স্প্যানিশ শিবিরে ভাবনা সেই কিলিয়ান এমবাপেকে নিয়ে। তা ঠিক করতে গিয়ে নাকি স্প্যানিশ কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে এদিন প্র্যাকটিসে 'ডামি' এমবাপে ব্যবহার করে নিজের ডিফেন্স লাইন নিয়ে পড়েছিলেন।
দুলাল দে
ডালাস হোক কিংবা আটলান্টা। সেমিফাইনাল ম্যাচের টিকিট বিক্রির সাইটগুলোতে গেলে চোখ ছানাবড়া হয়ে যাবে। শুধু একটা সেমিফাইনালের ম্যাচে টিকিট বিক্রির দর ১৯-২০ হাজার ডলার। আটলান্টায় এসে যা বুঝলাম, সেমিফাইনাল ম্যাচের টিকিট বিক্রির ধুম পড়েছে। একটা টিকিট মানেই জ্যাকপট। বিশ্বকাপকে ঘিরে এরকম মুনাফা লোটার সুযোগ আর কবে আসবে কে জানে? ডালাসে মাঠের ভিতর লামিন ইয়ামালদের বিরুদ্ধে এমবাপেদের লড়াইটা অন্যরকম।
ফ্রান্স আর স্পেনের সীমান্ত বরাবর রয়েছে ফিজ্যান্ট আইল্যান্ড। খুবই ছোট দ্বীপ। আশ্চর্যের বিষয় এটাই পৃথিবীর একমাত্র দ্বীপ, যার যৌথ মালিকানা। ৫৯’র যুদ্ধের পর ঐতিহাসিক ‘পাইরেনিস চুক্তি’-তে ঠিক হয় দ্বীপটিকে ফ্রান্স ছয় মাস শাসন করবে। বাকি ৬ মাস স্পেন। কোনওরকম রক্তপাত ছাড়া একটি দ্বীপকে ঘিরে দুই দেশের যৌথ মালিকানা সোনার পাথরবাটির মতোই শোনাচ্ছে। একটি দ্বীপকে ঘিরে ফ্রান্স-স্পেনের রাজনৈতিক সমীকরণ নিয়ে কেউ যদি ফ্রান্স-স্পেনের মধ্যে সেমিফাইনালের আবহ পরিমাপ করতে যান, চরম ভুল করবেন। ডালাসের সেমিফাইনালকে ঘিরে উত্তেজনার পারদ চড়েছে চরমে।
স্প্যানিশ তারকা লামিন ইয়ামালের ফ্রান্সকে দেখে নেওয়ার হুমকির মাঝেই ফরাসি শিবিরে ঘুরছে ২০ বছর আগের স্মৃতি। ২০০৬ বিশ্বকাপ শুরুর আগে ফরাসি তারকা জিদান জানিয়ে দিয়েছিলেন, সেটাই শেষ বিশ্বকাপ। স্পেনের তর সইবে কেন? নক আউটে মুখোমুখি হওয়ার আগেরদিনই স্প্যানিশ শিবির থেকে হুঙ্কার, ‘অপেক্ষা করতে হবে না। আমরাই জিদানকে অবসরে পাঠাব।’ জিদান নিজে একটি গোল করেন। আরেকটা অ্যাসিস্ট। স্পেনকে ৩-১ গোলে হারিয়ে ম্যাচের পর জিদানের সেই ব্যঙ্গোক্তি, “একজন ৭২ বছরের বুড়ো খেলোয়াড়ের জন্য পারফরম্যান্সটা তাহলে খুব মন্দ নয়?”
