্ত্রীর দপ্তরে অভিযোগ জানিয়ে সুরাহা পাওয়ার সংখ্যা কমে যেতে পারত। ফলে সরকারি সাফল্যের পরিসংখ্যানের টান পড়তে পারত। সেই আশঙ্কাতেই জন পরিষেবা আইনটিকে শুধু খাতায় কলমে চালু রেখে, বাস্তবে পরিষেবাগুলিকে সেই আইনের আওতা থেকে বার করে আনার চেষ্টায় ছিল সরকার, অভিযোগ এমনই। 

    রাজ্যের বর্তমান ক্রেতাসুরক্ষা মন্ত্রী ইন্দ্রনীল খাঁ বলেন, পরিষেবা কেন কমানো হয়েছে, অবশ্যই আমরা খতিয়ে দেখব। সাধারণ মানুষ যাতে সর্বোচ্চ পরিষেবা সবচেয়ে কম পরিশ্রমে পেতে পারেন, সেই চেষ্টা চালিয়ে যাব আমরা। তার জন্য যা যা ব্যবস্থা নেওয়ার, তা নেওয়া হবে। 
  • Link to this news (বর্তমান)