মঙ্গলবার ডালাসে হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে ২০ বছর আগের জিদানের সেই প্রসঙ্গটি ভীষণই ঘুরেফিরে আসেছে। হয়তো লামিন ইয়ামালের আগাম হুঙ্কারের জন্যই। এমবাপেদের বিরুদ্ধে মাঠে নামার আগে কী বলেছেন ইয়ামাল? “আমরা জানি, ফ্রান্স বিশ্বের অন্যতম সেরা দল। কিন্তু ভয় পাওয়ার কিছু নেই। পরিসংখ্যান ঘেঁটে দেখুন, শেষ দুটো ম্যাচে আমরাই ফ্রান্সকে হারিয়েছি। ফলে ম্যাচের আগে যদি কোনও দলের চাপে থাকার হয়, সেটা ফ্রান্স। আমরা মাঠে নামি শুধুই জেতার জন্য।” আর এমবাপে? যাঁর বিধ্বংসী দৌড়গুলিতে ভেঙে পড়ে বিপক্ষর একের পর এক প্রাচীর? সেখানেও তো স্প্যানিশ তরুণ যা বলেছেন, তাতে এমবাপেকেও এক প্রকার উড়িয়ে দিয়েছেন। লামিন বলেন, “এমবাপে দারুণ ফুটবলার। আমাদের ডিফেন্স লাইনও ফর্মে রয়েছে। ওরা জানে কীভাবে এমবাপেকে আটকে দিতে হয়। ফাইনাল থেকে আমরা মাত্র এক ধাপ দূরে। ফাইনালে গিয়ে জীবনের সেরা পারফরম্যান্স দেওয়ার জন্য তৈরি হয়ে আছি।”
এখন এমবাপে-সহ ফ্রান্স শিবিরের কী করা উচিত বলে মনে হয়? তার উপর যে দলটা নকআউটে পৌঁছে এখনও পর্যন্ত একটা গোল খায়নি? ইয়ামালের বক্তব্যের পাল্টা ফ্রান্স দিচ্ছে হেসে। ডিফেন্ডার ইব্রাহিম কোনাতে বলেন, ‘ইয়ামাল যা খুশি বলতে পারে। ওর কথা কানেই নিচ্ছি না আমরা।” কোচ দেশঁর ভাবনায় এখন প্রতিপক্ষ স্পেন নিয়ে অন্য কিছু ঘোরাফেরা করছে। কোয়ার্টার ফাইনালে মরক্কোর বিরুদ্ধে পরিবর্ত হিসেবে নেমে খেলা ঘুরিয়ে দিয়েছিলেন দেজিয়ের দুয়ে। কোচ এখন ভাবছেন, শুরুতেই ব্র্যাডলি বাকোলার জায়গায় দুয়েকে দিয়ে শুরু করানো যায়। তারপর চোট সারিয়ে সেমিফাইনাল খেলার জন্য পুরোপুরি ফিট চুয়ামেনি। যার ফলে ম্যাচের আগে দেশঁ বেশ ফুরফুরে। তাঁর একমাত্র চিন্তা অতীতের ইতিহাস। যেখানে অনেকটাই এগিয়ে রয়েছে স্প্যানিশরা।
কিলিয়ান এমবাপেকে কীভাবে স্প্যানিশ ডিফেন্স সামলাবে, তার হিসেব-নিকেশ করতে করতে সবাই ভুলে গিয়েছেন। স্প্যানিশ স্ট্রাইকার মেরিনোকে আটকানো নিয়ে ফরাসি ডিফেন্ডার সালিবাদেরও রাতের ঘুম উড়েছে। সেরকম ফ্রান্সের ওলিসের থ্রু পাসগুলি আটকানোর দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে রড্রি আর ফাবিয়ান রুইজের উপরে। তবে ঘুরেফিরে স্প্যানিশ শিবিরে ভাবনা সেই কিলিয়ান এমবাপেকে নিয়ে। তা ঠিক করতে গিয়ে নাকি স্প্যানিশ কোচ লুই দে লা ফুয়েন্তে এদিন প্র্যাকটিসে ‘ডামি’ এমবাপে ব্যবহার করে নিজের ডিফেন্স লাইন নিয়ে পড়েছিলেন।
সেমিফাইনালের প্রস্তুতি দু’দলের জন্যই যেরকম চলছে প্র্যাকটিসের মাঠে, সেরকমই ড্রেসিংরুমেও। সেখানে দেশঁর নিয়ন্ত্রণে ফরাসি ড্রেসিংরুম একদমই শান্ত। যেন ঝড় ওঠার আগের পূর্বাভাস। কিন্তু সবাই তো জানতে চান, এমবাপে কী বলছেন? তিনিও যে স্বভাব বিরোধীভাবে এরকম উত্তেজক ম্যাচ খেলতে নামার আগে অতিমাত্রায় শান্ত। শুধু বলছেন, “সেমিফাইনালে স্পেন ম্যাচ যে এখনও পর্যন্ত সবচেয়ে কঠিন এটুকু বুঝতে পারছি। আমরা সব দিক থেকে তৈরি।” ব্যস এইটুকু। হয়তো বাকি বারুদটা তুলে রাখলেন মঙ্গলবার মাঠের জন্য।